কাটাকুটি

রিভিউঃ সিন বাই সিন ও আমাদের মনস্তত্ত্ব

শুরুটা করবো ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ দিয়ে। ‘তখন আঁধার ছিলো’ বলে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছি এই গণমাধ্যমে। এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে আমাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। অবিভক্ত ভারতবর্ষের উপেক্ষিত ও আঁধারাচ্ছন্ন একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে এর কাহিনী। ওই সময়ের মানুষদের রাজনৈতিক বা সমাজকেন্দ্রিক মনস্তত্ব বুঝতে আমি বাড়ির পর বাড়ি খুঁজে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক সন্ধান করেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির জন্য ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলধারার বা ভিন্নধারার প্রায় জনা বিশেক রাজনীতিবিদের জীবন নিয়ে চর্চা করেছি। অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, কিছুটা বিবর্তন আসলেও আজও এই অঞ্চলের মানুষজন নিজেদের অধিকার নিয়ে খুব বেশি একটা চিন্তিত নন। এদের বশ করে রাখে অসংলগ্নভাবে গজিয়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ। যারা নিজেদের আখের গোছানোর বন্দোবস্ত করতে করতে তাদের ‘পোষ্য’ জনমানুষের কথা ভাবার সময়ই পান না। গলা উঁচিয়ে কেউ নিজের প্রশ্নটার উত্তর জানতে চান না। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো ঘাড় নাড়িয়ে সকল কথায় সায় দিয়ে নিজেদের অসাড় মস্তিষ্কের নিষ্ক্রিয়তা আর অসচেতন নাগরিক সত্ত্বার পরিচয় তুলে ধরেন। নেতাজী সুভাষ বোস, মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান বা জিন্নাহদের নিয়ে আমি চর্চা করেছি। তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের যে অপশাসনের বিরুদ্ধে তারা লড়াই শুরু করেছিলেন আজও সেই অপশাসনের ছায়া আমাদের এই অঞ্চলের তথাকথিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর পিছু ছাড়েনি। সিন্দাবাদের ভূতের মতো ঘাড়ে চেপে আছে। তবে স্বাধীনতা মানে কি শুধুই একটি পতাকা আর নিজেদের শাসন কায়েম করা? স্বাধীনতা মানে কি দলিলের হাতবদল? লাখখানেক মাইলের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক মালিকানা বদলের নামই কি স্বাধীনতা?
রিভিউ লিখতে শুরু করে কি বাওয়ালটাই না করলাম! পাঠকদের অর্ধেক হয়তো এতক্ষণে লেজ গুটিয়েছেন। আমার চৌদ্দ পুরুষের পূজো করেই থামেননি, বেশি মনোযোগী আর আগ্রহীরা হয়তো এডিটর বাবুর বংশপ্রবাহেও টান দিয়েছেন। আমি বরাবরই গর্তজীবী মানুষ। আমার গর্তে এসে কেউ না খোঁচালে মুখ বাড়িয়ে প্রতিবাদ করিনা। তবে আজ করবো। যারা এমনটি ভেবেছিলেন প্রতিবাদটা তাদের উদ্দ্যেশ্যেই। এতক্ষণের প্রস্তাবনাটা কোনো ভূমিকা নয়। এটি বাংলা তথা ভারতবর্ষের ৯৮% মানুষের দুঃখ দুর্দশার জিনোম রহস্যের সহজ সমাধান। এ প্রসঙ্গে আবার ফিরবো। তবে এর আগে মূল আলোচনায় ঢোকা প্রয়োজন।
