মরসুমী ফুল

কেনাকাটা শেষ করে ঈদের জন্য প্রস্তুত মালদা

গত এক সপ্তাহ ধরেই মালদার প্রধান দুই স্টেশন মালদা টাউন, হরিশচন্দ্রপুর এবং মালদার শেষ প্রান্তবিন্দু মুর্শিদাবাদের ফারাক্কা স্টেশনে নামছে সাধারণ মানুষের ঢল।একদিকে মালদা উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার ও উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গের সংযোগ স্থাপনকারী লাইফলাইনও বটে। এখানকার মাটিতে রয়েছে বহুকালের আম-রেশমের খ্যাতির গন্ধও। কিন্তু শিল্প, কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে খুব একটা ভাল জায়গায় নেই এই  অঞ্চল। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই জেলায় সাধারণ মানুষের পেট চালানোর মতো রোজগারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বছরের বেশিরভাগ সময়ই এখানকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে কাজের খোঁজে পাড়ি জমাতে হয় ভিন রাজ্যে। কী! মনে পড়ছে গত একবছরের কিছু বেশি সময় আগে এই জেলারই পরিযায়ী শ্রমিক আফ্রাজুলও এরকমই পেটের দায়ে কাজ করতে গিয়েছিল রাজস্থানে। সেখানে সেই মানুষটিকে খুন হতে হয়েছিল উগ্র সাম্প্রদায়িকদের হাতে।
হ্যাঁ, এটাই সেই মালদা। সংখ্যালঘু ও শ্রমিক প্রধান এই জেলা বছরের বেশিরভাগ সময়টা কার্যত পুরুষশূন্য থাকে। যদিও ঈদ আর বকরিদে মানুষের ঘরমুখী হাওয়ায় ভরে উঠে এই জেলার শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে প্রতিটি প্রান্তর। এখানে বসবাসকারী প্রায় ৯৫% মানুষই বাঙালি। তাই এখানকার ঈদে রয়েছে বাঙালিয়ানার গাঢ় ছাপও। রমজানের ১৫ দিন পর থেকেই শুরু হয়েছিল ঈদের কেনাকাটার তোড়জোড়। জেলার প্রধান শহর তথা সদর শহর মালদা টাউন (ইংলিশবাজার), চাঁচলের সাথেই আরেক মফঃস্বল শহর কালিয়াচকেও ভিড়ের চাপে পা ফেলা দায়। সকাল থেকেই শহরগুলোর ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড়ো শপিং মল প্রত্যেকটাই লোকারণ্য। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত এমনকি পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও প্রতিবেশী জেলা দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ থেকেও মানুষ পা বাড়াচ্ছেন মালদার দিকেই। সংবাদ প্রতিবেদনের স্বার্থে শহরের বিভিন্ন দোকান গুলো ঘুরে দেখলাম মানুষের কেনাকাটার ধরন। জানলাম কাপড় দোকানের কর্মীদের থেকেও বিভিন্ন কথা।
মহিলাদের ক্ষেত্রে শাড়ি, সালওয়ার কামিজের সঙ্গেই অনেক যুবতী বেছে নিচ্ছেন লেহেঙ্গার মতো উত্তর ভারতীয় পোশাকও। এক দোকানের কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম গত বছরে বিশেষ চাহিদা ছিল কুর্তি, সালোয়ার। কিন্তু এই বছর কুর্তি সালোয়ারের ছাড়াও মেয়েদের প্রধান পছন্দেই উঠে এসেছে রংবেরঙের কারুকাজ করা লেহেঙ্গা। তিনি আরো জানালেন এই জেলায় ওয়েস্টার্ন পোশাকের চাহিদা তেমন একটা নেই। পুরুষদের ক্ষেত্রে পাঞ্জাবি-পায়জামার সঙ্গেই থাকছে জিন্স, শার্ট এর চাহিদাও। রয়েছে লুঙ্গির খোঁজও। শহরের আরেক দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম যে গতবছরের তুলনায় এবছর বিক্রি খানিক কমেছে। তিনি জানালেন যে গত বছরও শপিং মলগুলোর রমরমা কম ছিল কিন্তু এবছর অধিক মলের গজিয়ে ওঠা এবং অনলাইন ওয়েবসাইটগুলির একচেটিয়া বিশেষ অফারের আকর্ষনীয় ছাড় অনেকটাই ব্যবসা টেনে নিতে পেরেছে। শুধুই কি জামা-কাপড়েই সীমিত ঈদের বাজার? তাই আমরা চষে বেড়ালাম শহরের আনাচে-কানাচে জানলাম না জানা অনেক তথ্য।
