কাটাকুটি

রিভিউঃ ‘বান্ধবীসুখ’ ও সমসাময়িক ভাবনা

ইদানীং বেশ কিছু রিভিউ লিখছি। কিছু অনুরোধে আর কিছু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। কলকাতা ভিত্তিক দুই বাংলার এই সংবাদমাধ্যমটিতেই যাচ্ছে সেগুলির বেশিরভাগ। আমি প্রতিষ্ঠিত কারোর রিভিউ করিনা, নতুনদের রিভিউ করতেই পছন্দ করি। শিল্পাঙ্গনের নতুন এই প্রতিভাদের জন্য মাঝে মাঝে খুবই খারাপ লাগে। কিছুটা অভিযোগও জমে। কার বিরুদ্ধে সেটা জানি না, কিন্তু জমে। এসব প্রতিভারা আসলে সরকারি-বেসরকারি অনুদান চায় না। তাঁরা চায় শুধু কয়েকজন এসে পাশে দাঁড়াক, লড়াইটা জারি থাকুক। যাই হোক ভূমিকা অনেক হয়েছে এবার প্রসঙ্গে আসি। হোয়াটসএপ করে এক্সক্লুসিভ অধিরথের এডিটর বাবু জানালেন একটি গানের মিউজিক ভিডিওর রিভিউ করতে হবে৷ কিছু ব্যস্ততা আর সমস্যার জন্য গানটি নিয়ে বসা হয়নি। দুই দিন বাদে মিউজিক ভিডিওর অন্যতম প্রাণভোমরা কনীনিকাদি মেসেঞ্জারে মিউজিক ভিডিওর ইউটিউব লিংক পাঠালেন। প্লে করে মিনিট খানেক শোনার পরই সিদ্ধান্ত নিলাম রিভিউটা আমি এখনই করছি না। পশ্চিমের মৃদুমন্দ শীতল বাতাস যখন আমার ক্ষুদ্র ঘরটিতে প্রিয় আগ্রাসন চালাবে তখন গায়ে একটা ভারী চাদর চাপিয়ে এক মগ গরম কফি নিয়ে বারান্দায় বসবো। কানে ইয়ারফোন গুঁজে নিয়ে মৃদু ভলিউমে এই শিল্পের স্বাদ না নিতে পারলে হয়তো বা ঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবো না। এ পর্যায়ে পাঠকদের বলে নেয়া প্রয়োজন আমি এক্সক্লুসিভ অধিরথের একজন স্বেচ্ছা বাংলাদেশ প্রতিনিধি। আর এই রিভিউ কোনো ধরণের পেইড প্রমোশন নয়। কাজেই পাঠকদের বিভ্রান্ত করবো বা করতে চাইবো, এমনটা ভাবা উচিত হবে না। একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই সবার সামনে গুছিয়ে তুলে ধরবো। আমি ব্যক্তিগতভাবে দুই বাংলার কাঁটাতারের বিভাজনকে জন্মের পরের এই আঠেরো বছরে তেমন একটা মেনে নিইনি। একই ভাষা সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে কোনো নিয়ামকই প্রভাবিত করতে পারে না৷ কাঁটাতারের বেড়া? সে তো কোন ছাড়! কাজেই আমার ফোনের প্লে-লিস্টে শুধু ইমরান, পূজা, ন্যান্সি, হৃদয় খান, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সৈয়দা পারভীন বা কণারা থাকেন না। অরিজিত সিং, জয় সরকার, মান্না দে, জিৎ গাঙ্গুলী, মোনালী ঠাকুর, শান্তনু বা আকিব হায়াতরাও থাকেন। এটা জানাতে পেরে আনন্দিত হচ্ছি যে সেই তালিকায় এখন ‘বান্ধবীসুখ’ ইউনিটও জায়গা করে নিয়েছে। এই গানটি শুনে প্রথম নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ব্যক্তিগত কিছু ঘটনা মনে পড়েছে। তারপরই যেটা মনে পড়েছে সেটা হচ্ছে বোদ্ধারা আসলে ঠিকই বলেন। গান আদতে মনের কথাই বলে। যদিও সেটা এই ‘উলালা উলালা, খায়ালা মাইরালা’র যুগে খুবই দুষ্প্রাপ্য, তবুও আজও এটি সত্যবাক্য হিসেবেই অধিক গ্রহণযোগ্য। একেবারে ফেলনা নয়। ‘বান্ধবীসুখ’ নামের গানটির ভোকালে ছিলেন শুভ্রজিৎ পাণ্ডা, লিরিক লিখেছেন অনিকেত দাস।

