মরসুমী ফুল

কে এই সান্টা ক্লস? চেনেন কি তাঁকে?

 

বড়দিন এলেই শোনা যায় সান্টা ক্লসের নাম। কে আসলে এই সান্টা ক্লস? কীই বা তার পরিচয়? ইতিহাস ঘেঁটে যতটুকু জানা যায়, উদার মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান পাদ্রি সান্টা ক্লস ব্যক্তিজীবনে সেন্ট নিকোলাস নামে পরিচিত ছিলেন। মূলতঃ ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের দিকে লাল জামা, টুপি ও সাদা চুল-দাড়িওয়ালা লোকটির গ্রহণযোগ্য সন্ধান মেলে। প্রচলিত একটি গল্পে জানা যায়, এক গরিব বাবা অভাবে পড়ে তিন মেয়েকে ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি করতে চাইছেলেন। সন্ন্যাসী সেন্ট নিকোলাস সেই বাবার পাশে দাঁড়ান এবং মেয়েদের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্য করে তাদের সামাজিক অসম্মানের হাত থেকে বাঁচান। সেই থেকে তিনি খ্রিষ্ট ধর্মের মানুষের কাছে শিশুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান। এশিয়ার মাইনর অর্থাৎ বর্তমান তুরস্কের পাতারা নামক অঞ্চলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ব্যক্তি সান্তা ক্লস একজন মহৎ এবং দানশীল ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। আরও নানা ধরণের ব্যতিক্রমী উদার মানসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

 

সান্টা দাদুর বাড়ি আসলে কোথায়? চতুর্থ শতকে তুরস্কের ছোট রোমান নগর মুরার বিশপ ছিলেন সান্টা ক্লস। বিগত সময়ে তুরস্ক ছাড়াও তার দেহাবশেষের সমাধি ইতালি ও আয়ারল্যান্ডে হয়েছে বলে দাবি করে আসছিল দেশ দু’টি। ২০১৭ সালের অক্টোবরে তুর্কি প্রত্নতাত্ত্বিকরা আনাটোলিয়া প্রদেশের সেন্ট নিকোলাস চার্চের নিচে একটি প্রাচীনতম সমাধির ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন। এটি থেকে তারা সান্টা ক্লসকে নিজেদের বলে দাবি করতে শুরু করেন। যদিও ফিনল্যান্ডও এ দাবি মেনে নেয়নি। কারণ ফিনদের কাছে এই দাবির বিরুদ্ধে পোক্ত প্রমাণও ছিল। মধ্যযুগে খ্রিস্টধর্ম ফিনল্যান্ডে আসার আগে থেকেই দেশটির বাসিন্দারা একটি শীতকালীন পৌত্তলিক উৎসব উদ্‌যাপন করতেন। নুটুতিপুক্কি নামের উৎসবটি সেন্ট নুউটের দিন ১৩ জানুয়ারি উদ্‌যাপিত হতো। সেদিন অনেক নর্ডিক দেশে ঋতুকালীন ছুটি শেষ হয়। উৎসবের দিন জ্যাকেট, বার্চ নামের একটি বিশেষ গাছের ছাল, মুখোশ ও শিংয়ের পোশাক পরা হতো। বাড়তি খাবার ও উপহারের দাবিতে দর কষাকষি করতে ঘোরা হতো বাড়ির দরজায় দরজায়। ‘নুটুতিপুক্কি’ মন্দ আত্মার প্রতীক ছিলেন যিনি দাবি অনুযায়ী সামগ্রী না পেলে জোরে জোরে চেঁচিয়ে শিশুদের ভীত করে তুলতেন। এটিই ছিল মিথ। ঊনবিংশ শতকের একদম গোড়ায় সেন্ট নিকোলাসের সাথে মুখোশধারী নুটুতিপুক্কির প্রাক বিদ্যমান চরিত্রের সঙ্গে ঐতিহ্যের মিশ্রণে ‘জোলুপুপি’ নামের আরেকটি চরিত্রের জন্ম হয়। ফিনিশরা বিশ্বাস করেন, কোরাওয়াতুন্টুরিতে জোলুপুপির সব কিছুই এখনও শোনা যায়। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জোলুপুপি বা ফিনল্যান্ডের সান্টা ক্লসের ঐতিহ্যকে অনুমোদন করে। দেশটির ‘ন্যাশনাল ইনভেন্টরি অব লিভিং হেরিটেজে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জোলুপুপিকে। এরপর বিশ্ব অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে তালিকাভুক্তির জন্য ইউনেস্কো’র কাছে আবেদন জানিয়েছে দেশটি।

 

নিকোলাসকে নেদারল্যান্ডসের মানুষ ডাকতো ‘সিন্টার ক্লস’ নামে। কিন্তু কোথা থেকে এলো তার এই বিচিত্র পোষাক? ১৮০৯ সালে সেন্ট নিকোলাসের গল্পকে আমেরিকান লেখক ওয়াশিংটন ইরভিং ‘আ হিস্ট্রি অব নিউইয়র্ক’ বইয়ে তুলে ধরেন। তখন থেকেই চরিত্রটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ১৮২৩ সালে ক্রিসমাস ডে উপলক্ষ্যে আমেরিকার বিখ্যাত লেখক ক্লেমেন্ট ক্লার্ক মুরের লেখা ‘A visit from St. Nicholas’ কবিতাটি লেখেন। সেখানে এক সন্ত আটটি বলগা হরিণ টানা গাড়িতে উড়ে উড়ে বাচ্চাদের উপহার দিচ্ছেন, এমন একটি ধারণা দেওয়া হয়। মূলতঃ সেখান থেকেই সান্টা ক্লসের এই ব্যতিক্রমধর্মী পোষাক সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি জন্ম নেয়। ইতিহাস বলছে, আদতে সেন্ট নিকোলাস ওরফে সান্টা ক্লসকে এই ধরণের কোনো পোষাক পরতে দেখা যায়নি। তবে সান্টা ক্লসের এই বিচিত্র পোষাকের মিথটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ১৮৮১ সালে থমাস ন্যাসট নামক একজন আমেরিকান কার্টুনিস্টের আঁকা ছবিতে। সান্টার হরিণ টানা গাড়িতে চড়ে কাঁধে উপহার ভর্তি ঝোলা নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাচ্চাদের উপহার দেওয়ার ছবিটি গোটা বিশ্বে জনপ্রিয়তা পায়।

 

 

Promotion