এক্সক্লুসিভ অধিরথে আমার করা বেশ কয়েকটি রিভিউ গিয়েছে। দুই বাংলার অনেকেই ক্ষুদেবার্তা আর ফোনকলের মাধ্যমে বাহবা দিয়েছেন। আমি বরাবরের মতোই বিস্মিত হয়েছি। আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমি একটা পুড়ে যাওয়া ভিয়েতনামকে দেখতে পাই। সেখানে আমার পাঠকরা আমার মাঝে কি এমন খুঁজে পেয়েছেন তা নিয়ে সত্যিই অনুসন্ধান করা উচিত। এডিটর বাবুর আদেশে এবার আরও একখানা রিভিউ লিখতে হচ্ছে। এবারের রিভিউটা একটি শর্টফিল্ম নিয়ে। রিভিউটি লিখার আগে আমার জেলার সরকারি গণগ্রন্থাগার আর আমার ক্ষুদ্র পাঠাগারে খানিক হোমওয়ার্ক করেছি। তার থেকে শর্টফিল্ম বলতে যতটুকু বুঝতে পেরেছি তা হচ্ছে এটি ফিল্ম বা সিনেমারই একটি ক্ষুদে সংস্করণ। একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ফিল্মের সকল আবেদনই তাতে থাকবে। তবে ব্যাপ্তিটা কম হবে এই যা। পরিচালক তার মুন্সিয়ানা দেখাবেন ঘটনাপ্রবাহের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়ে।
ইদানীংকালে দুই বাংলায়ই অনেক শর্টফিল্ম হচ্ছে। আমার ধারণা ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ নীতিতে বিশ্বাসীরাই এই স্রোতে বেশি ভিড়ছেন। দুর্বোধ্য আর বস্তাপচা স্ক্রিপ্ট দিয়ে মানুষের অঘোষিত ও অস্বীকৃত মৌলিক কিছু চাহিদাকে লক্ষ্য বানিয়ে তারা যে অখাদ্যগুলোর জন্ম দিচ্ছেন তা ‘শর্টফিল্ম’ বা ‘ফিল্ম’ এর সুস্থধারার ভেতর পড়ে কিনা আমি তা জানি না। তবে দুঃখের মধ্যে খুশির খবর এই যে, কিছু ব্যতিক্রমধর্মী কাজও হচ্ছে। সবাই অর্ধ-উলঙ্গ গতর দেখানোর মাধ্যমে শর্টফিল্মের নামে পানু ভিডিও তৈরির প্রতিযোগিতায় নামেননি। কেউ কেউ ফিল্মি ভঙ্গিতেই আশেপাশের বাস্তব কিছু ঘটনা আর তার প্রভাবকে উপজীব্য করে অসাধারণ কিছু কাজ করে চলেছেন। দুঃখের বিষয় হলো এরা সংখ্যায় অতি নগণ্য এবং কর্পোরেট পৃথিবীতে এরা অনেকটাই কোণঠাসা। নিজেদের মেলে ধরার জন্য এদের পাশে দাঁড়ানোর মতো ‘হাবিজাবি স্পনসর’ নেই। কাজেই অপ্রিয় হলেও সত্যি এটাই যে এদের কাজ করার জায়গা প্রশস্ত হলেও সামর্থ্যের জায়গাটা সীমাবদ্ধ।
এরকমই একটি উদাহরণ হতে পারে ‘সিন বাই সিন’ ইউনিট৷ শর্টফিল্মটির সংলাপ লিখেছেন অনুরাগ রায় চৌধুরি। আমি জানি না ইনি রাজনৈতিকভাবে কোন মতাবলম্বী। তবে যে কথাগুলো তিনি চরিত্রগুলোর মুখ দিয়ে বের করে এনেছেন তা নিতান্তই প্রশংসাযোগ্য এবং সত্য। ড্রিমলাইন ফিল্মস প্রোডাকশন নামের ইউটিউব চ্যানেলে তোলা এই শর্টফিল্মটির পরিচালনা করেছেন মন্দার ব্যানার্জী এবং স্বরূপ পাল। শর্টফিল্মটির প্রযোজনা করেছেন শুভঙ্কর এবং শতরূপা। স্বরূপ পালের লেখা মূল কাহিনীকে ভিত্তি করে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন অনুরাগ রায় চৌধুরী৷ স্থিরচিত্রের দায়িত্বে তপেশ কুমার দাস। সিন বাই সিন ইউনিটের প্রোডাকশন হেড ছিলেন সন্দীপন রায়। আর্টিস্টদের মেকআপ ও অঙ্গসজ্জা করেছেন সুদীপ্ত। কাহিনীটিকে অভিনয়ের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছেন শম্ভুনাথ, রীতিশা, অলকানন্দা এবং অনির্বাণ।
