Editorial

ঝাঁটার ঝাপটায় ভারত-হৃদয় জয় কেন এবারেও অধরা থাকল পদ্মের?

 

রূপম ইসলামের গাওয়া ‘দানিকেন’ গানের একটি লাইন হল, “যুক্তির জালে আমার হৃদয়, অবহেলে করে নিলে তুমি জয়।” দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে বসে কেন জানিনা এটাই প্রথম মাথায় এল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছিলেন, “যদি মনে হয় আমরা কাজ করেছি তবেই ভোট দেবেন, নচেৎ দেবেন না।” এই যুক্তির সামনেই মোদী ম্যাজিক কিংবা হিন্দুত্ববাদী ইস্যু খড়কুটোর মতোই উড়ে গেল। দিল্লি নির্বাচনের ফলাফল থেকে এখন স্পষ্ট যে আপ ক্ষমতায় আসছে। ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট এই সম্পাদকীয় লেখার মুহূর্তে জানাচ্ছে মাত্র ৮ টি আসনে এগিয়ে বিজেপি। ৬২ টি আসন নিজের পকেটে পুরে ফেলেছে আম আদমি পার্টি। গণনা এখনও চলছে।

 

আপ পেয়েছে ৫৩.৬% ভোট, অন্যদিকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিজেপির সংগ্রহ ৩৮.৪% ভোট। ২০১৫-এর তুলনায় গেরুয়া শিবিরের আসন ও ভোটের শতাংশ দুই-ই বেড়েছে। ২০১৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আপ, বিজেপি ও কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫৪.৩%,৩২.৩% ও ৯.৭%। এবারের ভোটের ফলাফল বিচার করলে দেখা যাচ্ছে আপের ভোট শতকরা হিসেবে এক শতাংশেরও কম হ্রাস পেয়েছে। কংগ্রেসের ভোট ৫ শতাংশেরও বেশি কমে দাঁড়িয়েছে ৪.২৭% এ। অন্যদিকে পদ্ম শিবির তাদের শতকরা ভোটের পরিমাণ
বাড়িয়েছে ৬%-এর কিছু বেশি। কংগ্রেসের ভোট অনেকটাই গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে তা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে কিছু রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরলেও বিরোধী হিসেবে সেই গ্রহণযোগ্যতা তারা এখনও অর্জন করতে পারেনি। উপরন্তু দিল্লিতে গত ভোটেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে তারা।

 


অরবিন্দ কেজরিওয়াল এর আগে ৪৮ দিনের জন্য দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হন ২০১৩’র শেষ দিকে। তবে তার দল
সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে পারেনি। আপ পেয়েছিল ২৮ টি আসন এবং বিজেপির সংগ্রহ ৩১ টি। কোনওরকমে জোট সরকার হিসেবে ক্ষমতায় এলেও চরম অচলাবস্থার মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেন ২০১৪’র গোড়াতেই। তারপর রাষ্ট্রপতি শাসনের পর্ব শেষে বিপুল ভোটে জিতে দিল্লির মসনদ দখল করে তারা। দিল্লির রাজনীতির ইতিহাস বিশ্লষণ করলে দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস অনেকবার ক্ষমতায় এসেছে। বিজেপিও ক্ষমতায় এসেছে মদনলাল খুরানা, সুষমা স্বরাজদের হাত ধরে। যদিও এবারে দিল্লির ফলাফল বেশ কিছু ক্ষেত্রে যথেষ্টই গুরুত্ব সহকারেই ভাবা হচ্ছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আপের ফলাফল আশানুরূপ ছিলনা। একটিও লোকসভা আসন জোটাতে পারেনি অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দল। অথচ সেই নির্বাচনের ৬ মাসের মধ্যেই আপের জয় জয়কার। বিজেপির ধারণা ছিল মেরুকরণ নীতিকে হাতিয়ার করে হিন্দুত্ববাদী ইস্যুতে বৃহত্তর হিন্দুসমাজ তাদের সমর্থন করবে। কিন্তু চিঁড়ে ভিজল কই? একদিকে দেশ জোড়া এনআরসি-সিএএ প্রতিবাদ সামলাতে নাজেহাল অবস্থা বিজেপির। এসবের মধ্যেই নীরবে কাজ করে দেখিয়েছে দিল্লি। কেজরিওয়াল সরকার বিদ্যুৎ, শিক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিয়েছেন। প্রতি মহল্লাতে ক্লিনিক, সরকারী পরিবহণে মহিলাদের নিরাপত্তার মতো ম্যাজিক দেখাতে পেরেছেন মাফলার ম্যান। তবে স্বখাত-সলিলেও খানিক ডুবেছে বিজেপি। হিন্দুত্ববাদের বাড়াবাড়ি, শাহীনবাগ-জামিয়া মিলিয়া কিংবা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গেরুয়া বাহিনীর প্ররোচনাকে ভালো চোখে দেখে নি দিল্লির মানুষ। হেরে গেল “গদ্দার কো গোলি মারো” দর্শন। বরং জনতা মালিক, নেতা চাকর; এই দর্শনেই বাজিমাত করল আম আদমি পার্টি। রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেও দিল্লির মানুষ যে কেজরিওয়ালের উন্নয়নে বিশ্বাসী তা প্রমাণ হল। অন্যদিকে গেরুয়া সাম্রাজ্যের কাছে এক দেওয়াল-লিখনও খানিকটা হলেও স্পষ্ট হল।

কলমে অনিন্দিতা হাজরা

Picture Courtesy – Official Twitter Handle of  Arvind Kejriwal

Promotion