Editorial

পয়লা বৈশাখ – এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার নাম

প্রচ্ছদ অলঙ্করণ – বৃতি সুন্দর রায়

আমি পথ চলি। আর আজন্ম করুণ বেদনায় চেয়ে থাকি ন্যুব্জপিঠ সেই মানুষগুলোর দিকে যারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে মাছের বাজারে, ইলিশের ঝাঁকিতে। পান্তা ইলিশ না খেলে বুঝি পয়লা বৈশাখ পালনই হলো না। এই হল ক্ষণিক বাঙালিয়ানা। মুখোশের আড়ালে স্বাজাত্যবোধ আর নিজস্ব সংস্কৃতির চেতনা লজ্জিত চোখে তাকায়। আর আমার মনে একটি প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে, “বাঙালি কবে আর চিনবে নিজেরে?” একটি দিন একটি বিশেষ উপলক্ষ্য মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট যে কোনো বিষয়। কিন্তু একদিন পান্তা ইলিশ খেয়ে লাল-সাদা শাড়ি-পাঞ্জাবী পরে পরদিনই মোরগ মোসল্লামে ঢেকুর তুলি। জিন্স ফতুয়া গায়ে দিয়ে বিবশ হয়ে পড়ি আর অনর্গল বাংলিশ ভাষায় কথা কই। নিজের আভিজাত্য প্রকাশ করি সগৌরবে। এই কি বাংলা নববর্ষ পালনের আসল উদ্দেশ্য!

বছরের প্রথম দিনে উন্মত্ত মানুষের ঢল। আর একদল ধর্মান্ধের ধারালো চাপাতিকে আরও ধার চকচকে করা। কে যে কারে (নিজেরে) আদৌ চিনতে পায়। তারা কি জানে একদিন বাংলার গৌরব ছিল ধানের, গৌরব ছিল পাটের, গৌরব ছিল কিষাণীর টিয়াপাখি নাকের জন্য ফসল বিক্রির টাকায় কেনা নাকছাবিতে। আরও গৌরব ছিল ধর্ম ভুলে উঁচু নিচু জাত ভুলে হিন্দু মুসলিম একত্রে বৈশাখের প্রথম দিন পালন করবার। জানে না অন্ধ আর সুশিক্ষিত এই ধর্ম ব্যবসা, জানেনা উন্মত্ত প্রহেলিকায় আচ্ছন্ন মানুষও। বাংলার কৃষিনির্ভর মানুষের মনে এক ধরনের সহজাত বিশ্বাস আর সংস্কার থেকে তারা জীবনের তাগিদেই একসময় পালন করতো বাংলা বছরের শুরুর প্রথম দিনটিকে। বাংলার কৃষিজীবী মানুষের সংস্কারের মূলে ছিল প্রাকৃতিক আর অতীন্দ্রিয় শক্তির উপর নির্ভরশীলতা। তাদের কাছে বছরের প্রথম দিনটি ছিল সারা বছরের শুভাশুভ নির্ণায়ক। কৃষি নির্ভর বাংলার কৃষির জন্য তখন নির্ভর করতে হতো একমাত্র বৃষ্টির উপর। তাই তারা অপেক্ষা করে থাকতো বছরের প্রথম দিনটিতে বৃষ্টির জন্য। প্রার্থনার যে ধরণ কিংবা লোকাচার তা ছিল হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে, অসাম্প্রদায়িক। যারা নিবিড় বিশ্বাস থেকে এ উৎসব পালন করতো তারা ছিল সাধারণ বাংলার মানুষ।