প্রথম দৃশ্যে দেখা গিয়েছে বাসের পেছন ছুটে ঋষিকেশ বাবু যখন বাসে উঠতে ব্যর্থ হলেন তখন পরবর্তী বাসের জন্য অপেক্ষা করার উদ্দ্যেশ্যেই যাত্রী ছাউনিতে গেলেন। দুজন যুবতী সেখানে বসেছিলেন আগে থেকেই যাদেরকে আপাতদৃষ্টিতে ‘আধুনিক’ ভারতবর্ষের বাহ্যিক রূপে অনুপ্রাণিত বলেই মনে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে যে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছে তাদের রাজনৈতিক ইস্তেহারের প্রথম প্রোপাগান্ডা এই জনজীবনের আধুনিকায়নকে কেন্দ্র করেই করা হয়েছে। আমি আধুনিকতা নির্ণয়ের সূচক জানি না। তবে নিজে যতটুকু বুঝতে পারি তা হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে দুধের বদলে ঘোল খাওয়ানোটা যে খুব কঠিন ব্যাপার নয় সেটা রাজনীতিবিদেরা এতদিনে ভালোই আয়ত্ত্ব করে ফেলেছেন। তথাকথিত সে আধুনিকায়নে এই অঞ্চলের মানুষজন নিজেদের চিন্তাচেতনার স্বকীয়তা হারাতে হারাতে অদ্ভুত এক মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কটে ভুগছেন যা এই শর্টফিল্মটিতে বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। এত সূক্ষ্ম একটি বিষয় এতটা সহজাত ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তোলার জন্য আমি অলকানন্দা, রীতিশা এবং বিশেষ করে শম্ভুনাথ বাহবা দাবী করে। পাশাপাশি দেশি বিদেশি ব্যবসায়িক শিল্প গোষ্ঠীগুলো রাজনীতিবিদদের চরিত্রহীনতাকে সম্বল করে রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায় পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে সাধারণ জনগণের উপর যে কৃত্রিম প্রহসন চালাচ্ছেন তাও ঠোঁটকাটা জবানিতে ফুটে উঠেছে।
রীতিশা এবং অলকানন্দার বাস্তবসম্মত অভিনয় পুরো গল্পটিকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেছে বলে আমার ধারণা। গল্পের আবেদনটা যেন ঠিক পরিমিত মাত্রাতেই ফুটে উঠছিলো। তাদের সংলাপগুলোতে একটি স্বভাবজাত সারল্য লক্ষ্য করেছি। এটা গল্পের যৌক্তিক উপস্থাপনার জন্য পরিচালকের একটি কৌশলও হতে পারে। যদি তাই হয়ে থাকে তবে ধন্যবাদের আংশিক তাঁরও প্রাপ্য। তবে অলকানন্দের অভিনীত চরিত্রটি আরেকটু বিস্তৃত হতে পারতো। পুরো আয়োজনের এ অংশটিতেই আমার বেখাপ্পা লেগেছে। অলকানন্দের চরিত্রটির আরও একটু বর্ণনা বা এই শর্টফিল্মে তার চরিত্রটিকে নিয়ে আসার উদ্দ্যেশ্যটুকু ঝাপসাই রয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। সাধারণ দর্শকদের মনের আকাঙ্ক্ষা এখানে বাকির খাতায় রয়ে গেছে বলে আমার ধারণা। যেহেতু এই আয়োজনটি সকলের জন্য কাজেই বিষয়টিকে আরও একটু সহজ করে দেখানো উচিত ছিলো। যাই হোক, এরকম সকল খুচরো সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে শম্ভুনাথের অভিনীত চরিত্রটি। শর্টফিল্মটির প্রযোজকদের