মরসুমী ফুল

নিষ্কলঙ্কেশ্বর – সমুদ্রগর্ভে এক আশ্চর্য শিব মন্দির!

 

আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে পিপলি হাইওয়ে ধরে। দু’পাশে বাজরার ক্ষেত। বিশাল নুনের পাহাড় রাস্তার দু’ধারে। রাস্তার উপর উঠে আসছে ময়ূরের ঝাঁক। গাঁয়ের মেয়েরা রঙচঙে চানিয়া চোলিতে সেজে মাথায় ঘড়া বসিয়ে যাচ্ছে। কখনও সঙ্গে অবাক চোখের পুঁচকে বাচ্চা, কখনোও পাগড়ি পরা বেশ গুরুগম্ভীর মরদ। চলেছি ভবনগরের দিকে। দিনের শেষে সূর্য ঢলে পড়ল পশ্চিম আকাশে। আমরাও শিরশিরে অনুভূতি গায়ে মেখে সমুদ্র সৈকতে। আছড়ে পড়ছে রাশি রাশি ঢেউ। দূরে জলের উপর জেগে আছে লাল পতাকা। আমাদের লোকাল গাইড দিনের বেলা পুরোহিতের কাজ করেন নিষ্কলঙ্কেশ্বর মন্দিরে। বলে দিলেন, “কাল সকালে সাতটা থেকে দেড়টার মধ্যে সমুদ্রের জল সরে যাবে, পুজো করিয়ে নিয়ে যাব শিবের দর্শন করাতে। সেই মতো পরদিনই আটটা নাগাদ তড়িঘড়ি সমুদ্রের পাড়ে হাজির হয়ে দেখি অবাক কান্ড। কোথায় সেই রাশি রাশি জল! সমুদ্র সরে গেছে প্রায় চার কিলোমিটার। পাড় থেকে প্রায় দেড় কিমি হেঁটে যেতে হবে শিবঠাকুরের আপন দেশে। সামান্যই উপকরণ পুজোর; চাল, গোটা নারকেল, একটু সিঁদুর আর নকুলদানা।  খুঁতহীন অখন্ড চালের দানা দিয়ে নিষ্কলঙ্কেশ্বর শিবের পুজো হয়।

কথিত আছে এই শিবমন্দিরটি পঞ্চপাণ্ডব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর এতো স্বজনহানি, লোকক্ষয় দেখে পাণ্ডবরা অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন। এই দহন থেকে মুক্তি পেতেই তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের কাছে উপায় জানতে চান। কৃষ্ণ তাদের পরামর্শ দেন, একটি কালো পতাকা নিয়ে ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করতে। সেইমতো তা‌রা পরিভ্রমণে বেরোন। এই ভবনগর সৈকতে এসে পতাকার রং সাদা হয়ে যায়। তাঁরা ভাবলেন ঈশ্বরের করুণায় তাঁরা কলঙ্কমুক্ত হলেন। পঞ্চপাণ্ডব এখানে পাঁচটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করে যথাযথভাবে পুজোর আয়োজন করেন। সেই থেকে এই মন্দির নিষ্কলঙ্কেশ্বর শিবের মন্দির হিসেবে পরিচিত হয়।
থকথকে কাদার মধ্য দিয়ে সাবধানে পা টিপে টিপে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাদার মধ্যে গাঁথা ঝিনুক, ছোট ছোট শাঁখ, আরো কত অজানা জিনিসপত্র। কোথাও আবার অল্প জলেই ছোট ছোট মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পর পৌঁছলাম একটি বেদী মতো জায়গায়। দু’পাশে দুটি স্তম্ভ রয়েছে যার ওপর লাগানো আছে গেরুয়া ও লাল পতাকা। চ‌ও‌ড়া চাতালে পাঁচটি শিবলিঙ্গ রয়েছে। কোনওটির গায়ে লাগানো রয়েছে ফণা তোলা পেতলের সাপ, ঝোলানো আছে বড় দানার রুদ্রাক্ষের মালা। কারও গায়ে আবার চকচকে ত্রিশূল। ডমরু ঝুলছে ত্রিশূলের গা দিয়ে। আস্ত নারকোল, ফুল-বেলপাতা পুজোর উপকরণ আর প্রসাদ হলো শুকনো মুড়ি আর এলাচ দানা।
চারদিক খোলা চাতালে বসে আছি। সমুদ্র এখান থেকেও দুই কিলোমিটার পেছনে। অনেকেই যাচ্ছেন জল ছুঁয়ে পূণ্য অর্জন করতে। চারপাশে অসংখ্য সীগালের ওড়াওড়ি। দূরে সবুজ গাছপালা। চাতালেও একটি জলের কুন্ড রয়েছে। বাচ্চারা তার মধ্যে নেমে গিয়েছে স্নান করতে। একটু বেলা বাড়তেই অজস্র লোকের ভিড়। এমনকি হুইলচেয়ারে বসা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও দেখলাম। মন্দিরের দু’দিকে দুটি স্তম্ভ রয়েছে প্রায় পনেরো ফুট লম্বা, যেখানে মনস্কামনা পূরনের জন্য ডোর বাঁধছেন অনেকে। সিগালদের খাওয়ানোর জন্য বিক্রি হচ্ছে ছোলা আর মুড়ি। জানা গেল, দুপুর দুটোর পর থেকে পুরো এলাকা চলে যাবে ১৫ ফুট জলের তলায়। অদ্ভুত ভাবে শিবলিঙ্গগুলির গা মসৃণ, একটুও ক্ষয়ের চিহ্ন নেই। সাপ, ত্রিশূল, ডমরু হয় তো খুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শিবলিঙ্গগুলি ওখানেই থাকে। গভীর জলের তলায় তাতেও কোন ক্ষয় হয়নি। আসার  সময় এক‌ইভাবে কাদায় পা গেঁথে গেঁথে ফিরে আসার সময় দেখছিলাম ছোট্ট ছোট্ট গর্ত গুলো কেমন আস্তে আস্তে জলে ভরে উঠছে। ধীরে ধীরে এই জলের রাশি ঘিরে ফেলবে শিবের অধিষ্ঠান। সমুদ্রগর্ভে চলে যাবে নিষ্কলঙ্ক শিবের মন্দির।  অতলান্ত নোনা ঢেউয়ের আড়ালে জেগে থাকবে জলের উপর লাল গেরুয়া পতাকাগুলো, অতন্দ্র মহিমায়।

Promotion