Editorial

শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জের ছোট কল্যাণনগর গ্রামে। পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ৩৬০, মাস্টার বাড়ি ‘শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক’ (সাবেক নাজির রোড)। পড়াশোনার পাট শেষ করে ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের পরিচালক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতের অমিল হওয়ায় এক বছরের মাথায় তিনি সেই পদ থেকে ইস্তফা দেন। ললনা পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে কাজ করেছেন এক সময়। ললনায় কাজ করার সুবাদেই ১৯৬৯ সালে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বের করতে শুরু করেন ‘শিলালিপি’ নামে একটি পত্রিকা৷ মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এর সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন৷ তৎকালীন প্রগতিশীল ও সমাজসচেতন প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত শিলালিপি নজর কাড়তে শুরু করেছিলো প্রথম সংখ্যা থেকেই৷ ৬ দফা দাবিতে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সমাজতন্ত্রের প্রতিও আস্থাশীল হয়ে পড়েন তিনি।

১৯৭১ এর ডিসেম্বর মাস। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা। প্রায় ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের পর অনেকটাই বেকায়দায় তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। চারপাশে শুধু বুলেটের শব্দ আর বারুদের গন্ধ, চিৎকার, গোঙানি, রক্তস্রোত আর মৃত্যু৷ এরই মাঝে ললনা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম৷ শিলালিপির ওপরেও নেমে আসে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর খড়্গ৷ হাশেম খানের প্রচ্ছদ করা শিলালিপির প্রকাশিত একটি সংখ্যার বিরুদ্ধে জাতিগত সহিংসতার অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ করে দেয় পাকি সরকার৷ পরে প্রকাশের অনুমতি মিললেও পাকিস্তান সরকার নতুনভাবে সাজানোর শর্ত বেধে দেয়৷ সেলিনা পারভীন তাঁর ভাইয়ের ছেলের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে শিলালিপির সর্বশেষ সংখ্যা বের করেন৷ কিন্তু এর আগে প্রকাশিত সংখ্যার জন্যই সেলিনা পারভীন পাকিস্তান ও তাদের দালালদের নজরে পড়ে যান৷

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনের ১১৫ নং নিউ সার্কুলার রোডের বাড়ি থেকে তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন সেলিনা ছাদে একটা চেয়ার টেনে একটি লেখা লিখছিলেন। শহরে তখন কারফিউ চলছিলো। রাস্তায় সচেতন প্রহরায় পাকি সেনাবাহিনী, মিলিশিয়া ও তাদের বাঙালী দোসররা৷  পাকিস্তানী বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য তাগিদ দিয়ে তখন বিমান থেকে অনবরত চিঠি ফেলছে মিত্রবাহিনী। সেই সময় বাড়ির উল্টো দিকে খান আতার বাসার সামনে E.P.R.T.C-এর ফিয়াট মাইক্রোবাস ও লরি থামলো৷ সেই বাড়ির প্রধান ফটক ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেল কিছু আল-বদর কর্মী৷ তাদের সবাই একই রঙের পোশাক পরা ও মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা৷ সেলিনা পারভীনদের ফ্ল্যাটে এসে একসময় কড়া নাড়ে তারা৷ সেলিনা নিজে দরজা খুলে দেন৷ লোকগুলো তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। এরপর তারা সেলিনাকে তাদের সঙ্গে ধরে নিয়ে যায় ৷ ১৮ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনের গুলিতে-বেয়নেটে ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে৷ শীতকাতুরে সেলিনার পায়ে তখনও পরা সাদা মোজা দেখেই তাঁকে শনাক্ত করা হয়। মৃত সেলিনা পারভীনের দেহে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের ঘৃণ্য নির্যাতনের চিহ্ন দেখে আঁতকে উঠেছিলেন সবাই। শোনা যায়, তাঁর স্তন বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তারপর কেটে ফেলা হয়। আজিমপুর কবর স্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে ১৮ ডিসেম্বর এই শহীদ বুদ্ধিজীবীকে সমাহিত করা হয়৷

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের বাঙালিদের অভিভাবকশূন্য করার ছকের দরুণ যেসব উজ্জ্বল তারকা বাংলাদেশ হারিয়েছিলো তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেলিনা পারভীন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতি বছরই ১৪ ডিসেম্বরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখা এসব অস্বীকৃত সৈনিকদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেন বাংলাদেশীরা।

Promotion