মরসুমী ফুল

পিঠে, ঘুড়ি, আগুন স্নান! বাংলাদেশ এভাবেই মেতে ওঠে পৌষ-পার্বণে!

 

পৌষ পার্বণ বা পিঠে পার্বণ বাংলাদেশে একটি লোক উৎসব। অগ্রহায়ণে নতুন ফসল ঘরে তোলার পর বাংলার কৃষক সমাজ একটু বিশ্রামে থাকে। আর এই সময়টায় বাংলার আপামর জনগণ পিঠে-পুলির আনন্দে মাতোয়ারা। “পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে আয় আয় আয়! ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে, মরি হায় হায় হায়। বাংলা পঞ্জিকার হিসেবে পৌষের শেষ দিন মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তির দিন। গোটা বাংলাদেশে জুড়েই এদিন পৌষ সংক্রান্তি, বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। প্রাচীনকাল থেকেই দেবতার পুজোয় পিঠের অর্ঘ্য প্রদানের রীতি রয়েছে। তাছাড়া দিনটি হিন্দু পঞ্জিকায় ‘মকর সংক্রান্তি’ বা ‘উত্তরায়ণ সংক্রান্তি’ নামেও পরিচিত। হিন্দুরা এই দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে তিল কিংবা খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধান থেকে তৈরি চালের পিঠে অর্ঘ্য দিতেন। এই কারণে পৌষ সংক্রান্তির অপর নাম তিলুয়া সংক্রান্তি বা পিঠে সংক্রান্তি। মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যে নানা প্রকার পিঠে ও পিঠে গড়ার বিচিত্র সব উপাখ্যানের উল্লেখ রয়েছে।

 

এই পৌষ সংক্রান্তিকে উদযাপন করতে বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় থাকে আগুন পোহানোর পর্ব। কয়েকদিন আগেই গ্রামে গ্রামে আমন ধানের খড় কেটে এনে মজুদ করে রাখা হয়। উৎসবের আগের দিন রাতে ওই খড় আর কাঁচা বাঁশ দিয়ে তৈরী করা হয় ছোট মেরামেরীর(মেষ)ঘর। সেই ঘরের এক পাশে রান্না করে সবাই বসে খাওয়াদাওয়া করেন। অনেকে মজার কেচ্ছা শোনার আসর বসান। পরের দিন কাক ডাকা ভোরে সবাই ঘুম থেকে উঠে স্নান করে রাতে তৈরী করা ঘরটিতে আগুন দেন। সে আগুনে সবাই মিলে উত্তাপ পোহান। আগুনে তাপ নেওয়ার সময় কাঁচা বাঁশের আখি যখন পুড়ে ফাটে তখন গুলির শব্দের মতো একটি শব্দ হয়। আর সেই শব্দ শোনামাত্র আগুনে উষ্ণতা পোহানো রত সবাই উচ্চ স্বরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। রয়েছে হাস্যকর বাক্য বিনিময়ের প্রথাও।

 

পিঠেপুলি খাওয়ার জন্য গ্রামবাসী একে অন্যকে আমন্ত্রনও জানান। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই পৌষ সংক্রান্তিকে ঘিরেই চলে নানা আয়োজন। ওই দিন রাতে তারা বাঁশের মধ্যে ভাত, মাছ, মাংস ও চুঙ্গা পিঠা তৈরী করে মেরামেরীর ঘরে বসে আহার করেন। এদিন বাংলার গ্রামে গ্রামে বের হয় নগর কীর্তন। ভাটি বাংলায় পৌষ সংক্রান্তিতে আবার নতুন কাপড় পড়ার রেওয়াজও রয়েছে। নতুন পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে গ্রামবাসী অংশ নেন নগর কীর্তনে। কীর্তনও থাকে বৈচিত্র্যে ভরপুর। সেখানে কমলা, নারকেল, নকুল দানা, বাতাসা, কলা, খিরা, কদমা ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে দেওয়া হয় লুঠ। কীর্তন শেষে হয় মহাপ্রসাদ বিতরণ। সারাদিন ঘুড়ি উড়ানোর পরে সন্ধ্যায় পটকা ফাটিয়ে, ফানুস উড়িয়ে উৎসব শেষ হয়।

 

 

এই উৎসবকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। বিশেষ করে প্রত্যেক বাড়ির আঙিনায় উজ্জ্বল মাটির হালকা আস্তরণ লেপে দেওয়া হয়। গ্রামের তরুণী ও বধুরা তাদের উঠোনে চালের গুড়ি, রঙিন মাটি ও বিভিন্ন রং দিয়ে আঁকেন হরেক রকম আল্পনা। প্রতি পৌষ সংক্রান্তিতে মৌলভীবাজারের শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর তীরে প্রায় দু’শো বছর আগে থেকে চলে আসছে এক মাছের মেলা। কাজেই পৌষ সংক্রান্তি এভাবেই দেশের জাতীয় জীবনে এক অর্থবহ ভূমিকা পালন করে। পৌষের শীত গায়ে মেখে এভাবেই আনন্দের মেজাজে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা বাংলাদেশ।

Promotion