মরসুমী ফুল

টুসু! সে তো আমার-আপনারই ঘরের মেয়ে!

 

“টুসু আমার চিন্তামণি
মাটির কথা শোনে,
ঘাম পথে আসে মকর
আমাদের ফাগুনে।”

চলুন, বাঙালি অলস এবং ইতিহাস-বিমুখ, এই বদনাম ঘোচাতে একটু অতীত থেকে ঘুরে আসি। বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম আকর গ্রন্থ হল ‘শাক্ত পদাবলী’। সেখানে ‘আগমনী’ ও ‘বিজয়া’ দুই পর্যায়ে গিরিরাজ কন‍্যা ঊমার বছরের শেষে বাপের বাড়ি আসা ও ফের শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়াকে কেন্দ্র করেই ঘটনার ঘনঘটা। ঊমার আগমনকে ঘিরে তাঁর মা-বাবার আবেগের যে জোয়ার-ভাঁটা, তাও যত্ন সহকারে এবং মায়ার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন কবিরা। যদিও টুসুকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত মূল ধারায় লেখার ভাঁড়ার শূন্য। টুসু এক লোকদেবী। এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন উঠতে পারে। লোক গান, লোক কথা, লোক নাটক এবং অবশ‍্যই লোকদেবী; এসবই কি আসলে মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা? বাংলার তথাকথিত মূল সাহিত্যে টুসুর স্থান না পাওয়ার এটিই কি অন্যতম কারণ?

 

যাই হোক, আপাততঃ বিতর্কে না গিয়ে বরং ‘টুসু’ উৎসবের আমেজ খানিক উপভোগ করা যাক। গোটা পৌষ জুড়ে ঘরের বৌ আর মেয়েরা মিলে টুসুর আগমনের প্রস্তুতি নেয়। মাঠ থেকে সদ‍্য গজানো কচি আমন ধানের এক গোছা শীষ মাথায় করে এনে খামারে পিঁড়িতে রেখে দেওয়া হয়। অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তির দিন সন্ধ্যায় গ্রামের কুমারী মেয়েরা একটি পাত্রে চালের গুঁড়ো লেপে তাতে তুষ রাখেন। তুষের ওপর ধান, কাড়ুলি বাছুরের গোবরের মন্ড, দূর্বা ঘাস, আল চাল, আকন্দ, বাসক ফুল, কাচ ফুল, গাঁদা ফুলের মালা রাখা হয়। তারপর পাত্রটির গায়ে হলুদ রঙের টিপ লাগিয়ে সেটিকে কুলুঙ্গীর ওপর স্থাপন করা হয়। পাত্রের এই পুরো ব্যবস্থা প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে টুসু দেবী হিসেবে পূজিতা হন। কুমারী মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে টুসু দেবীর নিকট তাঁদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অভিজ্ঞতা সুর করে নিবেদন করেন। দেবীর উদ্দেশ্যে চিঁড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা সহকারে ভোগ নিবেদন করেন।

“লালমাটি আর শালবন
পিঠা মকর বাসি রে,
হামদের টুসু আইল ঘরে
মুখে লিয়ে হাঁসি রে।

আয়লো টুসু হামার ঘরে
বইসতে দিব পিঁঢ়া,
খাতে দিব গরম মুঢ়ি
সরুধানের চিড়া।”

টুসু উৎসব পালনের অন্যতম মহরৎ পৌষ মাসের শেষ চারটি দিন চাঁউড়ি, বাঁউড়ি, মকর এবং আখান নামে পরিচিত। চাঁউড়ির দিনে বাড়ির মেয়েরা উঠোন গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে পরিষ্কার করে চালের গুঁড়ো তৈরী করেন। বাঁউড়ির দিন অর্ধচন্দ্রাকৃতি, ত্রিকোণাকৃতি ও চতুষ্কোণাকৃতির পিঠে তৈরী করে তাতে চাঁছি, তিল, নারকেল বা মিষ্টি পুর দিয়ে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় ভাবে এই পিঠে গড়গড়্যা পিঠে, বাঁকা পিঠে, উধি পিঠে ও পুর পিঠা নামে পরিচিত। বাঁউড়ির রাত দশটা থেকে টুসুর জাগরণ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেয়েরা জাগরণের ঘর পরিষ্কার করে ফুল, মালা ও আলো দিয়ে সাজায়।

