Editorial

পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাতেই কি লুকিয়ে থাকে ধর্ষণের বীজ?

 

কলমে অনিন্দিতা হাজরা

‘ধর্ষণ’ শব্দটি এখন খবরের কাগজের পাতায়, দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলে এমনকি চায়ের দোকানেও আলোচিত একটি বিষয়। চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রায়শই চলে ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে। কত রাত পর্যন্ত সেই মেয়ে বাড়ির বাইরে থাকে এবং তার পুরুষ বন্ধুর সংখ্যা কতো, এসবের কষ্ঠী পাথরেই মাপা হয় তার চরিত্র। অন্যদিকে ধর্ষকরা খারাপ, তাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পরিবর্তন দরকার এইসব আলোচনা খুব কমই হয়। সমাজে পুরুষ তো থাকবেই, তাদের ইচ্ছে মতো তোমাকে আঁচড়াবে, তোমার শরীরে তোমার অধিকারের থেকে তাদের অধিকার আসলে বেশি। তুমি নারী তাই ভদ্রভাবে থাকার দায় তোমারই বেশি। তুমি রাত তিনটের সময় ফিরবে চোরের মত ভয়ে ভয়ে কিংবা বাড়ি থেকেই বেরোবে না। তোমার সমাজে এভাবেই তুমি নিরাপত্তাহীন হয়ে বেঁচে থাকবে।

 

আমার প্রশ্ন নির্ভয়া থেকে প্রিয়াঙ্কা রেড্ডি সবার পোশাক যথেষ্টই ভদ্র ছিল। তারা তাহলে ধর্ষিত হলেন কেন? কেন আট মাসের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা ধর্ষণের শিকার হন? এক্ষেত্রেও কি পোশাক দায়ী? আসলে আমাদের সমাজের রন্ধে রন্ধ্রে রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার থাবা। যে সমাজ আসলে পুরুষের নজরেই সমাজকে চিনতে সেখায়, মেয়েদের ‘মাল’ বলে ভাবতে শেখায়। এক্ষেত্রে আরও একটি কথা বলতে চাই। পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা কোনও ‘বায়োলজিক্যাল টার্ম’ একেবারেই নয়। একটি মেয়েও ভীষণভাবেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে লালন করতে পারে। যখন সে তার কন্যা সন্তানকে শেখায়, “দোল দোল দুলুনি, রাঙা মাথায় চিরুনি, বর আসবে এখুনি, নিয়ে যাবে তখুনি।” তার মানে একটি মেয়ে পড়াশুনা, কাজকর্ম সবই শিখবে; অথচ সেটি নিজের জন্য নয়। তাঁকে বিয়ে করে সংসার করতে হবে বলেই এগুলি শিখতে হবে। নারীরা আজ সেনাবাহিনী থেকে মহাকাশ সর্বত্রই বিচরণ করছেন। কিন্তু মেয়েদের নিয়ে সমাজের মানসিকতা বদলায়নি একফোঁটাও।

 

আমরা জানি, নির্ভয়া-কান্ডের আসামীদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয়েছে। আমার প্রশ্ন মৃত্যুদণ্ড দিলেই ধর্ষণ কমে যাবে? আসলে বদল চাই মানসিকতার। আমি পুরুষ, তুমি নারী এই বিভাজনের বদল চাই। আশা রাখি, লিঙ্গবৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নকে সফল করবে আগামী প্রজন্ম। হয়তো একদিন নির্ভয়া, অপরাজিতা, প্রিয়াঙ্কারা রাত দিনের ফারাক না করে ঘরেই বাইরে নিরাপদ থাকবে।

Promotion