Editorial

মানুষের দেওয়াল-লিখন

গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রথম শিবরাম-সঞ্জয়রা হাইকোর্টে এসেছিলো। সেদিন ফেরার পথে বাসে হঠাৎ ওর গায়ের দিকে দেখিয়ে বলেছিলো দাদা এখানে একদম ভালো না, কষ্ট হচ্ছে, এখানকার হাওয়া খারাপ। কোলকাতার গুমোট শেষ বর্ষায় কার না কষ্ট হয়! কিন্তু শিবের কষ্ট কেবল গুমোট গরম, ধোঁয়া ধুলোর মেয়ো রোডের জ্যামে হচ্ছিলো না হয়তো। সব মিলিয়ে কোলকাতার হাওয়া খারাপ লাগছিলো ওর। অযোধ্যার শাল-কেন্দু-ভেলা-কুসুমের ঝিরিঝিরি ঝরনার আশ্বাস হাওয়ায় বয়। সে হাওয়া জীবন্ত, প্রাণের হাওয়া। কোলকাতার হাওয়ায় প্রাণ নেই। আমরা যারা এখানেই থাকি তারা এর মধ্যেই প্রাণ খুঁজে বেড়াই। পাইও হয়তো! আমাদের রাতের রাস্তায় হলুদ আলোয় সেপিয়া টোনের হাই রেজলিউশন জে-পেগ ইমেজারি থাকে। ইডেনগার্ডেন্সের চকচকে বিদ্যুৎ আলো এমন মোহময় হয়ে ধরা দেয় আমাদের চোখে যে, দিনের বেলা খেলা দেখার কথা ভেবেও উঠিনা। আমাদের ত্রিফলা, আমাদের গ্লোসাইন আমাদের রাতের দুপুরবেলা শূন্য প্রাণহীনতাকে স্বাভাবিকিকরণ করেছে। এই অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতাকেই বেঁচে থাকার অতিপ্রয়োজনীয় উপকরণ বলে ভাবতে শিখিয়ে নিয়েছে আমাদের। কিন্তু সুনীল, বীরেন, সহদেব, রবিনদের কাছে রাত দিনের সহজ হিসেব থাকে৷ ঋতুর, জলের, হাওয়ার সহজ হিসেব সহজ মানুষগুলোকে তৈরী করে। এই সহজিয়া চোখ রাতের শহীদ মিনারের গোড়ায় বসে বাসের অপেক্ষা করতে করতে ইডেন গার্ডেনের আলোর দিকে চেয়ে থাকতে পারে না, পিঠ ঘুরিয়ে বসে। বুঝতে পারে যে কোলকাতার হাইকোর্টের কাছে আশা নিয়ে এসেছে সেই কোলকাতার রোশনাইয়ের জন্যই তাদের ঘরছাড়া হতে হবার পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। গত পরশু সুনীলের মুখে রামের কথার অনুরণন শোনা যায় কোলকাতার হাওয়া খারাপ, কোলকাতায় লোকে ফুর্তি করে, আর আমাদের জঙ্গলে গাছ কাটা যায়।


কোর্টের লড়াইই শেষ কথা নয়। তবু কোর্টে ফয়সালা হোক সাংবিধানিক অধিকারের। এফ আর এ-এর আইনি অধিকার সুরক্ষিত হোক। কোর্টের লড়াই জিতলে ‘আইন মোতাবেক’ গ্রামসভা করতে বাধ্য হবে মিথ্যুক বিদ্যুৎ নিগম এবং রাজ্য সরকার। কোথাকার অজ-পাড়াগাঁ অযোধ্যা থেকে এসে কোলকাতার সরকার বাবুদের নাকে খত দেওয়ানো কী কম কিছু? যেখানে কোন অধিকারই সুরক্ষিত থাকছে না। গণতান্ত্রিক পরিসর বলে কোন কিছুর অস্তিত্বই সংকটে!
ওদিকে অযোধ্যায় স্থানীয় নেতাদের হুমকি ভয় দেখানো এবং পিসি প্রবর্তিত পথে উন্নয়নের প্রলোভন স্বত্তেও অধিকাংশ অযোধ্যাবাসী সমস্বরে ঠুড়গা পাম্প স্টোরেজ প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। জল, নদী, ঝর্ণা, পাহাড় ভালোবেসে লড়ে যাচ্ছেন। দেওয়ালে দেওয়ালে লিখেছেন -“আমাদের পরিবেশ আমাদের প্রাণ মায়ের সমান আমরা ঠুড়গা প্রকল্প চাই না”।

সঙ্গে আসবে নাকি?

Promotion