Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
বাপি দাস - সময়ের দলিলে মহীনের ঘোড়াগুলির পায়ের ছাপ স্পষ্ট - Exclusive Adhirath
প্রত্যাশার পারদ

বাপি দাস – সময়ের দলিলে মহীনের ঘোড়াগুলির পায়ের ছাপ স্পষ্ট

মহীন কোথায়? কীভাবে বেঁচে রয়েছে?

মহীনের ঘোড়াগুলির হয়ে ১৯৭৫-এ আমরা যারা গান শুরু করেছিলাম, তারা নিছক স্টেজে নাচন-কোঁদন করার জন্য এটি করিনি। লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে শুধু হাজার হাজার দর্শকের হাততালি পাওয়াটাও আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। মহীনের ঘোড়াগুলি আমাদের কাছে ছিল এক সাঙ্গীতিক যুদ্ধ। আমরা চেয়েছিলাম কিছু মশাল-বাহককে খুঁজতে যারা পরবর্তী প্রজন্মের হয়ে গানের ব্যাটন কাঁধে নেবে। এই প্রবহমানতার প্রথম সিঁড়ি তৈরি হয় ১৯৯৫ সালে। ‘বছর কুড়ি পর’ নামে একটি ক্যাসেট অ্যালবাম কলকাতা বইমেলায় প্রকাশ করেছিলাম আমরা। মণিদা আমায় বলেন, আমরা একটা অডিও ক্যাসেট কোম্পানি তৈরি করবো। তারপর কিছু উদীয়মান সঙ্গীতশিল্পীকে তুলে আনবো যারা আমাদের মতো করেই ভাবছেন। যেমন সুরজিৎ, পরমা, দেবজ্যোতি মিশ্র, সুব্রত প্রমুখরা। এরা প্রত্যেকেই আজ সেলিব্রিটি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা নিজেরা ভোকালিস্ট হওয়া সত্ত্বেও গান গাইবো না, ওদের দিয়ে গাওয়াবো। আমরা শুধু অ্যারেঞ্জ করবো।

১৯৯৯ সালে মণিদা মারা গেলেন। তখন আমি আমার নিজের ঠিকানা ভুলে গিয়েছি, খালাসিটোলায় বাংলা মদ খাই, এরকম একটা পরিস্থিতি। তারপর হঠাৎ একদিন মনে পড়লো মহীনের ঘোড়াগুলির ইস্তেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা। ব্যাস, নতুন বন্ধু খোঁজা শুরু হলো। সময়টা তখন ২০০৩ সাল। দেখলাম শহরের চেয়ে শহরতলির ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি গান নিয়ে সচেতন। জন্ম নিলো ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’। ২০১১, ২০১৫, ২০১৮ এবং চলতি বছরেও আমরা সিডি প্রকাশ করলাম। ইতিমধ্যেই প্রচুর শো করেছি, খুব শিগগিরি আমরা বাংলাদেশেও যাচ্ছি। কিন্তু এসবেও মাঝেও আমার উপলব্ধি মহীন বেঁচে আছে অদ্ভুতভাবে। সাতাত্তরে লেখা একটা লিরিকের কথাই বলি। “কালকে রাত্তির পোহালে/ দইয়ের ফোটা কপালে/ ফাউন্টেন পেন সামলে রাখি/ মরি অ্যাডমিট কার্ড হারালে/ বিনীতা কেমন আছো?/ বিপদ আমার, পরশু বিএ পার্ট টু/ কী জানি কী লিখবো খাতায়?” শুধুই সমুদ্রের ধারে ওই আঁচল পড়ে যাওয়া; চাঁদ, তারা, ফুল এগুলির বাইরে ভাবনাকে বের করার জন্যই গানটি লিখেছিলাম। আমরা জানতাম মহীনের ভাবনা দীর্ঘ সময়ের পর একটি মতবাদে রূপান্তরিত হবে। প্রান্তিক অনেক শিল্পীরাও এর মধ্যে দিয়েই চলবেন। আজও পর্যন্ত ব্যান্ড প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে আমাকে যেতে হয়। সাধারনতঃ দুটি গান করতে বলা হয় প্রতিযোগীদের। একটি নিজস্ব এবং আরেকটি কভার সং। কভারিংয়ে মহীনের ঘোড়াগুলির গান ছাড়া অন্য গান বিশেষ একটা শুনিনি গত দশ বছরে। এভাবেই প্রতিটি মুহূর্তে বুঝতে পারি, মহীন এভাবেই বেঁচে রয়েছে।

“তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগেনা  যেন/ উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে কেন/ কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।” সেই লুকিয়ে থাকা বিষাদের খোঁজ কি পেলেন?