জামাকাপড়ের পরেই আরেকটা জিনিস বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে এখানকার ঈদের মার্কেটিংয়ে। লাইন লাগছে শহরের বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রীর দোকানের সামনেও। হরেক রকমের প্রসাধনী, মেকআপের সামগ্রী থেকে শুরু করে বিক্রি চলছে ইমিটেশনের গয়নারও। ভিড় নামছে মুদির বাজারে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য কিনতেও। লাচ্ছা সিমাই বিক্রিতে কালিয়াচক বিশেষ জায়গা বানিয়ে নিয়েছে। গোটা কালিয়াচক শহরের রাস্তার পাশে বসেছে অস্থায়ী পসরা সাজিয়ে দোকান। বিক্রি বেড়েছে ময়দা ও চিনিরও। প্রান্তিক বাঙালী প্রবণ জেলা হওয়াই বিগত দু’বছর আগেও এখানে বিরিয়ানি খাওয়ার তেমন চল ছিল না। এখন জেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বিরিয়ানির সঙ্গে ততটা পরিচিতি নয় তাই বিরিয়ানির জায়গায় এখনও পোলাও, পায়েসের চাহিদাই বেশি। বিরিয়ানির চাল সেই জায়গায় অনেকটাই পিছিয়ে বেচাকেনায়।
ঈদের সকালে এখানকার মুসলিম সমাজ ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ করে জেলার বিভিন্ন ঈদগাহ মাঠগুলোয়। ঈদ উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি জমায়েত হয় জেলার সুজাপুর ঈদগাহ ময়দানে। ভিড়ের রেকর্ডে এটিই জেলার প্রথম স্থান অধিকার করে। ঈদের দিন নতুন জামাকাপড়, টুপি পড়ে সুগন্ধি লাগিয়ে মানুষ জমায়েত হয় নির্দিষ্ট একটা জায়গায়। তাই ঈদের বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রিতে প্রতি বছরই থাকে নানা রকমের সুগন্ধি আতর, চোখে দেওয়ার সুরমা ও টুপির একটা বাজার। তাই কেনাকাটার শেষ লগ্নে তাই বাজারে ঘুরতে গিয়ে দেখলাম আতরের দোকানগুলোয় চোখে ধরার মত ভিড়। দোকানদার জানালেন ঈদের ২-৩ দিন আগে থেকে দোকানে জল পানেরও সময় মেলা ভার। তবে জিএসটির চক্করে লাভের পরিমাণ কিছুটা কমেছে আর পেট্রোল ডিজেলের দাম বাড়ায় ব্যাবসা চালাতে তারা হিমসিম খাচ্ছেন।
 রাত পেরোলেই দেশের বিভিন্ন অংশের সঙ্গেই  মালদাতেও খুশির ঈদ। ঈদ উপলক্ষ্যে জেলার শহর থেকে গ্রাম প্রত্যেকটা কোণায় রংবেরঙের কাগজ আর আলোর মালায় সেজে উঠেছে। মেলাগুলোতে অংশ নেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক। রাতের দিকে আসর বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। সৃষ্টি হয় এক মিলনমেলা। যেই মিলনের কথা বলে গেছেন রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর। এই দিনটায় তাই মানুষ বিভিন্ন কষ্ট ভুলে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠার স্বপ্নই দেখেন। সারাবছর ভিনরাজ্যে হাড় ভাঙা পরিশ্রমের পর এই একটা দিনই তো আসে তাদের জীবনে। একটু ভালো থাকা এবং পরিবার-পরিজনকে নিয়ে একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন থাকে দু’চোখ জুড়ে।

Promotion