পৌষ সংক্রান্তির আগের রাতে মেয়েরা গোবর দিয়ে পৌষ বুড়ি তৈরী করেন। সন্ধ্যেবেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে গান করতে করতে সারা রাত পৌষ আগলায়। এই পৌষ আগলানোর মানে ফসল আগলানো। টুসু ঘরের মেয়ে, ফসল লক্ষী। তার কাছেই যত আবদার, অভিযোগ, তার কাছেই আনন্দের প্রকাশ। গানগুলিতে ঘটে তারই বহিঃপ্রকাশ।

“উপরে পাটা নীচে পাটা
তার ভিতরে দারোগা
ও দারোগা পথ ছাড়ে দাও
টুসু যাবেন কলকেতা
টুসু যাবেন কলকেতা
খিদে পেলে খাবেন কি?
আনগো টুসুর নতুন গামছা
জিলিপি ছাঁদা বাঁধে দি।”

 

গানে গানে শুরু হয় টুসু নিরঞ্জন-পর্ব। রঙিন সুদৃশ্য চৌড়লে চাপিয়ে টুসুকে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বড়ো জলাশয় বা নদীতে। সবেধন নীলমণি কন্যারত্নটিকে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার সময়, গ্রাম্য রমণীদের সে কি শোকবিহ্বল চেহারা! অশ্রুসিক্ত বদনে তখন সেই মন খারাপের গান,

“আমার বড়ো মনের বাসনা,
টুসুধনকে জলে দিবো না।”

শিলাই, কাঁসাই, সুবর্ণরেখার ঘাটে ঘাটে তখন কন্যা বিদায়ের আবেগঘন জলচিত্র।

“কাঁদছ কেনে সাধের টুসু
বড়ো দাদার হাত ধরে?
ই সংসারে বিটি ছেল্যা,
রহে কি বাপের ঘরে!”

তবে, বিসর্জনের মনভারি করা ব‍্যপারটাকে হালকা করতে পুকুরঘাটে একে অপরের টুসুর প্রতি বক্রোক্তির বন‍্যা বইয়ে দেয় মেয়েরা-

“আমার টুসু মুড়ি ভাজে
চুড়ি ঝনঝন করে গো
ঊয়ার টুসু হ‍্যাংলা মাগী
আঁচল পাইত‍্যে মাগে গো।”

ঠিক এরপরেই শুরু হয় ‘মকরডুব’। স্নানশেষে ছানাপোনারা কাঁপতে কাঁপতে আগের রাতে জমা করা কুলগাছের ঝাড়ের আগুনে গা সেঁকে নেয়। তাদের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে শাল-পলাশের গায়ে গায়ে। এরপরে সেই নদী বা পুকুরের জল নিয়ে বাড়ি ফিরলে তবেই বাঁউড়ির পিঠা খাওয়ার অনুমতি মেলে।

