EXCLUSIVE NEWS

উনিশে আঠারোয় পা দিল স্বাধীন বাংলা গানের এক আঁতুড়ঘর ‘পৃথিবী’

একটা গোটা দিনের জন্য যদি ‘পৃথিবী’ দাঁড়ায় পৃথিবীর হয়ে তবে কার সাধ্য তা রোখে! তোড়জোড়,জল্পনা-কল্পনা তো চলছিলো বেশ কয়েকদিন ধরেই। আনুষ্ঠানিক সূচনাটা হয়ে গেছিল ফেসবুকীয় মাধ্যমেই। প্রথমে ‘পৃথিবী’র তরফ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে আবেদন করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল ‘পৃথিবীর ১৮ তম জন্মদিনের প্রাক্কালে যাঁরা শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাতে চান তাঁরা হ্যাশট্যাগ ‘উনিশে আঠারো'(#unisheatharo) লিখে ছোট্ট মিনিট খানেকের ভিডিওর মাধ্যমে শুভেচ্ছা পাঠাতে পারেন। তারপর যেটা হল সেটাকে এককথায় বিপ্লব বললে বাড়াবাড়ি হবে না মোটেই। ফেসবুক তথা সোশ্যাল মিডিয়া ছেয়ে গেল শুভেচ্ছাবার্তায়। শহর,রাজ্যের গন্ডি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগাম শুভেচ্ছায় ও উষ্ণ অভিনন্দনে সবাই ভরিয়ে তুললেন পৃথিবীকে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পথের প্রাথমিক পর্বটা উদযাপিত হল এভাবেই।

সূচী অনুযায়ী মূল অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ছিল বৃক্ষরোপণ। পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর এই মহৎ কর্মযজ্ঞে পৃথিবী-ভক্ত এবং সাধারণ মানুষের যোগদান ছিল দেখার মতো। ভোররাতের বৃষ্টিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে সকাল ৭টায় পাটুলি মোড়ে ই-এম বাইপাসের ধারে জড়ো হলেন পৃথিবী-প্রেমী রক-যোদ্ধারা। সঙ্গে ছিলেন ‘Planting Us’, যাদের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া এই কর্মকান্ড অসম্পূর্ণই থেকে যায়। ‘পৃথিবী’র প্রাণপুরুষ কৌশিক চক্রবর্তী গেয়ে উঠলেন, “তুমি বেড়ে ওঠো মানবী,তুমি বেঁচে থাকো এই অসময়ে/ তুমি ফেরাও নতুন জীবন,তুমি ভুলে যাও বিস্মৃতিকে…”।

কৌশিক বললেন,”গান-বাজনার পাশাপাশি আমাদের প্রত্যেকের কিছু সামাজিক দায়িত্বও রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক হবার সাথে সাথে সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। তাই এবার প্রাপ্তমনস্কের মতো সেই দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে।” আবেদন করলেন যে কোনও আনুষ্ঠানিক উপহার হিসেবে সবাইকে চারাগাছ দিন। নিজেদের ব্যক্তিগত জন্মদিনেও গাছ লাগান। তিনি আরও যোগ করেন,”বাংলা ব্যান্ড-এর জন্মদিনে যেমন একটা কনসার্ট হওয়া দরকার ঠিক সমান ভাবে এইরকম কিছু দায়িত্বপালনও দরকার।”

পরবর্তী গন্তব্য ছিল দমদম ক্যান্টনমেন্ট-এর কাছে ‘ক্যানভাস’ নামক এক অনাথ আশ্রম। ‘ওয়েবস্টার’-এর আন্তরিক সহযোগিতায় জনা চল্লিশেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ের হাতে খাতা,পেন-পেন্সিল এবং সামান্য কিছু খাবার তুলে দিল ‘পৃথিবী’। হল কেক কাটাও। হাসি ফুটল পিতৃ-মাতৃহীন বাচ্চাগুলোর মুখে। এভাবেই সাদা ‘ক্যানভাস’-এ একমুঠো রঙ ছড়িয়ে ফিরলো ‘পৃথিবী’ শেষপর্বের জমায়েতে, বালিগঞ্জের ‘The Doodle Room’-এ।

