মেঘে ঢাকা তারা

রেল টিকিটে পেপার কাটিং করে ভারত সেরা সৌরভ আদক, স্পনসরের অভাবে কি খুন হবে বিশ্বরেকর্ডের স্বপ্ন?

 

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার এক অখ্যাত গ্রাম নসিবপুর। সেখানে থাকেন ভারতের এই কাগজ কাটা শিল্পের যাদুকর। ভারতীয় রেলের টিকিটে সৌরভ আদকের করা পেপার কাটিংয়ের যাদু রীতিমতো কথা বলে। শঙ্খ ঘোষ থেকে শচিন তেন্ডুলকর কিংবা শঙ্খ ঘোষ থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সবাইকেই তার কাগজ কাটা শিল্পে সামিল করেছেন। সমাজের জ্বলন্ত ইস্যুও উঠে এসেছে তার কাজে। ভারত রেকর্ড ইতিমধ্যেই সে গড়ে ফেলেছে, উঠেছে ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডসে নামও। এবার বিশ্ব রেকর্ড গড়তে চায় হুগলীর নসিবপুরের এই শিল্পী এবং এখানেই রয়েছে গল্পের মোচড়। কারণ এখানেই তার পেপার কাটিংয়ের যাদু খেয়েছে জোর ধাক্কা। এই মুহূর্তে সৌরভের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। দু’বেলা পেট ভরে খাবারও সবসময় জোটে না।  তাই নসিবপুরের এই নক্ষত্রের নসিবে কি সত্যিই বিশ্বরেকর্ড লেখা রয়েছে? তা ঠিক করবেন আপনারা। হ্যাঁ, সৌরভ শেষমেশ সাধারণ মানুষের কাছেই তার স্বপ্নের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানাচ্ছে।

 

কাগজ কাটা শিল্পের শুরু কবে থেকে?

এমনি ১২ বছর ধরে শিল্পকলার সাথে যুক্ত। তবে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে এই কাটাকুটি শিল্প করছি। চলতি বছরের মার্চে ৯ বছর সম্পূর্ণ হবে।

নিজের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কেন এরকম একটি ব্যতিক্রমী মাধ্যম বেছে নিলে?

ক্যানভাস ও রংতুলির সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যেই আটকে থাকতে চাইনি। তাই সেই গন্ডি থেকে বেরোতেই আমার এই কাগজ ও পাতা নিয়ে চর্চা।

এখনকার দিনে একজন শিল্পী বা সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে প্রতিভাটাই কি যথেষ্ট?

শুধুমাত্র প্রতিভা থাকলেই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়না। অনেক কষ্ট করেই তা অর্জন করতে হয়। আমিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নই। আমার আজ সামর্থ্য নেই বলেই অনেক পিছিয়ে। তাই শুধু প্রতিভা থাকলোই সম্ভব নয় রেকর্ড করার।

কখনও ভেবেছিলে নিজেকে একদিন এই সম্মানের জায়গায় দেখবে?

জীবনে কখনই স্কুল কিংবা কলেজেও প্রথম তো দূর অস্ত, প্রথম দশের মধ্যেও আসিনি। সে কী করে কাগজ কেটে দেশের মধ্যে প্রথম হল? আমার এই ২০০ টিকিট কেটে বিভিন্ন প্রতিকৃতি করতে প্রায় ৫০০ ঘন্টা সময় অতিবাহিত হয়েছে। ইচ্ছে রয়েছে বিশ্বরেকর্ড করার। ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড’ এর তালিকায় নিজেকে দেখতে চাই। যদিও স্পনসর না পেলে কখনই সম্ভব নয়। কারণ এই কাগজ কাটার জন্যে অনেক দামী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় এবং অন্যান্য সাজসরঞ্জাম তথা আয়োজনেও ভালো অর্থের প্রয়োজন হয়। জানিনা আগামীদিনে কতটা সাফল্য অর্জন করতে পারবো।

মূলতঃ তোমার এই পেপার কাটিংয়ের থিম কী?