সাতের দশকের গোড়ায় কংগ্রেসের অত্যাচারী শাসন, পঁচাত্তরে ইন্দিরা গান্ধীর ইমার্জেন্সি, সাতাত্তরে জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়েই আজ আমি চৌষট্টি। এই বয়েসে পৌঁছে বুঝলাম সমস্ত বিষাদটা লুকিয়ে আছে ওদের ওই স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের মধ্যেই। কিছুদিন ধরেই শুনছি, ২৭ হাজার কোটি টাকা বিজেপি ভোটের জন্য খরচ করেছে। আমরা সকলেই জানি কর্পোরেট এই টাকাটা দেয়, পরে তারা সেই টাকার তিনগুণ উসুল করবে। ধরে নেওয়া যেতে পারে এটাই আমার বিষাদ।

বাংলা গানের স্বর্ণযুগে যখন মান্না-হেমন্ত-শ্যামলরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের হাত ধরে গণসঙ্গীতের প্রচার মধ্যগগনে। সেই সময়ে বাংলা ব্যান্ডের মতো এরকম ব্যতিক্রমী ভাবনা কেন?

এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রশ্ন, অনেকেই করেন না। ১৯৫০-এ আইপিটিএ’র(অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা) কথাই ধরা যাক। সলিল চৌধুরী আইপিটিএ’র কথা লিখতেন। ছিলেন মোহিনী চৌধুরী, যার অবদান ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’কে দাঁড় করানোর পিছনেও ছিল। আর জ্বলজ্বল করছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৯৭৫-এ এসে মনে হলো, এমন ধরনের গান আমরা তৈরি বাঁধবো, এমন শব্দ চয়ন করবো যা ভাষাগত দিকে আরও আধুনিক হবে। সেগুলি গণসঙ্গীতের থেকেও স্বতন্ত্র হবে। ট্রামের ঘণ্টা, ভোরের কুয়াশা, কলকাতার চেহারা এসব ব্যবহার করবো। সলিল চৌধুরীর ক্ষেত্রে একটি কথা বলতে চাই। ভাবাই যায় না উনি কতোটা সম্মানের অধিকারী। ভারতে প্রথম হারমোনি স্কেল অর্থাৎ সা পা গা’র সূচনা তাঁরই হাত ধরে। অথচ থার্ড হারমোনির ওপরে উনি কোনওদিন যান নি। কারণ তার বেশি ওপরে গাইলে শ্রোতার বুকে এমন একটা লাথি পড়বে যে দ্বিতীয়বার সেই গান শুনবেন না তারা। উনি কখনই সেই চান্স নেন নি।

আমরা পঁচাত্তরে এসে সা পা গা-র বাইরে গিয়ে সেভেন্থ হারমোনিতে গান গেয়েছি। তৎকালীন সময়ের গানের কথার সীমাবদ্ধতা, দশ বছর ধরে একঘেয়েমি সবই গিয়ে শেষপর্যন্ত শাড়ির আঁচলে আটকে যেত। আমরা প্রতিজ্ঞা করি, এমন কোনও গানই আমরা লিখবো না যেখানে মানবিক প্রেম রয়েছে। মানে চোখের রঙ কালো, চোখের ভ্রূ নাকি খুব লম্বা এগুলোই খালি শুনতাম। কিন্তু সাহস নেই বলার যে স্তনটি বড়। ওই সাহস রবীন্দ্রনাথের ছিল। আমরা মনে করেছিলাম, “মিনি বাসে ঝুলতে ঝুলতে আমার বাবা রাইটার্সে কাজে যান” এটিও গানের কথা হতে পারে। তাই এই প্রথাগত সিস্টেম ভাঙতে গানের ময়দানে নেমে পড়লাম।

কয়েকটি লিডিং ব্যান্ড ছাড়া অন্য কোনও বাংলা ব্যান্ড উঠে আসছে না। তাহলে বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ কি ফুরিয়ে আসছে?

আপাতঃদৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। আজ থেকে ১৫ বছর আগেও বাংলা ব্যান্ড দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল সেখানে ডিজে ঢুকেছে। এখন অরিজিৎ সিংহের গান গাইতে হবে। সেখানে বাংলা ব্যান্ড সাময়িকভাবে একটা ধাক্কা খাচ্ছে। তবে এই অবস্থা চিরস্থায়ী হবেনা। তাই আবার কোনও স্বর্ণযুগ না হোক রৌপ্যযুগ ফিরে আসবে। আরেকটি খুব দরকারি কথা। যারা এটা ফেরাবে তাদের ভেবে রাখতে হবে যে গানটি আমি তৈরি করছি সেটি যেন লড়াইয়ের যোগ্য হয়। আমার এক ছাত্র কিছুদিন আগেই একটা লিরিক শুনিয়েছে। “তোমার সঙ্গে দেখা না হলে, খেঁচে আমি আমার জিন্স ভিজিয়ে ফেলি”। তাকে লাথি না মারলেও, বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এটি যদি স্ট্যান্ডার্ড হয় তাহলে বাংলা ব্যান্ডের ফিরে আসার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই ফিরে আসতে গেলে একটি বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হয়।

অতিরিক্ত সফটওয়্যার ও অ্যাপস নির্ভরতা কি গানের ক্ষতি করছে?

 

শোনা গিয়েছে তৎকালীন সময়ে মহিলারা কাজের ফাঁকে গুনগুন করেও যদি মহীনের গান গাইতেন সেটি নাকি একেবারেই ভালো চোখে দেখা হতো না। এটি কি সত্যি?

অধিকাংশ দিনই আমার আর মণিদার ফিরতে রাত হতো। আমরা ছয়জন ব্যান্ড সদস্য একই পাড়ায়, বেহালা পঞ্চানন তলায় থাকতাম। অন্ধকার থেকে আমাদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়া হতো, কুকুর লেলিয়ে দিতো। যেখানে একজন পারফর্মারকে রাস্তায় ঢিল ছুঁড়ে মারা হচ্ছে সেখানে একটি মেয়ের ক্ষেত্রে এটা তো স্বাভাবিকই। আসলে সেই সময়ে একটা ছেলের কোমর পর্যন্ত মাথার চুল, প্যান্টের হাঁটুর অংশ ছেঁড়া তা সমাজ মেনে নেয়নি। তাই রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সব দিক দিয়েই আমাদের আটকে দেওয়ার চক্রান্ত হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে বহরমপুরে আমাদের একটি কল শো ছিল। ভোরে আমরা সেখানে পৌঁছলাম। মনে রাখতে হবে সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকারকে অনেক বেশি উদারপন্থী এবং সাংস্কৃতিক বোদ্ধা ভেবেছিলাম। বহরমপুর পৌঁছে দেখলাম আমাদের কিছুতেই স্টেশন থেকে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। বিক্ষোভকারীদের হাতে প্ল্যাকার্ড “অপসংস্কৃতি দূর হটো”। আয়োজক ‘স্পন্দন’ আমাদের কোনওরকমে হোটেলে পৌঁছে দিলো। এরপর আমাদের বেসিস্ট বিশু হঠাৎ দুপুরে ডাকলো। বারান্দায় দিয়ে দেখলাম প্রায় শ’তিনেক ছাত্র বিক্ষোভ করছে। অদ্ভুতভাবে সেখানে কংগ্রেস ছাত্র পরিষদও রয়েছে আবার এসএফআইয়ের লাল ঝাণ্ডাও উড়ছে। তখন আমরা উপলব্ধি করি, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সব অপগণ্ডরাই একই দলে। যদিও তার মধ্যেই আমরা শো করেছিলাম।

জ্যাজ-বাউল জঁর নিয়ে আপনারা কাজ শুরু করেছিলেন। কীভাবে এটি বাংলার আদি রক ব্যান্ড হয়ে গেল?

জ্যাজ মিউজিক বুঝতে গেলে যে কাউকে যথেষ্ট পড়াশুনা করতে হয়। নাহলে তার পক্ষে এটি বোঝা এবং রস আস্বাদন করা মুশকিল। আমরা জ্যাজ-বাউল দিয়েই শুরু করেছিলাম। আটের দশকের একদম গোড়ায় একমাত্র ভারতীয় ব্যান্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক জ্যাজ-বাউল ফেস্টিভ্যালে গাইবার সুযোগ পাই। কলকাতার সেন্ট পলস ক্যাথিড্রালে ২২ মিনিটের একটি জ্যাজ-বাউল উপস্থাপনা আমরা করি। কিন্তু দেখলাম, এই গানের রসবোধ শ্রোতাদের নেই, আমরা প্রচুর পিছনে লাথি খেলাম। কারণ এখানে কেবল “সারাটি দিন ধরে, চেয়ে আছিস ওরে” এসবই চলবে। বুঝলাম অন্য কিছু করা দরকার। একটি সামাজিক চেতনা, একটি বার্তা দেওয়া খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। কাজেই আমরা একেবারেই নতুন আকারে শুরু করলাম।

এই সময়ে আমার আপনার দেশ এক ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের মধ্যে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে  অন্ততঃ সাংস্কৃতিকভাবে হলেও মানুষ যৌথবদ্ধ হয়ে উঠতে পারছেন না কেন?