এই পর্বের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জন্মান্তর আনপ্লাগড’। দুপুর ২টো থেকে অনুষ্ঠানের সময় দেওয়া থাকলেও সদ্য সাবালক, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ‘পৃথিবী’কে কাছে পাওয়ার জন্য ভীড় জমেছিল তার  আগে থেকেই। উৎসাহ এবং উদ্দীপনা তখন একটু একটু করে তুঙ্গে উঠছে। ঘরোয়া ব্যবস্থাপনা এবং সাউন্ডচেক শেষ হতেই দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষারত পৃথিবী-ভক্তদের ভিড়ে রীতিমতো উপচে পড়লো ‘The Doodle Room’। সামনে তখন গোটা ‘পৃথিবী’! অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হল স্মৃতিচারণ দিয়েই।

‘পৃথিবী’-র আঠারো বছরের পথচলার গল্প, বহু ঘাত-প্রতিঘাত,বারবার ভেঙে যাওয়া এবং আবার ফিরে আসার গল্পে বিভোর হয়ে রইলেন শ্রোতারা। টাইমমেশিনে চেপে সবাই তখন ‘পৃথিবী’র সঙ্গেই ছুটে বেড়াচ্ছেন। খুঁড়ে বেরোচ্ছে কতো মাটি চাপা পড়া ইতিহাস! এই পর্বের অনেকটাই জুড়ে ছিলেন ‘বুবুন দা’। কৌশিক চক্রবর্তী বললেন,”বুবুন দা বোধহয় চায়না আমাদের ব্যান্ডে তার জায়গাটা অন্য কেউ নিক। তাই আমরা আজ চারজন। বুবুন দা এখনও স্টেজে উঠে আমার পাশেই ঠিক বাঁ-দিকটায় দাঁড়িয়েই বাজায়, অদৃশ্যে থেকে।” আবেগ ধরে রাখা গেল না সত্যি সত্যিই। নিজেদের জীবন নিয়ে লেখা গানগুলো এক একটা গল্প শুনিয়ে গেল জীবনের গল্প। ‘পালাচ্ছি কোথায়’ গাইতে গিয়ে চোখ থেকে জল ঝরলো ‘পৃথিবী’র প্রাণপুরুষের। দেখে নীরবে কাঁদলো গোটা ঘর।

পরবর্তী অ্যালবাম ‘চ্যাপ্টার ৪’-এর গান এবং সেই অ্যালবাম-সংক্রান্ত কিছু জরুরী ঘোষণাও হল। কখনও উচ্ছাসে,হাততালিতে ফেটে পড়লো ঘর। কখনও আবার মন্ত্রমুগ্ধ,সম্মোহিত,স্তব্ধ। নগর সংকীর্তন ইন্সট্রুমেন্টাল ট্রিবিউট জানালো ‘ক্লাসরুম’-এ। গোটা অনুষ্ঠানে দেখা পাওয়া গেল তরুণ প্রজন্মের বেশ কিছু মুখের। তাদের কেউ গান গাইলেন, কেউ আবার বাজালেনও। শেষ মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন শিলাজিৎ মজুমদার।

কেক কেটে বিতরণ করা হল উপস্থিত সকলের মধ্যে। মুঠো মুঠো ভালোবাসা কুড়িয়ে,একবুক প্রত্যয় নিয়ে আর অনেক অনেক ‘আঠারো’র আশ্বাস দিয়ে ‘পৃথিবী’ বলে গেল “জেনো বাঁচতে হবে আমাদের একসাথে এই Rock n roll-এ…”।

চিত্র ঋণ – @Gomes Clickography Michael Sunny Roy, দীপ লাহা, অভিষু বিশ্বাস এবং পৃথিবী আর্থেরিয়াঞ্জ।

Promotion