Editorial

ছোটবেলার নস্ট্যালজিয়ার স্বাদ মাখা সেই লজেন্স…

 

ছোটবেলায় রঙিন জিনিসের প্রতি একটা অদম্য আকর্ষণ থাকে আমাদের। বিভিন্ন আকারের রঙ-বেরঙের লজেন্স হলে তো আর কথাই থাকে না। না চাইতেও জল গড়িয়ে আসে জিভের ডগায়। আমাদের সময়ে এরকমই একটি জনপ্রিয় লজেন্স ছিল ম্যাঙ্গো বাইট। মাত্র পঞ্চাশ পয়সা দিলেই হাতের তালুতে টুক করে পড়তো এই লজেন্স। আর আমরা সেটাকেই মুখে পুরে নানান স্বপ্নের জাল বুনতাম সেই শৈশবে। তবে এখন যেমন ইচ্ছে মতো পছন্দসই লজেন্স যখন তখন খেতে পারি, তখন কিন্তু এমনটার চল ছিল না। খুব কষ্টে, কেঁদে কেটে গড়াগড়ি দিয়েও চার আনার বেশি পয়সা পাওয়াই দুষ্কর ছিল। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে যদি দু’একটা টাকা দিতো, সেটিও মা নিয়ে নিতো। তাই অপেক্ষা করতে হতো দীর্ঘদিন ওই বিশেষ লজেন্সের জন্যে। কখনও বিকেলে বাবা-কাকার সঙ্গে বেড়াতে গেলে কৌটো ভর্তি লজেন্সের মাঝে যদি একটাও চাইতাম ওরা ধমক দিতো। তাই নিজেই চার আনা করে অনেকদিন ধরে জমিয়ে পঞ্চাশ পয়সা হলেই ছুট্টে চলে যেতাম পাড়ার মুদির দোকানে। এভাবেই পেতাম সেই অমূল্য রতন ম্যাঙ্গো বাইট লজেন্স।

 

একবার হলো কী? স্বাধীনতা দিবসের ঠিক দু’দিন আগে আমাদের প্রতিবেশী জেঠুর বাড়িতে অনেক দূর থেকে বুড়ো মতো এক দাদু এলেন। তিনি আবার কানে শোনেন না তেমন। পাড়ার কচিকাঁচাদের একদিন বিকেলে জড়ো হতে বললেন ওই দাদু। সেইমতো আমি, ভূতো, কানু, পিকু, দিশা, ইমু, মিলি জড়ো হলাম। দাদু আমাদের রূপকথার গল্প শুনিয়ে বললো আমরা যদি দেশের পতাকা আঁকতে পারি তাহলে একটি জিনিস দেবেন। সেইমতো রং, পেনসিল নিয়ে স্বাধীনতা দিবসের দিন সকাল সকাল ছবি এঁকে দাদুকে দেখালাম। দাদু খুব খুশি হয়ে তার ঝুলি থেকে একটা বড়ো কৌটো থেকে অনেকগুলো ম্যাঙ্গো বাইট বের করলো। আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ আর জিভ ভর্তি জল। দাদু পাঁচটা করে লজেন্স দিলো সবাইকে। সেই সময় ওপাড়ার উষা মাসির ছেলে ভোম্বল নাকের সর্দি মুছতে মুছতে আমার কাছে এসে হাত পাতে “একটা নজেন তাও না গো, মা কোনোদিন দেয় না খেতে!” হঠাৎ কী একটা ঘটে গেল আমার ভেতর। অনায়াসেই ওর হাতে তুলে দিলাম আমার বহু কাঙ্খিত লজেন্সগুলো। সেদিন দাদুর বলা কিছু কথা আমার আজও বেশ মনে পড়ে। দাদু বলেছিলেন, “সকলে মিলেমিশে ভাগ করে খাওয়ার মধ্যেও যেন একটা স্বাধীনতা আছে।”

 

এভাবেই আমাদের শৈশবের হাজারও গল্প-উপন্যাসে এক মর্যাদার জায়গা দখল করে রয়েছে সেই হলুদ-সবুজ মোড়কে ঢাকা ম্যাঙ্গো বাইট। লজেন্সটি যেন এভাবেই আমাদের ছোটবেলাকে এক আনন্দ-মুখর কল্পনায় মুড়ে রেখেছে। আজ হয়তো বিভিন্ন সেলেবদের নানা ব্র্যান্ডের লজেন্সের বিজ্ঞাপন টেলিভিশনের সামনে হাঁ করে গিলি। এটিও বাস্তব যে বাজারে-দোকানে এই ম্যাঙ্গো-বাইট বিলুপ্তপ্রায়, সেখানে অন্যান্য চকমকে জৌলুসপূর্ণ লজেন্সের সাম্রাজ্য। যদিও এসবের মাঝে ভুল করেও একবার দেখে ফেলি ছোটবেলার সেই নস্ট্যালজিয়াকে, সত্যি আজও বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তেই ফ্ল্যাশব্যাকে দেখতে পাই আমার ফেলে আসা শৈশবকে।

চিত্র ঋণ – ScoopWhoop

Promotion