কাটাকুটি

রিভিউঃ পার্টিশন – দেশও ভাগ হয়, ভাগ হয় না অনুভূতিরা!

এই প্রযোজক সংস্থা প্রযোজিত বিগত একটি শর্টফিল্ম ‘সিন বাই সিন’-এর রিভিউ লিখেছিল এই গণমাধ্যম। সেখানে রিভিউটির লেখক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছিলেন, “ড্রিমলাইন ফিল্মস প্রোডাকশন আদতেই একটা নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে, এবার শুধু ধারাবাহিকতাটা রক্ষা করাই তাদের কর্তব্য।” ‘পার্টিশন’ ছবিতে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন, এ কথা বলাই যায়।(যদিও ‘সিন বাই সিন’ এবং ‘পার্টিশন’-এর মাঝে তাদের আরও স্বল্প-দৈর্ঘ্যের ছবি মুক্তি পেয়েছে)। অতি সম্প্রতিই মুক্তি পেল শুভঙ্কর হালদার এবং শতরূপা মণ্ডল প্রযোজিত স্বল্প-দৈর্ঘ্যের ছবিটি। পরিচালনায় রয়েছেন অন্বেষ দে। কাহিনী এবং চিত্রনাট্যের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছেন অনুরাগ রায় চৌধুরী যার অসাধারনত্বের পরিচয় ইতিমধ্যেই পেয়েছেন দর্শকরা। পর্দার পিছনে থেকে বাচিক শিল্পী হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন শম্ভুনাথ বাবু।

ছবির গুণমানঃ- ১১ মিনিটের এই সময়ের দলিলে দুই প্রজন্মের যাপনের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন শিশু শিল্পী সুমন এবং তার পিতামহর চরিত্রে মৃণাল বাবু। যেভাবে ছবিটিতে ভাবনার পরিবেশন করা হয়েছে এবং সমাজচেতনা তুলে ধরা হয়েছে তা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। একটি কাঁটাতার তো আসলে কখনোই মানুষের চেতনার বিভক্তিকরণ বা পার্টিশন ঘটাতে পারে না। তাই নির্বাসন দিয়ে, অপমান করে নিজেদের অহংবোধকে ধরে রাখা যায় না। মানুষ সামাজিক জীব, তাই আমরা কেউই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। যৌথবদ্ধতাই যে জীবনে চলার পথে মূলমন্ত্র তা আমরা ভুলতে বসেছি। ‘পার্টিশন’ আবারও আমাদের সেই মূলমন্ত্রটি মনে করিয়ে দিল।

দুর্বলতাঃ-  ছবিটির চরিত্ররা কি  দেশভাগের সময়কার উদ্বাস্তু? যদি তাই হয়ে থাকেন তাহলে ওনারা ভারত অথবা বাংলাদেশ যে পারেই থাকুন না কেন, ওরকম দ্বিতল বনেদী বাড়ি দখল বা কেনা কোনটাই সম্ভব নয়। কারণ সেই আর্থিক সঙ্গতি তাদের ছিল ্না। ছবির পরিবেশনায় বনেদী বাড়িটিতে তারা ভাড়া থাকেন এরকম কোনও বক্তব্যও উঠে আসেনি। তাই আদৌ কি তারা উদ্বাস্তু? নাকি দেশভাগের বিভাজনেই মনের ক্ষত থেকেই পিতামহ চরিত্রের এই প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পেয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নস্ট্যালজিয়াঃ- একটি ট্রানজিস্টার রেডিও বাজতে শোনা যায় ছবিতে। কয়েক দশক আগে এই রেডিওতেই আমাদের সকাল শুরু হতো। এখন যা এফএম বা অনলাইন রেডিওর দাপটে বিলুপ্তপ্রায়।

মনে দাগ কাটা দৃশ্যগুলিঃ-  প্রথমত, বাচ্চা ছেলেটি ছড়ার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে সুন্দরভাবে বেশ কিছু অর্থবহ চিত্রপট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিশুশিল্পীর দলবদ্ধ হয়ে থাকা পিঁপড়ের দলকে আঙুলের টোকা মেরে সরিয়ে নির্দিষ্ট একটি পিঁপড়েকে হাতে তুলে নেওয়া। যার অর্থ দর্শকের মন তার মতো করে ভেবে নিতেই পারে।

সেরা মুহূর্তঃ-  শর্টফিল্মটির শেষে শিশুশিল্পীর অসাধারণ এক্সপ্রেশন যেন কথা বলে। মনে হয় প্রতিটা ব্যর্থতা এবং অপমানের হিসেব চুকিয়ে সে সমাজের অহঙ্কারকে চূর্ণ করতে পারে। প্রথমে কয়েন দিয়ে সে যা খেতে চেয়েছিল তা পায় নি। কিন্তু একটি একটি কয়েন দিয়ে সে বেশ কয়েকটি লজেন্স কেনে যা তার মুখ ভরিয়ে দেয়। এ যেন বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটায় সিন্ধু গড়ার স্বপ্নই দেখায়।

পরিশেষে একটি কথাই বলা যেতে পারে। সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ যে শিল্পীদের রয়েছে, তারাই প্রকৃত শিল্পী। তাই ‘পার্টিশন’র মতো মননশীল ছবি উপহার আমরা ভবিষ্যতেও পাবো এই আশা রাখা একেবারেই অন্যায্য নয়।

Promotion