Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
অবহেলায় ইতিহাসের স্বর্ণযুগ - Exclusive Adhirath
জগতের বাহার

অবহেলায় ইতিহাসের স্বর্ণযুগ

ছেলেবেলা থেকেই ঐতিহাসিক স্থান, প্রাচীন মহল বা ভগ্ন অট্টালিকা-মন্দির আমাকে টানে। বোলপুরের রায়পুর-সুপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত রায়পুর গ্রামে রয়েছে এরকমই এক নিদর্শন। সেখানকার লর্ড সিনহার জমিদারি ও রাজবাড়ি সম্পর্কে ছোট থেকেই মা-ঠাকুমার মুখে অনেক গল্প শুনেছি। তাই মা-বাবার কাছে এসে একদিন তাদের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েই পড়লাম সেই ইতিহাস ছোঁয়ার লক্ষ্যে।  মোক্ষদ্বার বা সুরথেশ্বর মন্দিরকে পিছনে ফেলে রায়পুর গ্রামের রাস্তা ধরলাম। একটু ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল অনেকটা জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনমহলা সুবিশাল ভগ্ন অট্টালিকা।  প্রায় দু’শো বছরের পুরনো রাজবাড়ি আজও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ভীষণভাবেই। ভেতরে ঢুকেই বিশাল এক প্রাঙ্গণ চোখে পড়লো। তাঁর একপাশে রয়েছে বহুদিন ধরে ব্যবহার না করা একটি কুয়ো। প্রাঙ্গণের চারপাশে সারি সারি দালান ঘর। তীব্র ফুলের গন্ধ  অনুসন্ধানী চোখকে ছাদের কার্নিশের দিকে তাকাতে বাধ্য করলো। একটি একটি স্বর্ণচাঁপা ফুলগাছ সেই কার্নিশ ছাড়িয়ে উঠে গিয়েছে আকাশের দিকে। এককালের এই গৌরবময় রাজবাড়ির আজ শুধু কঙ্কালটাই দাঁড়িয়ে আছে। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম, যেটি আরও বিপজ্জনক স্থান। দেখলাম বেশিরভাগ ঘরের ওপরের ছাদ ভাঙা। এখান থেকে গোটা রাজবাড়িটাকেই এক ভুতুড়ে বাড়ি বলে মনে হচ্ছে। কে জানে? রাতে এখানে কেউ থাকলে হয়তো শুনতে পাবেন নাচমহল থেকে ভেসে আসা সঙ্গীতের মূর্ছনা অথবা অতৃপ্ত আত্মাদের ফিসফিস। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম জমিদারদের কূলদেবতা নারায়ণের মন্দিরে। বিরাট চাতালের ঠিক মাঝেই মন্দিরের অবস্থান। এখানেই নাকি বিখ্যাত ‘খন্ডহর’ সিনেমাটির শুটিং হয়েছিল। এই চাতালে বসে জরাগ্রস্ত রাজবাড়ির দিকে তাকিয়ে মন চলে গেল দু’শো বছর আগের ইতিহাসকে খুঁজতে।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির জমিদার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই সময় বোলপুরে বিশ একরের এক বিশাল জমি পছন্দ হয়ে যায়। জমিটি ছিল ভুবন ডাকাতের বাড়ির কাছে। মহর্ষি দেখলেন সেখানে ছাতিম গাছের তলায় বসে নিরুপদ্রপে ধ্যান করা যাবে। এই স্থানটি ছিল রায়পুরেরই এক শরিক জমিদার ভুবনমোহন সিংহের তালুকের অন্তর্গত। উদার মানসিকতার মানুষ ছিলেন এই ভুবনমোহন। তিনি বন্ধু দেবেন্দ্রনাথকে দান করে দিতে চাইলেন এই জমি। ওদিকে নাছোড়বান্দা দেবেন্দ্রনাথও কিছুতেই বিনা পয়সায় জমি নিতে নারাজ। অবশেষে নামমাত্র দামে জমিটি ভুবনমোহন হস্তান্তরিত করলেন বন্ধুকে। ওই জমিতেই শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, যা আজ বিশ্বভারতী নামে পরিচিত সকলের কাছে।

মন চলে যায় ১৮৬৩ সালের ২৪ শে মে জমিদার সিতিকণ্ঠের অন্দরমহলে। তিনি আজ বড়ই খুশি। তাঁর পুত্রসন্তানের জন্ম হয়েছে। কূলদেবতার পায়ে পুজো দিয়ে নাম রাখা হল সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহ। সেদিন কি কেউ ভেবেছিল যে এই ছেলেই সাড়া বিলেত জুড়ে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন? ইনি বিখ্যাত হন লর্ড সিনহা নামে। ইংল্যান্ডে ৫ বছর ধরে আইনে শিক্ষা লাভ করে তিনি ফিরে আসেন দেশে। ইনিই প্রথম ভারতীয় যাকে ব্রিটিশরা অ্যাডভোকেট জেনারেল অব বেঙ্গল পদে বসান। তৎকালীন সরকার বাহাদুরের থেকে তিনি ‘নাইট’ উপাধিও লাভ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহ পরিচিত হন লর্ড সিনহা নামে। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রায়পুরের রাজা ঘোষণা করেন। ১৯১৯ এ ব্রিটেনের সংসদের হাউস অব লর্ডসের ভারতীয় সদস্য হন। ১৯২৮ এর ৪ মার্চ রায়পুরের এই ভূমিপুত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

হারিয়ে গিয়েছিলাম কোন সুদূর অতীতে রাজবাড়ির আনাচে কানাচে। মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরল, ফিরলাম বাস্তবের মাটিতে। এবার রওয়ানা দিতে হবে বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিন্তু ফিরতে ইচ্ছে করে না। প্রতিটা দেওয়াল, খিড়কি, কড়ি-বরগা, দালান-মহল যেন আরও কতো কী বলতে চায়। হয়তো আবারও আরেক দিন আসতে হবে সেসব অলিখিত ইতিহাস খুঁজতে।