EXCLUSIVE NEWS

রিকশা থেকে কলম, কেমন ছিল দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারের স্থান পাওয়া মনোরঞ্জন ব্যাপারীর পথ চলা?

সবে হাঁটতে চলতে শিখেছেন হয়তো, বয়স বছর তিনেক। দেশভাগ হয়েছে পাঁচ-ছ’বছর আগে। ওপার বাংলা থেকে হাজারে হাজারে শরণার্থী তখনও এদেশে আসছে, সালটা ১৯৫৩। কী তার পরিচয়? তার দেশের নাম কি? এসব জানার বা বোঝার বয়স হয়নি তখনও। বাবা, মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে পাড়ি অনিশ্চয়তার পথে। বদলে গেল দেশের নাম, ঠাঁই হলো বাঁকুড়ার রিফিউজি ক্যাম্পে। আদেশ এলো সেখান থেকে দণ্ডকারণ্যে যাওয়ার। কিন্তু মানতে রাজী হয়নি বাবা, ক্যাম্প থেকে নাম কাটা গেল। শুরু হল কঠিন লড়াই, মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজার লড়াই, পেটের ভাত জোগাড়ের লড়াই। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো পরিবার মাথার উপর থেকে যেন আকাশটাও হারালো। শুরু হলো এক বালকের লড়াই। যে বয়সে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে ওঠে, মন পড়ে থাকে খেলার মাঠে, সেই বয়সে গরু চড়ানো, চায়ের দোকানে খেটে উপার্জনের চেষ্টা শুরু। চোখের সামনে দিদিকে খিদেতে শুকিয়ে মরতে দেখেছেন। জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, গুয়াহাটি, লখনৌ, বেনারসে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন, বেগার খেটেছেন। তারপর আবার ফিরেছেন কলকাতায়। হোটেলে পেট পুরে খাবার খেয়ে দৌড়ে পালিয়েছেন, ক্ষিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

 

যাদবপুর স্টেশন চত্বরে রিক্সা চালানো শুরু। চাকু-বোমা ধরায় হাতেখড়ি, দিবারাত্র মদে ডুবে থাকা, পেটের দায়ে অপরাধ, শেষ নকশাল আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগদান- রোজ রোজ জীবনের গতিপথ বদলেছে। প্রতিটা দিন জীবন তাকে নতুন শিক্ষা দিয়েছে। শেষে তাঁর দু’বেলা খাবার জোটে ঠাঁই হয় জেলখানায়। এই জেলেই বন্দী থাকা এই আসামীর সংস্পর্শ তাঁকে বদলে দেয়। বৃদ্ধ আসামীটি শিক্ষিত ও জ্ঞানী ছিলেন, তিনি তাঁকে বাঁচার জন্য রসের সন্ধান দিলেন। দেখালেন পড়াশোনার পথ, নিজে অবতীর্ণ হলেন শিক্ষক ও বই রূপে। জেলখানার উঠান হলো স্লেট, গাছের ভাঙা সরু ডাল তার পেনসিল, শুরু হলো নতুন এক সাধনা। জেলার সাহেব তাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়ে জেলেই বইয়ের ব্যবস্থা করে দিলেন। এক কয়েদি বইয়ে ডুব দিলেন নিজেকে খুঁজতে। জেল থেকে বেরোলেন, রিক্সা চালানো চললো, এবার আর বোমা-চাকু না, অবসরে সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল বই।

 

একদিন তাঁর রিক্সায় ওঠা এক ভদ্রমহিলাকে সাহস করে জিজ্ঞেন করলেন ‘জিজীবিষা’ শব্দের অর্থ। রিক্সাচালকের এহেন প্রশ্নে কৌতূহল জাগলো মহিলার। তিনি শব্দটির অর্থ বলেই থামলেন না, চললো আরও কথোপকথন। নিজের ম্যাগাজিনে ওই রিক্সাচালককে নিজের গল্প লিখতে বললেন। ভদ্রমহিলা রিক্সাচালককে নিজের বাড়ির ঠিকানা দিলেন। রিক্সাচালক হাতে নিয়ে দেখলেন ওই ভদ্রমহিলা আর কেউ নন। স্বনামধন্য লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী। রিক্সাচালকের কথায়, মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো তিনি শিক্ষিত এক রিক্সাচালকই রয়ে যেতেন। কিন্তু তাদের ওই সাক্ষাৎ সবকিছু বদলে দিল, নানা পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরতে থাকলো। তাঁকে চিনতে শুরু করলো বাংলা। তাঁর গুণগ্রাহীর সংখ্যা বাড়ল লাফিয়ে লাফিয়ে।