এখানে একটু বলে রাখি, গানের কথাগুলিই এই অভিনব আয়োজনটির প্রাণভোমরা। এরকম বস্তুনিষ্ঠ আর বাস্তবঘেঁষা লিরিক কমই পাওয়া যায় আজকাল। গানটির সুর করেছেন অনিকেত দাস এবং শুভ্রজিৎ পাণ্ডা। সঙ্গীত আয়োজন করেছেন ঋষি পাণ্ডা এবং বেশ ভালোভাবেই করেছেন। মিউজিক ভিডিওর ডি.ও.পির কাজ সামলেছেন গৌরব দাস। এডিটিং করেছেন শুভম হালদার। গানটির আপাত বাস্তব রূপটি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন অনিকেত দাস এবং কনীনিকা। গানের বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কনীনিকার স্বভাবসুলভ উপস্থিতি দর্শকদের মনে নিজের জীবনের সেই না পাওয়া প্রেমের বিরহ নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে। অন্য চরিত্রে অনিকেতের সাবলীল অভিনয় পুরুষচরিত্রের স্বাভাবিক উদাসীনতারই প্রতিনিধিত্ব করে৷ দরদী কণ্ঠ আর হৃদয়ছোঁয়া সুর এই গানের প্রধান সম্পদ। ইন্ডিয়ান ও ওয়েস্টার্ন ইন্সট্রুমেন্টের ফিউশন করা হয়েছে এর মিউজিকে। রোমান্টিক ধাঁচের এই গানটির অন্তরা আকর্ষণীয়। না পাওয়া প্রেমিকার জন্য অস্থির প্রহর গোনা হয়েছে গানটিতে। কিছুটা ঔদাসীন্যও প্রাধান্য পেয়েছে। সাড়ে তিন মিনিটের কাছাকাছি দৈর্ঘ্যের গানটির শুরু ও শেষটা করেছেন শুভ্রজিৎ একাই। মিউজিক ভিডিওটিতে সমসাময়িক একটি টুকরো বাস্তব গল্পকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। গানের সাথে মিউজিক ভিডিওর মান সমতা গড়তে পারেনি। গানের অনুপাতে মিউজিক ভিডিওটির আরেকটু ভালো ও আকর্ষণীয় হওয়া উচিত ছিলো। গল্পের প্লট সুন্দর হলেও বর্ণনার ধরণ আর চিত্রধারণ অনেকটাই গা ভাসানো বলে মনে হয়েছে৷ তবে নতুন হিসেবে ‘বান্ধবীসুখ’ ইউনিটের এই কাজটুকুও নিতান্তই প্রশংসাযোগ্য৷ ‘বান্ধবীসুখ’ এর সেরা অংশ: “আস্ত একটা গল্প লেখে বদরাগী মন- জমিয়ে রাখো অনেক কথা ভুলের মাঝে! অতীতগুলো ফ্ল্যাশব্যাকেতে লুকিয়ে থাকে, ভিড় জমে যায় বুকের মাঝে খুব সচেতন। অতীতগামী ফ্ল্যাশব্যাকেতে খুব অভিমান!”

কিছুক্ষণ সময় বের করে যদি নিজের সাথে বোঝাপড়া মেটাতে চান, তবে এই গানটি শুনতে পারেন। রিভিউ পর্ব শেষে ভিন্ন একটি বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করতে চাই। জানি না সেটি এই বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক হবে কিনা৷ ‘বান্ধবীসুখ’ ইউনিটের মতো আরও অনেক ইউনিট লুকিয়ে আছে এই বৃহত্তর বাংলায়। যাঁরা নিজেদের বাংলা সংস্কৃতির সেবক বা শিল্পবোদ্ধা বলে দাবি করেন তাঁদের কাছে একটি ছোট অনুরোধ রাখবো। স্রোতের সঙ্গে গা না ভাসিয়ে যাঁরা ব্যতিক্রমধর্মী এই উদ্যোগগুলো নিচ্ছেন, তাঁদের পাশে এসে দাঁড়াবেন-ব্যাস, এটুকুই। ভয় নেই! এঁরা আপনাদের থেকে কড়কড়ে নোট বা ব্যাংক চেক চায় না।নিজেদের পাশে আপনাদের অভিভাবকসুলভ উপস্থিতি কামনা করে। এক ভাঁড় চা আর প্রিয়দের সঙ্গই যথেষ্ট এঁদের জন্য।

Promotion