জগতের বাহার

এই নববর্ষে রম্ভা হয়তো আপনারই অপেক্ষা করছে!

পাহাড় আমায় বরাবরই টানে। তবে পুরী থেকে ঘুরে এসে আজকাল সমুদ্রের হওয়াটাও বড্ড মনে পড়ে। যদিও পাহাড় সমুদ্র একসাথে মানে তো সুদূর দক্ষিণ। তার সময় আর বাজেট কোনোটাই তখন নেই। আমি বেশ পুরোনো এক ম্যাগাজিনে প্রথম রম্ভার নাম শুনি। বাঙালির সমুদ্র সৈকত বলতে যেই নামগুলো মনে পড়ে রম্ভা তার মধ্যে কখনোই থাকে না। সত্যি বলতে রম্ভাকে চিরাচরিত সৈকতগুলোর মতো দেখতেও নয়। ম্যাগাজিন বলছে এ নাকি একটা ছোট্ট উপকূলীয় স্বর্গ। ভৌগোলিক ভাবে এটি হ্রদ যাকে পূর্বঘাট পর্বতমালা জড়িয়ে রেখেছে এক নিবিড় আত্মীয়তায়। ব্যাস ! মনস্থির করে ফেললাম গেলে এখানেই যাবো। যাওয়ার জন্য হাওড়া থেকে ভুবনেশ্বরগামী যে কোনো ট্রেন ধরে ভুবনেশ্বর। সেখান থেকে বাস বা প্রাইভেট গাড়ি করে নিলে অনায়াসেই পৌঁছে যাওয়া যায় রম্ভাতে। রাস্তা জুড়ে অসংখ্য খাওয়ার দোকান রয়েছে যারা ভাত-রুটি অর্ডারে বানিয়ে দেয়। থাকার জন্য আপনি রম্ভাতেও অনেক হোটেল পেয়ে যাবেন সব রকম বাজেটের মধ্যেই।

ভুবনেশ্বরে নামার পর আমি অবশ্য প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে ছিলাম আর সেটা পৌঁছতে সময় নিয়েছিল প্রায় তিন ঘণ্টা। রম্ভা যাবার রাস্তা পূর্বঘাটের মধ্য দিয়ে। তাই গাড়ি থেকে অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও হতাশ করবে না। গাড়ি থেকে নেমে আপনি এগিয়ে যাবেন একটি মেরিন প্লাটফর্মে যেখান থেকে দেখতে পাবেন চিল্কার নান্দনিক এই অংশ যার নাম রম্ভা।

আপনার যদি সামুদ্রিক পাখির প্রতি টান থাকে তাহলে বলবো রম্ভাতে এরা বেশ কিছু সংখ্যায় উপস্থিত থাকে। একটু মনোরম হাওয়ায় জিরিয়ে নিয়ে প্রচুর নৌকোর মধ্যে একজনের সঙ্গে দর করে বেরিয়ে পড়ুন। ওরা আপনাকে প্রধানতঃ তিনটি জায়গা প্রায় ২ ঘন্টা ধরে ঘুরিয়ে দেখাবে।

১. ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড :-  একটি পাশ্চাত্য ধাঁচের এক কক্ষ বিশিষ্ট বাড়ি যা সমুদ্রের মাঝে একা দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকে যতদূর চোখ ঘোরাবেন শুধু রম্ভার জল চোখে পড়বে। আকাশে জুড়ে উড়ে যাচ্ছে কিছু পরিযায়ী পাখি। বেশ রোমান্টিক ও রোমাঞ্চকর একই সঙ্গে এই ব্রেকফাস্ট আইল্যান্ড। কার তৈরী তা ঠিকভাবে জানার চেষ্টা করেও পারলাম না জানতে। তবে পাশ্চাত্য গঠন দেখে বলতেই পারি ইংরেজ আমলে জাহাজের উপর নজর রাখতেই হয়তো এটির জন্ম।

২. গুহাঃ- সমুদ্রবক্ষে একটি পাহাড় আর তাতে একটি গুহায় বিরাজ করছেন মহাদেব এবং ধর্মরাজ। বলে রাখি, শারীরিক ভাবে সচল হলে তবেই ওই গুহায় যাবার চেষ্টা করবেন। গুহার প্রবেশদ্বার সংকীর্ণ। ওই ছোট্ট দ্বীপটির আদি বাসিন্দারাই গুহার পরিচর্যা করেন।

৩. বার্ড আইল্যান্ড :- গুহা ছেড়ে নৌকো কিছু দূর এগোলেই এক প্রকান্ড ডাইনোসরের মাথা আপনার নজরে পড়বে।  অবাক নিশ্চয়ই হবেন কারণ ছোটবেলায় দেখা জুরাসিক পার্ক সিনেমার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন বলে মনে হবে। উপকূল থেকে এত দূরে একটা দ্বীপে এই ডাইনোসরের স্ট্যাচু ছাড়াও আছে অনেক ধরণের পাখি আর রোমাঞ্চ। পছন্দ হলে পাহাড়ে খানিক ট্রেকিংও করে নিতেই পারেন।

এই নির্জনতায়, নির্মল হওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নিতে ভুলবেন না। শরীরের সব ক্লান্তি এবং শহরের সব গ্লানি প্রকৃতির এই রূপ ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে। মন ভরে এই অপার্থিব দৃশ্য আত্মসাৎ করুন। বেলা শেষে যখন ফিরে আসবেন চোখে পড়বে কিছু মানুষের বুক পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা। স্বচ্ছ জলে চোখ রাখলে দেখবেন জলের নিচের মাছ ও গাছ। দেখবেন পাহাড়ের গায়ে তখন কিছু ছেলে একপাল ভেড়া এবং ছাগল চড়াছে।

প্লাটফর্মে ফিরে পাহাড়ের কোলে সূর্যাস্ত দেখবেন। সূর্য ডোবার আগে রম্ভার জল গোলানো সোনার রঙে ঝলমল করে চারিদিক। তারপর পাহাড়ের কোলে হাজার হাজার পাখির ডাকে সন্ধ্যা নামে রম্ভাতে। এবার আমার ফিরে যাওয়ার পালা। যা ভেবে এসেছিলাম রম্ভা তার থেকে অনেক বেশি কিছু দিলো আমাকে। যদি সময় পান অবশ্যই ঘুরে আসুন এই নববর্ষের ছুটিতে, রম্ভা আপনার অপেক্ষায় থাকবে।

 

Promotion