সারা বছর ব্যাপী যারা ফসলের উপর নির্ভরশীল। তারা যে ধর্মেরই অন্তর্গত হোক তাদের জীবিকার ক্ষেত্র ছিল অভিন্ন। তাই একই ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশে একই স্বার্থে একত্রিত হতে তাদের কোনো সংস্কারজনিত বাধা ছিল না। পৌষ পার্বণে মাগনের গানগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হরি, আল্লাহ, সোনারায় সোনাপীর, মানিক পীর, গাজি পীরের নামে মাগন করা হতো। বালকেরা বাড়ি বাড়ি গান করে মাগন করতো যেখানে সোনারায় আর সোনাপীর হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে মিলেমিলে একাকার হয়ে গেছে। আবার লক্ষীদেবীও মুসলমান কৃষক দ্বারা পূজিত হয়ে এসেছে দীর্ঘদিন। কারণ পেশার সঙ্গে লক্ষ্মীর সম্পর্কটা ভীষণ নিকট। এ ছিল আজন্ম কিষাণ কিষাণীর বিশ্বাস। লক্ষ্মী ধনের দেবী, ব্যবসায়ীর সৌভাগ্যের দেবী। তাঁরই তুষ্টিতে ব্যবসার উন্নতি আর কৃষকের ঘরে সারা বছরের খোরাকীর যোগাড়। এমনও দেখা গেছে সন্তানকে সাপে কাটলে মুসলিম কৃষক দেবী মনসার পুজোও করেছেন নির্দ্বিধায়। আসলে ধর্ম একটি পার্সোনাল ল।  তখন কি ছিলনা এই বাঙালির! ফসল ভরা মাঠ, গোলাভরা ধান। সোনালী আঁশে আনা প্রচুর বিদেশী মুদ্রা। পুকুর ভরা মাছ। ইলিশের অভয়ারণ্য কি ছিলনা একদিন বাংলার নদী? তখন ছিলনা হিন্দু কি মুসলিম জাত বিভেদ। যে যা বিশ্বাস মতো পালন করে গেছে বছরের প্রথম দিন। যে দেশে বাস করছি। যে চরাচরে আজন্ম লালিত হচ্ছি এই ভূগোলে আমার মা যেমন পড়েছে লাল শাড়ি আমার প্রিয় হিন্দু সখীর মাও একই শাড়ি পড়েছেন। তবে কি প্রভেদ আমার আর হিন্দুর সংস্কৃতিতে? এই তো চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতি।

বহুকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস করা মানুষ প্রাকৃতির পরিবেশের সাথে মানিয়ে যে পোশাক, যে আচার পালন করে আসে তাই তো তার সংস্কৃতি। এর সঙ্গে ধর্মের কোনই সংঘর্ষই তো নেই। এখানে নতুন বৌ কি হিন্দু, কি মুসলিম, কি খৃস্টান; পায়ে পড়েছে সোনার মল, আলতায় রাঙিয়েছে পা, কপালে দিয়েছে সিঁদুর কি টিপ। সবুজ ঘাসের বুকে হৃদয়ের শুদ্ধতা নিয়ে বয়ে গেছে কৃষাণের গায়ে দাবদাহে কোমল শান্ত বাতাস হয়ে। এখানে খোদা-ঈশ্বর-ভগবান এক হয়ে মিশে গিয়েছেন বাংলার প্রাণে, ফসলের মাঠে। গরীব চাষী কি শুধু পান্তায় সারেনি সকালের খাবার? আজ যখন ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার পথ আগলে দাঁড়ায় মানুষের ভালোবাসা চিরায়ত লালিত জাতিবোধ আর আন্তরিক অঙ্গসজ্জা তখন ভুলতে বসি, কী আমার সংস্কৃতি কী আমার আচারনিষ্ঠা। কৃষকের কিংবা শ্রমজীবীর যে শিশুটি আজ ইলিশের অভাবে শুধুই লবণ দিয়ে সারে পান্তা আর নতুন বছরের প্রথম প্রহর। উদোম গায়ে অভুক্ত শরীরে যখন নীড়হারা শিশু পথে দাঁড়িয়ে থাকে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে তখন আমি ইলিশের বাজারে হাজার টাকাওয়ালা মাছিদের ওড়াওড়ি দেখে লজ্জিত হয়ে মুখ ঢাকি। আর বুঝতে পারিনা ‘মা, ইলিশ খাওয়াই কি নববর্ষ উদযাপন?’ এই প্রশ্নের কী দেব উত্তর!

Promotion