অনেক বছর আগের কথা। সেদিনও এমনই কোনও মকর সংক্রান্তির দিন ছিল। সে বছর দিল্লীর মুঘল সম্রাটের শাসন প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। প্রাদেশিক সুবেদারেরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বঘোষিত নবাব। এলাকা দখলের লড়াই চলছে। অষ্টাদশ শতকের এমনই এক ভয়ানক সময়ে বাংলার নবাব ময়ূরভঞ্জ রাজ্য আক্রমণ করে। ফিরে যাওয়ার পথে মুসলমান সৈনিকেরা মানভূমের কুর্মি অধ্যুষিত গ্রামে দিয়ে যেতে যেতে ব্যাপক লুন্ঠন চালায়। হাজার হাজার কুমারী কন্যা সেদিন মুসলিম স্পর্শ থেকে বিশুদ্ধ থাকার জন্য আত্মহত্যা করে। কুর্মি মুখিয়ার সুন্দরী তরুণী কন্যা টুসুকে অপহরণ করতে এলে আদিবাসী কুর্মি ও সাঁওতালেরা প্রাণপণ লড়াই করে। তবুও কন্যাকে ফিরে পাননি। সৈনিকেরা কন্যাকে নিয়ে বিজয় গৌরবে মুর্শিদাবাদে পৌঁছায়। নবাবের দরবারে এই ঘটনার কথা শুনে নবাব অখুশি হন। তিনি সৈনিকদের আদেশ করেন সসম্মানে কন্যাকে তার পিত্রালয়ে পৌঁছে দিতে। সৈনিকেরা তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিলেও তখনকার রক্ষণশীল সমাজ আর ফিরিয়ে নিতে চায়নি। অসহায় কন্যা দামোদরের ঘূর্ণি স্রোতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।

“জল জল করো টুসু
জলে তোমার কে আছে?
জলের তরে এত যে টান
জলে শ্বশুরঘর আছে?”

ঠিক এইরকম একটি মকর সংক্রান্তির দিন ছিল সেদিনও। ক্ষেতের ফসল তোলা হয়ে গেছে। চাষীর ঘরে ঘরে মকর স্নান করে নতুন পরিধান সবার গায়ে। পিঠে পুলি। এমনই আনন্দের দিনে হৃদয় বিদারক এই ঘটনা। এই করুণ পরিণতি কথা সমগ্র কুর্মি সমাজে গভীর শোকের ছায়া ফেলে। তারই স্মরণে প্রতি বছর এই দিনটিতে টুসু্র প্রতীকে কলঙ্ককে নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে বিশুদ্ধ কৌমারিত্বের ব্রত উদযাপন করে।

 

কেটে যায় বহু বছর। ধীরে ধীরে পশ্চিমী ছোঁয়া লাগে জঙ্গলে। পয়লা জানুয়ারিতে হ‍্যাপি নিউ ইয়ার করতে শহুরে বাবুরা জঙ্গলে আসে। কিন্তু আখানের দিনটাই যেন বেশি করে নতুন বছর হয়ে থাকে এখানে। ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে কার্ড বা স্মার্ট ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয় ঠিকই। কিন্তু বিনি সুতোর মালায় গাঁথা সেই যে, খুব চেনা একটা সুর। সেই সুরের মতই টুসু পরব-মকর পরব রয়ে যায়‌। খোঁপায় পলাশফুল গুঁজে গাঁয়ের বিটিছানাটা হাঁটু অবধি খাটো শাড়িতে এখনও নদীতে আসে, তাকে দেখে পাশের গায়ের ব‍্যাটাভছানাটার বুক এখনও কাঁপে। বেদ-পুরাণে নয়, সংস্কৃত স্তোত্রে নয়, বেণীমাধব শীলেও নয়, টুসু রয়ে যায় আমাদের মনে- আমাদের ঘরের বিটি হয়ে।টুসুর সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক? মকর-সংক্রান্তির দিন ভোরবেলা কাঁসাই-সুবর্ণরেখা-ডুলুং-তারা ফেণী-দোমোহানী-ভৈরববাঁক-কূপননদ-দামোদরের তীরগুলিতে যেতে হবে আপনাকে। দেখবেন, টুসুর কুটুমরা আপনাকে কেমন আপন করে নিয়েছে।

তথ‍্যসংগ্রহ ও সম্পাদনা – স্যান্ডি দাস

চিত্র ঋণ – সুদীপ পাত্র

 

Promotion