তারপর আবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্বাস্তুদের ঢল নামে পশ্চিমবঙ্গে। তখন রাজনৈতিক অস্থিরতাও চরমে। উদ্বাস্তু কাকার ছেলের সাথে হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মধ্যপ্রদেশে চলে যাওয়া, গাছ কেটে বিক্রি করে উপার্জন শুরু।পরবর্তীতে মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত শ্রমিক নেতা ও তাত্ত্বিক শংকর গুহ নিয়োগীর সংস্পর্শে এসে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হন। বেশ কয়েকবছর পর আবার কলকাতায় ফেরা, আবার শুরু লেখালিখি। কলম হাতে আবার যুদ্ধ ঘোষণা। সে যুদ্ধ খিদের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ জাতপাতের বিরুদ্ধে, সে যুদ্ধ কঠিন-কঠোর জীবনের বিরুদ্ধে। এবার তাঁর জেতার পালা। প্রকাশিত হতে থাকল একের পর এক উপন্যাস, বই। তাঁর আত্মজীবনী হাজারে হাজারে বিক্রি হচ্ছে, বইয়ের নাম ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’। কিন্তু এখনও তাঁর জীবন আর পাঁচটা এলিট সাহিত্যিকের মতো না। একটি মূক ও বধির স্কুলের হোস্টেলের রাঁধুনি তিনি। দু’বেলা ১৫০ জন করে মোট ৩০০ জনের রান্না করেন, বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই।


তাঁর লেখা নিয়ে প্রশংসা শুনে তিনি বলেন সুন্দর লিখতে আসেননি, তিনি এসেছেন তাঁর ভেতরের কষ্টের কথা বলতে, জাতপাতের বেড়াজাল ছিন্ন করতে। তিনি নিজেকে খেলোয়াড় বলেন। তিনি এসেছেন পিছিয়ে পড়া দলিত শ্রেণীর মানুষকে লড়াইয়ের বার্তা দিতে, তাদের অধিকারের কথা বলতে। বিমানেই চড়ুন আর ট্রেনেই চড়ুন, তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গীগামছা। তাঁর কথায় তিনি সঙ্গে গামছা রাখেন, তাঁর শিকড়কে মনে রাখার জন্য। এই ভদ্দরলোক বাবুদের মাঝে নিজের লড়াইয়ের কথা যাতে ভুলে না যান। গামছা ঘাম-রক্ত মোছে, গামছা অনেকের বিছানা, অনেকের শীতবস্ত্র, গামছা অনেকের কাছে ছাতা, গামছা সব লড়াইয়ের সাক্ষী।

 

এতক্ষণ যাঁর কথা বলা হল, তিনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী। দেশের এক অন্যতম সেরা সাহিত্যিক। তাঁর আত্মজীবনী ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে, ‘Interrogating My Chandal Life: An Autobiography of a Dalit’, অনুবাদক শিপ্রা মুখার্জী। বইটির জন্যে তিনি পেয়েছেন ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’ এবং জাতীয় স্তরের বিভিন্ন পুরস্কার । ২০১৮এর জানুয়ারি মাসে ‘দ্য হিন্দু’র সেরা লেখক বলে বিবেচিত হয় তাঁর নাম। সত্তর ছুঁইছঁই মানুষটি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, “এই আনন্দ শুধু আমার নয়, যাদের বঞ্চিত করা হয় তাদের সকলেরই”। এবার তার মুকুটে জুড়লো আরেকটি পালক। দক্ষিণ এশিয়ার সাহিত্যের সব থেকে ওজনদার পুরস্কার ডিএসসি প্রাইজের ২০১৯ সালের লংলিস্টে যে পনেরোটি উপন্যাস স্থান পেয়েছে তার মধ্যে রয়েছে তার উপন্যাসও। ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’র ইংরেজি অনুবাদ ‘Theirs Gunpowder in the Air’  জায়গা করে নিয়েছে সেখানে। এটি অনুবাদ করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক অরুণাভ সিংহ। সম্প্রতি দিল্লিতে এই লংলিস্টের ঘোষণা করেন পাঁচ সদস্যের আন্তর্জাতিক জুরির প্রধান এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির প্রাক্তন অধ্যাপক হরিশ ত্রিবেদী।

 

লংলিস্টে মনোনীত উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে অকিল কুমারস্বামীর ‘হাফ গডস’, অমিতাভ বাগচির ‘হাফ দ্য নাইট ইজ গন’, ফতিমা ভুট্টোর ‘দ্য রানাওয়েজ’, রাজকমল ঝা’র ‘দ্য সিটি অ্যান্ড দ্য সি’ এবং পেরুমল মুরুগনের ‘আ লোনলি হারভেস্ট’। পনেরোটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে তিনটি অনুবাদ – বাংলা, তামিল ও মালয়ালম থেকে। মোট ৯০টি বই থেকে ১৫টি বেছে নেওয়া হয়। আগামী ৬ নভেম্বর লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পাঁচ বা ছ’টি বইয়ের শর্টলিস্ট ঘোষণা করা হবে। চলতি বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর পোখরায় আইএমই নেপাল সাহিত্য উৎসবে বিজেতার নাম ঘোষিত হবে। ২০১১ সাল থেকে এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। এই পুরস্কারের প্রাক্তন বিজেতাদের মধ্যে রয়েছেন ঝুম্পা লাহিড়ী, অনুরাধা রায় প্রমুখ।

Promotion