দুই বাংলার পুজো পরিক্রমা ২০১৯

শান্তিপুরে জমিদার বাড়ির দুর্গা পুজো আজও হয় ঐতিহ্য মেখে!

কলমে সায়নী ভট্টাচার্য্য

নদীয়া জেলার প্রাচীন জমিদার পরিবার এই রায় বাড়ি। বিগত প্রায় ৫০০ বছরের বেশি বছর অতিক্রান্ত করেছে এই বাড়ির দুর্গোৎসব। যদিও এই বিগ্রহ পূজিত হয় রোজই, নিত্য পূজিত হন গৌর হরিও। এই বাড়ির আরেক দেবতা পূজিত হন বারাণসীতে, যিনি হলেন ভগবান শিব। তৎকালীন সময়ে জমিদার আনন্দবাবু এক সাধুর স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে মায়ের পূজো শুরু করার আদেশ পান। সাধু বলেছিলেন বর্তমানে হরিপুরের বাগদেবী মন্দিরের ওখান থেকে মাটি এনে মায়ের মূর্তি গড়তে। তার আগে কুলোয় মায়ের মুর্তি এঁকে পূজো হতো।

 

কথিত আছে এক জমিদার রামলাল বাচস্পতি জমিদার বাড়ির গৃহ দেবতাকে নিয়ে জলপথে ফেরার সময় মায়ের মুর্তি জলে কুলোয় ভেসে যাওয়া মায়ের রূপ দেখতে পান। মায়ের আদেশে তখন কুলোয় আঁকা মূর্তি হিসেবে পূজিত হতে থাকে জমিদার বাড়ির আরাধ্যা দেবী দুর্গা । সম্ভবতঃ জমিদার মতিবাবুর আমলেই মূর্তি পুজোর প্রচলন হয় । রথ যাত্রার পূণ্য লগ্নে মায়ের কাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দেবী মূর্তির নির্মাণ শুরু হয়। এই জমিদার বাড়ির এক কনিষ্ঠ সদস্য অনুপম রায়ের সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি জানালেন এই বনেদী পুজোকে ঘিরে থাকা প্রচুর অজানা কথা। পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বাড়ির সব মহিলারা মিলে আনন্দ নাড়ু তৈরি করেন। বেল গাছের নিচে মায়ের বোধন দিয়ে পুজোর সূচনা হয়, পরের দিন সকালে ওই বেল গাছের নীচেই মা ষষ্ঠীর পুজো হয়। ওই সন্ধ্যায় আবার বাড়ির কর্তারা কলা-বউকে স্নান করাতে নিয়ে যান পুকুরে। সপ্তমীর সকালে মায়ের পুজো শুরু।

অষ্টমীর সকালে মন্দিরের উঠোনে বাড়ির ও বাইরের লোকের সমাগমে এক নতুন পরিবেশ তৈরি হয় । কাঁসর-ঘন্টা, শাঁখ, উলু ধ্বনি ও পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে চলে মায়ের আরাধনা। মহাষ্টমীর দিন সন্ধি পুজো আরম্ভ হওয়ার মুহূর্তে বাজি ফাটানো হয়। মহা নবমীর সকালে দু’রকম মাছ সহযোগী খিচুড়ি, পঞ্চব্যঞ্জন, চচ্চড়ি, চাটনি, পায়েস দিয়ে মাকে আরতি করেন পুরোহিত । আঁখ ও চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয় মন্দিরের সামনের মাটিতে।  পুজোর সময় ১০৮ টি পদ্ম দিয়ে মেয়েরা সুন্দর করে পদ্ম ফুটিয়ে তোলেন। সেই পদ্মগুলিকে এক এক করে পুরোহিত মায়ের চরণের উদ্দেশ্যে অর্পণ করেন।

মহাদশমীর পুজো শেষে বাড়ির সকলে মিলে মায়ের সামনে পাত্রে রাখা জলে চোখে চোখ রেখে মা দুর্গার চরণ দর্শন করেন।  তার আগে বেল পাতায়, শ্বেতচন্দনে ডুবিয়ে ‘শ্রী দুর্গা সহায়’ কথাটি নিয়ে মায়ের চরণে দেওয়া হয়। তারপর প্রসাদ খেয়ে যে যার যার ঘরে গিয়ে বিকেলে মাকে বরণের আয়োজন করে। বাড়ির সকল বয়োঃজ্যেষ্ঠদের দিয়ে মা-কে বরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। তা সমাপ্ত হয় সর্বকনিষ্ঠকে দিয়ে। জমিদার বাড়িতে মায়ের বরণের সময় করবী ফুলের ছোটো ডালে সাজা পানের মিনি লবঙ্গের সাহায্যে করবী পাতা ঝুলিয়ে দিয়ে ওই ডাল মায়ের দশ হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। বরণ শেষে সকল বধু ও মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। বাড়ির সদস্যরা একে অপরের গাল সিঁদুরে রাঙিয়ে নতুন সাজে সুসজ্জিত হয়ে ওঠেন। তারপর মায়ের বিসর্জনের বিষাদের সুর আকাশ বাতাসকে অনুরণিত করে। মনটা হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত। এভাবেই রায় বাড়ির মায়ের নিরঞ্জন প্রক্রিয়ার ঘটে। উমা ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় আবারও অপেক্ষার দিন গোনা শুরু হয়।

Promotion