ইন্ডিয়া বুক্ অফ্ রেকর্ড এ আমার থিম ছিলো, সর্বাধিক টিকিট কেটে প্রতিকৃতি তৈরী। তবে কাজের ক্ষেত্রে আমার সেভাবে নির্দিষ্ট থিম নেই। আমার মনে যা দাগ কাটে তাই নিয়েই আমি কাজ করা শুরু করে দিই।

ঠিক কী পদ্ধতিতে এই কাজ তুমি করো?

প্রথমে টিকিটে ডটপেন অথবা পেন্সিলে ছবি আঁকি। তারপরে জালির মধ্যে সূঁচ দিয়ে ফুটো করে কাঁচি দিয়ে কেটে চিত্র /প্রতিকৃতি তৈরি করি।

পেপার কাটিংকেই কি আগামী দিনে পেশা হিসেবে দেখতে চাও?

প্রতিটি শিল্পী কিংবা শিল্পকলার সঙ্গে যুক্ত মানুষই চায় তার শিল্প সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, যাতে আরও বেশি করে মানুষের সেই সৃষ্টির প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা জন্মায়। হ্যাঁ, অবশ্যই এই শিল্পকলাকে নিজের পেশা হিসেবেই দেখতে চাই।

 

পেপার কাটিংয়ের ক্ষেত্রে তোমার অনুপ্রেরণা করা?

আমার অনুপ্রেরণা বলতে গেলে গোটা ভারতের সেই তিন জন মানুষের নাম প্রথমেই বলা উচিৎ। প্রথমেই যার কথা বলব তিনি, ঋষিকেশ পোদ্দার। উনি স্পিড রানার তথা প্রচণ্ড গতিতে কাগজ কাটেন। এরপরে অলোক ভাটনগর যিনি প্রবাসী ভারতীয়। তিনিই প্রথম আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামাকে খুব ছোট্ট কাগজে প্রতিকৃতি হিসেবে কেটে তৈরী করেছিলেন। সর্বশেষে আসে সাধনা কুলকার্ণি উন্তু যিনি পাতা কেটে শিল্পকলা করে থাকেন।

শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি কী দায়িত্ববোধ রয়েছে?

কাগজ কাটা শিল্প সম্পর্কে শুধু বলবো, একদম শুরু থেকেই এই কাগজ কাটা শিল্পকলাকে শেখো। ধীরে ধীরে একে জানো, ভালোবাসতে থেকো। তথাকথিত রং তুলিতেই কেবল বন্দী থেকো না। তোমরা শিখলে তবেই শিল্পীদের শুধু অন্ন সংস্থান হবে তা নয়, এই শিল্পকলাটিও বেঁচে থাকবে। নয়তো একদিন এমন সময় আসবে যখন এটি বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যাবে।

সুস্থ সংস্কৃতি কি ক্রমশঃ হারিয়ে যাচ্ছে?

সুস্থ সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তির পথে। এখনও অনেকেই এই কাগজ কাটা শিল্পকলা সম্পর্কে সঠিকভাবে জানেনও না। হয়তো জানেনও না কতো ধরনের এবং কত রকমারী ইন্সট্রুমেন্ট কিনতে হয়। অনেকেই সস্তা ভাবেন, ভাবখানাও এমন যে ভাবেন ছবি কাটিং করতে কীই বা আর তেমন খরচ। তারা এতোটুকুও খোঁজ খবর নেন না, কেবলই বিনা পয়সায় কাজ করিয়ে নেওয়ার ধান্দা খোঁজেন।

স্বপ্ন কী?

স্বপ্ন ইজ্ঞিনিয়ারিং ছাত্র-ছাত্রী পড়ানোর এবং কলেজে অধ্যাপনার ইচ্ছে রয়েছে। লক্ষ্য বিশ্বরেকর্ড করার তথা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করার, কিন্তু কোনও রকম স্পনসর না পেলে কখনই আমার পৃথিবী জয়ের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

 

 

Promotion