এটি আসলে একটি প্রাতিষ্ঠানিক চক্রান্ত। খুব গোদা ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করছি। মমতা ব্যানার্জী এই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সরকার নানারকম ভাবে শিল্পীদের টাকা পয়সা বিলিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠান এভাবেই কিনতে শুরু করে। আর টাকা তো অবশ্যই খুব লোভনীয় একটি জিনিস। তার পরেই যেটি আসে তা হল সামাজিক ক্ষমতা। এখন প্রতিষ্ঠানের এই চক্রান্ত বুঝতে গেলে দু’ধরনের পড়াশুনার দরকার। প্রথমটি হল, প্রতিদিন আমি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি। তারপর কালী মন্দিরের সামনে গিয়ে দেখছি কতজন লোক কোন কোন স্টাইলে মাথা ঠুকছে। হয়তো সেই মন্দিরের পাশেই একটি রিকশা-স্ট্যান্ড। সেই রিকশাচালক যখন দোকানে ফুলকপি কিনতে যায়, পয়সার অভাবে তা কিনে উঠতে পারেনা। এই পর্যবেক্ষণ কিন্তু এক ধরনের পড়াশুনা।

আরেকটি হল পুঁথিগত পড়াশুনা। প্রশ্ন হল তুমি কি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছো? ব্যাস, তোমাকে আরও জনপ্রিয় করে দেবো। তুমি ভাই আমার দলে নাম লেখাও, এই এই শর্ত মানতে হবে। সৌমিত্র এবং নচিকেতা এই পর্যায়ের শিল্পী যাকে রাষ্ট্র কিনে নিতে পেরেছে। কবীর সুমন বামপন্থী হয়ে তৃনমূলের হয়ে জিতলেন। তারপরেও তিনি এখনও পদত্যাগ করেন নি, দলও তাকে তাড়ায় নি। সংসদের সদস্য হলে বছরে বেশ কিছু টাকা পাওয়া যায়, সে স্ট্যান্ডিং এমপি থাকুন আর নাই বা থাকুন।

গোটা দেশের মোট প্রায় ১৭০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র তিনটে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রের সমালোচনা শুনতে পাওয়া যায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়।  কীভাবে তাহলে সবাই এককাট্টা হবে? ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি দিয়েই আমাদের ভাগ করা হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ভয়ঙ্কর কঠিন কাজ।

সঙ্গীতে দিনবদলের স্বপ্ন নিয়ে এই যে মাঠে নেমে পড়া। এটি কি কেবলই মুহূর্তের ডাক? নাকি মিউজিক নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের তৃষ্ণা?

আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস হারিয়েছিলাম। লেনিনের ভাষায়, পার্লামেন্ট ‘শুয়োরের খোঁয়াড়’ বলেই মনে করতাম। আমাদের মনে হল নকশালবাড়ি আন্দোলনের রাস্তাটাই সঠিক রাস্তা। আমরা জড়িয়ে পড়লাম এই আন্দোলনের সঙ্গে। মাত্র আড়াই বছরের মধ্যেই আমরা উপলব্ধি করলাম এটি অত্যন্ত ভুল রাস্তা। সিপিআই(এমএল)-এর একদম শীর্ষস্থানীয় নেতা যেমন চারু মজুমদার, কানু সান্যালরাই খোদ স্বীকার করলেন এটি সঠিক রাস্তা নয়। চিনের চেয়ারম্যান কখনোই আমাদের চেয়ারম্যান হতে পারেন না। মণি দা ধরা পড়ার পর বন্দী ছিলেন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের ৫২ নম্বর সেলে। ৫১ এবং ৫৩ নম্বর সেলেও দুই নকশাল আন্দোলনের কর্মী বন্দী ছিলেন। মণিদা গীটার নিয়ে আমাকে যেতে বলেছিলেন, জেলার সাহেবও গানের অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্যান্য নকশাল কর্মীদের ধারণা হয়েছিল মণিদা বোধহয় প্রতিক্রিয়াশীল। কয়েদীরা যখন কমন সময়ে একত্রিত হতো তখন প্যাঁক মেরে কোণঠাসা করে দেওয়া হয় তাকে। নিজের দলের ভেতরেই এই অবিশ্বাস, দলের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক ভুল পদক্ষেপে আমরা দল ছেড়ে বেরিয়ে আসি। একাত্তরে ছাড়া পায় মনিদা। এরপর আমরা কী করবো? আমাদের ভেতরের ক্রোধ, শিক্ষা এগুলির একটি বহিঃপ্রকাশ দরকার ছিল। তাই মাধ্যম হিসেবে সমকালীন বাংলা গানকেই বেছে নিলাম।

মহীনের বর্তমান সংস্করণ ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’। এটি কি মহীনের ভাবনাকে টিকিয়ে রাখার দায়? নাকি এর পিছনে আরও কিছু চিন্তা রয়েছে?

‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’ বিশ্বাস করে ঠিক যে ধরনের সামাজিক অবস্থায় মহীনের ঘোড়াগুলি নিজেদের তৈরি করেছিল। মহীনের বর্তমান সংস্করণ মনে করে আজও সেই একই পরিস্থিতির মুখে আমরা দাঁড়িয়ে। নকশাল করার অপরাধে লালবাজারে এক মহিলা কবিকে ১৯৭০-এ উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে তাঁর যোনিতে সেদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন সিরিয়াতে যদি এখন কোনও মেয়েকে উলঙ্গ অবস্থায় গুলি করে মারা হবে সেই দৃশ্য দেখার জন্যই ভিড় জমে যাবে। বাংলাদেশের শাহবাগে রাজাকারদের বিরুদ্ধে এক লক্ষ ছেলেমেয়ে একদিনে জড়ো হচ্ছেন। আজ আমরা সাতের দশকের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছি। এখানে আজ মহীনকে এক কোটি কিলোমিটার পেরিয়ে গিয়ে একটি দল তৈরি হওয়া উচিৎ ছিল, হয়নি! কাজেই যৌথতা তৈরি হোক এটাই চাই।

রিয়্যালিটি শো কি শিল্পী তৈরি করে নাকি তারকা তৈরি করে?

রিয়্যালিটি শো শিল্পী তৈরি করেনা, তারকা তৈরি করে। শিল্পী আর সেলিব্রিটির মধ্যে তো অনেক তফাৎ রয়েছে। আমেরিকার দেখাদেখি রিয়্যালিটি শো আমরা আবিষ্কার করেছি। যারা এগুলি দেখেন তাদের আইকিউ লেভেল বিলো এভারেজ বললেও কম বলা হয়। নানা রকম অঙ্গভঙ্গী, পোশাক, হ্যা হ্যা করে ওঠা, অসহ্য যন্ত্রণা সব!

সাতের দশকের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও যে আপনারা এভাবে জিতবেন তাঁর অনুমান কি আগে করতে পেরেছিলেন?

না, পারিনি অনুমান করতে। আর সাফল্য সেই অর্থে আমরা ওই সময়ে পাইওনি। আমাদের ‘পাগল’, ‘ভিখারি’ এসব বলে ডাকা হতো। কিন্তু একটা কথা জানতাম, আমরা যা করছি তা একটি মাইলফলক। হয়তো সেই সময়ে আমাদের কাজ গ্রহণযোগ্য হবে না, কিন্তু আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর হবে এটাই ভাবতাম।

আরও মহীনের ঘোড়াগুলি তৈরির কতোটা সম্ভাবনা দেখছেন?

সম্ভাবনা দেখছি না। তবে আদৌ সম্ভাবনা নেই এটিও তো বলা যাচ্ছে না। অন্ততঃ ৮০-৮৫ বাংলা ব্যান্ডের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই কলকাতার থেকে দূরে থাকে বলে একটি সমস্যা রয়েইছে। যেমন উত্তরবঙ্গের স্বরবর্ণ, তারা চাইলেই তো কলকাতা রবীন্দ্র সদনে একটি শো করতে পারবে না। তাই মনে করি মহীনের ঘোড়াগুলি নামটি হয়তো বদলে যাবে, কিন্তু ওই অ্যাটিটিউড নিয়ে, ইস্তেহার নিয়ে কেউ না কেউ আসবেই।

সাড়ে চার দশক সঙ্গীতের সঙ্গে ঘর করে বহু কিছু পেয়েছেন। এখনও কি কিছু পাওয়া বাকি?

অনেক কিছু পাওয়া বাকি। স্বীকৃতি বা দুটো এসি ফ্ল্যাটও চাইছি না। তাও বহু কিছুই চাই। সুন্দরবন, আলিপুরদুয়ার বা বাংলাদেশ সর্বত্রই গিয়ে শুনেছি মহীনের গান। এই অবস্থা ধারাবাহিক হোক, এই চাওয়াটি বাকি রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

Promotion