Editorial

বিশ্বব্যাপী ধর্ম-উন্মাদনার ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশের বিজয় দিবস

 

বিশ্বব্যাপী চলছে ভয়ঙ্কর এক ক্রান্তিলগ্ন। বৈশ্বিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মীয় আগ্রাসন। কোনো দেশে আজন্মভূমি থেকে মুসলিমকে ঠেলে বের করে দেওয়া হচ্ছে। কোনও ভূখন্ড থেকে সমূলে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চলছে হিন্দুকে। কোথাওবা মসজিদে অতর্কিত হামলায় খুন করা হচ্ছে মুসলিম জনগণকে। কোথাও আবার গুলি করে মারা হচ্ছে খ্রীষ্টানকে। একে ধ্বংস করছে মসজিদ অন্যে ধ্বংস করছে মন্দির, পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে শতবছরের বৌদ্ধ মন্দির আর মূর্তি। এই যে ধর্মাধর্মের আজন্ম হানাহানি এর অবশেষ কোথায়! এসেছে কী তাতে শান্তি! কোন্ ধর্মগ্রন্থটিতে লেখা আছে যে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে উৎখাত করতে হবে? কেউ কি জানেন? আমার জানা নেই কোন ধর্মগ্রন্থে লেখা রয়েছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় আচার আচরণে বাধা দেওয়া ন্যায়সঙ্গত! ধ্বংসযজ্ঞের এই লীলা দেখতে দেখতে আমার বার বার মনে পড়ছে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার সেই অমোঘ বাণীটি। “মূর্খেরা সব শোনো/মানুষ এনেছে গ্রন্থ/গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনও।” বাংলাদেশের বিজয় দিবসের এই আনন্দের মুহূর্তেও আমি বিষণ্ন।

 

সেই ১৯৪৭-এ ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জনের প্রাক্কালে ধর্ম নামক একটি ব্যক্তিগত আইনকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল ভারত-পাকিস্তানের ঘাড়ে। বুনে দেওয়া সেই ভয়ঙ্করতম বীজ আজও বিকশিত হয়ে চলেছে। দেশে দেশে নির্যাতিত হয়ে চলেছে হিন্দু-মুসলিম অগণিত জনমানুষ। ১৯৪৭ সালে কিছু সংখ্যক মুসলিম পূর্বপাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কিছু সংখ্যক ভারতীয় হিন্দু মৌলবাদী রাজনীতিবিদের আগ্রাসনের কারণে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে দুই দেশ। হাজার মাইলের ব্যবধানে ভাষা পোষাক অর্থাৎ সংস্কৃতির পুরোপুরি ভিন্নতা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে পৃথিবীর বুকে চিহ্নিত হয়েছিল দুটি দেশ এক রাষ্ট্র হিসেবে। নতুন রাষ্ট্রটির নাম হয়েছিল ‘পাকিস্তান’। যদিও তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। ভাষার, অর্থনীতি আর মানবিক অধিকারের ওপর মারাত্মক আগ্রাসন অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছিল সংঘর্ষ। দীর্ঘকালের নিপীড়ন আর অত্যাচারের ফলশ্রুতিতে জনমনে দানা বাঁধছিল ক্ষোভ। আর সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছিল তীব্র অসন্তোষ। তারই ফলশ্রতিতে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে ডাক দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে। অত্যাচারের মাত্রা অতিক্রম করে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে। ঘুমন্ত বাংলাদেশের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান। ফলে ২৬ মার্চ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ভয়ানক যুদ্ধ আর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ৯ মাসের যুদ্ধে কতো যে রক্ত দিতে হয়েছিল, কতো প্রাণ বিসর্জন হয়েছিল, কতো নারীর মান সম্মান হরণ হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই। যে ভয়ঙ্করতম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিস্ময়কর, অমানবিক, বর্বরতম। ফলাফল হিসেবে জন্ম হয়েছিল নতুন একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশের। অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের এই স্বাধীনতার যুদ্ধে পার্শবর্তী রাষ্ট্র ভারত ছিল সবচেয়ে ভালো বন্ধু। প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়ে সাধারণ বাংলাদেশী মুক্তিসেনাদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয় তাঁরা। এমনকি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও প্রাণ দিয়ে সাহায্য করে গেছে যে দেশটি আজ সেখানেও মুসলিমরা রাষ্ট্র ক্ষমতার কাছে তুচ্ছ হয়ে পড়েছে। অথচ সাধারণ জনগণ তথা হিন্দু মুসলিমের সম্পর্ক অভেদ্য। ঠিক এমনি এক অস্থিরতার মাঝে আজ বাংলাদেশের বিজয় দিবস।

 

মহানন্দের মাধুরী যাপনের কাল আজ সমগ্র বাংলাদেশবাসীর জন্য। তবু বিষণ্ণ এই ক্ষণ। তবু এই বিষণ্ণ আনন্দের মুহূর্তে সালাম জানাই বাংলাদেশের সকল শহীদ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে। সালাম জানাই সকল বুদ্ধিজীবীদের। ভারতের যে সৈনিকেরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের উৎকর্ষ তাদের প্রতিও রইল সশ্রদ্ধ প্রণাম। প্রাণ ঢালা ভালোবাসা জানাই বাংলাদেশের সমস্ত নির্যাতিত নারী, শিশু বৃদ্ধকে যারা আজও শরীরে-মননে আর জীবন-যাপনে বহন করে চলেছেন সে অসম যুদ্ধের দায়ভার। বিজয়ের এই ক্ষণে আরও ভালোবাসা-সহমর্মিতা জানাই বাস্তু ভিটে থেকে উৎপাটিত সকল স্বদেশহারা জনমানুষকে। শুভ প্রত্যাশা করি। ধর্মের ভিত্তিতে জনমানুষের প্রতি কুটিল জটিল রাষ্ট্রযান্ত্রিক আগ্রাসনের অভিপ্রায় একদিন শেষ হবে। আলো জ্বলে উঠবেই মানবিক বিকারের সকল অন্ধকার দূর করে। জয় বাংলা।

Promotion