একজন শুভঙ্করের কাছ থেকে জেনেছি ইনি অভিনয় জগতের মূলধারার কেউ নন। তবে অভিনয়ের প্রতি তার ভালোবাসার কথা শুনেছিলাম। শর্টফিল্মটি দেখে শেষ করার পর বুঝেছি এটা কোনো সৃজনী আবেগ নয়। মনের ভেতর থেকে ঈর্ষণীয় অভিনয়সত্ত্বার অধিকারী এই লোকটির প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণাম রইলো। যতটুকু স্নেহে তিনি এই শর্টফিল্মের সমাজসচেতন মনোবিজ্ঞানীর চরিত্রটিকে লালন করেছেন তা সচরাচর দেখা যায়না। পূর্বে অনেক থিয়েটার করলেও ক্যামেরার সামনে এটি নাকি তার প্রথম উপস্থিতি ছিলো। রিভিউ লেখার আগের হোমওয়ার্কের অংশ হিসেবে পুরো শর্টফিল্মটি এখন পর্যন্ত বার দশেক দেখে নিয়েছি আমি। যদিও এখনও কথাটা আমার বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে৷ অলকানন্দার উপস্থিতি এই শর্টফিল্মে অন্য রকম একটি রহস্য যোগ করেছে। এই শর্টফিল্মের পুরো ব্যাপ্তিতে চিত্রগ্রাহক তার যান্ত্রিক চোখের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন যা অত্যন্ত ভালো লেগেছে।  ‘আমরা সবাই একা’ এই ধ্রুব সত্যটিকে এই সময়ের প্রেক্ষিতে বেশ বস্তুনিষ্ঠভাবেই ফ্রেমে নিয়ে এসেছেন পুরো ইউনিট। যেটি এই শর্টফিল্মের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে আমি মনে করি।
সেরা অংশঃ শেষের ছয় মিনিট।
রেটিংঃ ৪.৬/৫
সেরা চরিত্রঃ যৌথভাবে ঋষিকেশ বাবুর চরিত্রে শম্ভুনাথ এবং রীতিশা।
এ পর্যায়ে আবার প্রথম প্রসঙ্গে ফিরে যাবো। আমি খুবই খুশি হবো যদি এই রিভিউটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই আমায় গালাগাল করে বলেন, ভারতীয়দের রাজনৈতিক মনস্তত্ব নিয়ে আমি যে মতবাদ ব্যক্ত করেছি তা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। ভারতের মানুষ আজ আর অযথা মাথা নোয়ায় না। সমাজ বাস্তবতার চিন্তাও আজকাল এই অঞ্চলের মানুষ করে থাকেন। কিন্তু সেটা হওয়ার নয় আমি জানি। আজও এই অঞ্চলের মানুষ জেগে থেকে ঘুমুচ্ছে৷ এই ঘুম ভাঙাতে হবে। বিকট শব্দের পাগলাঘন্টি বাজিয়ে এই অঞ্চলের মানুষদের আশু বিপদের পূর্বাভাস দিতে হবে। তাদের আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াতে শেখাতে হবে। নিজেদের হিস্যা নিজেদের আদায় করার মানসিকতা গড়ে তুলতে প্রেরণা দিতে হবে। কেন যেন মনে হচ্ছে ‘সিন বাই সিন’ এর জন্মদাতাদের মতো মানুষরাই সেদিন এই পাগলাঘন্টিটা বাজাবেন৷ ড্রিমলাইন ফিল্মস আদতেই একটা নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে, এবার শুধু ধারাবাহিকতাটা রক্ষা করাই কর্তব্য।
পুনশ্চঃ আমার নিয়মিত পাঠকরা হয়তো জানেন আমি রিভিউয়ে একজন দর্শকের চোখে আয়োজনটিকেই তুলে ধরি। বৃথা বগলবাজি করি না। কোনো ধরণের পেইড প্রোমোশনিংয়ের খাতিরেও রিভিউ করিনা। খারাপ জিনিসকে অকারণে ভালো যেমন বলি না তেমনি ভালো জিনিসকে ভালো বলতেও কার্পণ্যবোধ করি না। কাজেই পাঠকদের বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

Promotion