Editorial

বঙ্গবন্ধু তাঁকে জড়িয়ে ধরে ‘মা’ বলে ডেকেছিলেন!

 

কলমে রঞ্জনা বিশ্বাস

একাত্তরের যুদ্ধে যারা শহিদ হয়েছেন তাদের সংগ্রাম শেষ হয়েছিল। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধও একদিন শেষ হয়েছে কিন্তু শেষ হয়নি যুদ্ধকালীন ধর্ষিতা মা-বোনের লড়াই। তারা পরিবার, আত্মীয় স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। অসহায় এই নারীদের পুনর্বাসনের জন্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সিরাজগঞ্জে ১৯৭২ সালের ১৩ মার্চ একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র খোলা হয়েছিল। সেই কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছিলেন প্রায় ১০০ জন নারী। এদের মধ্যে ৫০/৬০ জনই ছিলেন বীরাঙ্গনা। এই বীরাঙ্গনার মধ্যে ৩৬ জন নিয়েছিলেন নানা রকম প্রশিক্ষণ। এই বীরাঙ্গনাদের থেকে সেই কেন্দ্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজে আমি আসি সিরাজগঞ্জ। উঠি মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানীর দেবর মুক্তিযোদ্ধা জগলু চৌধুরীর বাসায়। সাফিনা লোহানীর বাসাতেই পরিচয় হয় ১৪ জন বীরাঙ্গনার সঙ্গে।

 

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সিরাজগঞ্জ আসেন। এই বীরাঙ্গনা সহ ৩৫ জন বীরাঙ্গনা সেজে ছিলেন ভিন্ন সাজে। সবাই  সেদিন পরেছিলেন লাল পাড় সাদা শাড়ি। পাড়ে নৌকার কাজ, বুকে নৌকার ব্যাজ, হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। সবার বয়স তখন বিশের কোঠায়। সবার সামনে মালা হাতে দাঁড়ালেন বীরাঙ্গনা হাসনা বানু। বঙ্গবন্ধু তাঁর ছোট ছেলে রাসেলকে নিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসতেই হাসনা বানু তাঁকে মালা পরিয়ে দিলো। এদিকে মাইকে ঘোষক জানালেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে আজ অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন তারা দেশের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষ, বীরাঙ্গনা। বঙ্গবন্ধু ঘুরে দাঁড়ালেন। হাসনা বানুকে পরম স্নেহে বুকে টেনে নিলেন। একে একে সব বীরাঙ্গনার কাছেই গেলেন। কারও মাথায় হাত বুলালেন, কারও কাঁধে হাত রাখলেন, কাউকে আবার বুকে টেনে নিলেন। বীরাঙ্গনারা এই স্নেহের ছোঁয়ায় উদ্বেলিত হয়ে আনন্দে কেঁদে ফেললো। বীরাঙ্গনা রাহিলার কথায়, “বঙ্গবন্ধু তাকে বুকে নিয়ে সোহাগ করেছে। বলেছে, আজকের থেকে আমি তোমাদের বাবা, আজীবন তোমাদের সব কিছু বহন করবো আমি। হাসিনা যেমন আমার বিটি, তোমরাও আমার সেইরকম বিটি। তোমাদের কোনও ভাবনা নাই।” এরপর বঙ্গবন্ধু মঞ্চে ওঠেন। বীরাঙ্গনারা মঞ্চের নিচে একেবারে সামনের সারিতে বসেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বীরাঙ্গনাদের জন্য সব কিছু করার আশ্বাস দেন।

 

এরপর আসে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু থেমে থাকেন না সাফিনা লোহানী। বীরাঙ্গনাদের অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যান। তিনি গঠন করেন উত্তরণ মহিলা সংস্থা। এ সংস্থার মাধ্যমেই তিনি লড়াই করেন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে। সমাজে তাদের পূর্ণ মযাদা দিতে তিনি অনেক অপমানিত হয়েছেন, অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনাও হজম করেছেন। তবে হাল ছাড়েন নি। শেষ পর্যন্ত বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার খেতাব পেয়েছে। তাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। তারা এখন ভাতা পাচ্ছেন। আর সাফিনা লোহানী হয়ে ওঠেন বীরাঙ্গনাদের আম্মা। মুক্তিযোদ্ধা সাফিনা লোহানী এই মুহূর্তে পক্ষাঘাতগ্রস্থ। কথা বলতে পারেন না। যা বলেন তাও অস্পষ্ট। চলতি বছরের নভেম্বরে তার বাসায় আসেন ১৪ জন বীরাঙ্গনা। তাদের উপস্থিতিতে খুশি হয়ে ওঠেন সাফিনা লোহানী। অস্পষ্ট ভাষায় তিনি তাদের আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন এরা আমার মেয়ে। সাফিনা লোহানীকে ঘিরে সেখানে সৃষ্টি হয় এক আবেগ ঘন পরিবেশ। এতকাল যে ইতিহাস রচিত হয়েছে রাজা- রাজড়াদের দিক থেকে, এখন সময় হয়েছে জনগণের দিক থেকে ইতিহাস রচনার। নাহলে মহাকাল আমাদের অন্তরের দীনতা ক্ষমা করবেন না।

Promotion