কলমের শক্তি

নেই ভুবনের সরস্বতী

“দেকলি মা, রনু আবার সেলেটে ছাঁইপাঁশ লিকেচে”! ভীষন উত্তেজিত হয়ে সরিতার কাছে কথাখানি পাড়লো তার একমাত্র মেয়ে চামেলি। চিলাপাতার চা-বাগান বস্তিতে তখনো ভোরের আলো ঠিক করে ফোটেনি। বাসিঘরে পাটঝাঁট সামলে মেয়েকে নিয়ে সরিতা উঠে যাবে পাহাড়ের পাকদন্ডী পথ বেয়ে আরো ওপরে। ঘরে থাকবে মাতাল মরদ, ফ্যান গালিয়ে ভাতে ভাত ফুটিয়ে সস্তার চুল্লু খেয়ে বুঁদ হয়ে যাবে সে! সেই ভাত বিকেলের কাজ থেকে ফিরে সরিতারা খাবে। রনুকে তো এমনই শীতের এক ভোরে পেয়েছিল সরিতা।চাবাগানের কাজে যাবার ব্যস্ত পথে, ভোরের ম্লান আলোয় শুয়েছিল একরত্তি রনু। খিদেতে আর ঠান্ডায় কাঁদার শক্তিটুকুও ছিল না তার। সেই রনুকে নিজের একচিলতে ঘরে এনে মানুষ করেছিল সরিতা।সরিতা জানতো এই চা-বস্তিতে বহু মা-ই তার সন্তানকে মানুষ করার ভয়ে, তাদের অনিশ্চয়তার পথে ফেলে দিয়ে আসে।জাতকূলহীন রনু বড় হতে থাকলো বটে, কিন্তু সরিতা তাকে চাবাগান বস্তির ভাঙাচোরা ইস্কুলে পাঠালো না কিছুতেই। বস্তির আর পাঁচটা পুরুষের মতোই রনুর ভবিতব্যের আগাম ধারণা সরিতার মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে ছিল। নেহাত মায়ার জালে পড়ে আর খানিক জোয়ান মরদের অবর্তমানে মা মেয়ে দুটি প্রাণীর নিরাপত্তার জন্যই রণুকে ছাড়েনি সরিতা। সেই রুনু এখন ৮ বছরের বালক।

ভাঙা স্লেট জুড়ে অবিন্যস্ত হাতের লেখায় ‘অ,আ’ লিখেছে। বস্তির ছেলে,তাও আবার জাতকূলহীন;কুড়িয়ে পাওয়া ছেলের এমন বিদ্যাভিলাষকে সরিতা ভালভাবে নেয়নি। চোখা প্রশ্নে জিজ্ঞাসা করেছিল,এই ‘সেলেট’-পেন্সিল সে কোথায় পেলো। রনু জানিয়েছিল ফরেস্ট বাবুর বাংলোর পিছন থেকে। ফরেস্ট রেঞ্জারের বাড়ির সরস্বতী পুজোয় তীরকাঠি, কাদামাটির তাল নিয়ে এনে দিয়েছিল রণুই। সেখানেই সে দেখেছিল ফরেস্ট বাবুর ছোটছেলের হাতেখড়িতে পুরুতমশাই তাকে বর্ণমালা চিনিয়ে ‘অ আ ক খঃ লেখাচ্ছে। কোমর থেকে নেমে আসা, মলিন হয়ে যাওয়া প্যান্টটাকে সামলে নিয়ে বাবুর বাড়ির পিছন দিক দিয়ে দৌড় দিয়েছিল রনু। নতুনের আবিষ্কারের নেশায় কুড়িয়ে পাওয়া ভাঙা স্লেটে লিখে ফেলেছিল অ আ ক খ, যেমন বাবুর বাড়ি দেখলো হবহু সেইরকমই। সব গল্প বুঝি মিলনাত্মক হয় না। নাহ্,এ জন্মের মতো রনুর আর ‘বিদ্যাচর্চা’ করা হয়নি।সাহেববাবু অন্যত্র বদলি হয়েছেন, রনু শুনেছে তার ছেলে এখন দামী কনভেন্টে পড়ে। বস্তির ছেলেদের জুটিয়ে রনু এখন একটা ইস্কুল খুলেছে। জীবনে যা হওয়া হয়ে ওঠেনি ওর, তাই অন্যদের মধ্য দিয়ে হওয়াতে চায় রনু।

আজ রনুর ইস্কুলে সরস্বতী পুজো। বস্তির ছেলেমেয়েরা আজকে ওই স্কুলে অঞ্জলি দেবে। রনু তাদের সকলকে একটা করে স্লেট দিয়েছে। আরো বলেছে প্রত্যেকে যেন সেই স্লেটে প্রতিদিন একটা করে স্বপ্ন লেখে। যে স্বপ্ন আমরা সব্বাই দেখতে ভালবাসি। সরস্বতী মরুতে অন্তঃসলিলা হয়েছেন, কিন্তু অজ্ঞানতার মরুর অতলে হাজার হাজার ‘অশিক্ষিত’ রনুরা জ্ঞাণবিন্দু দিয়ে সিন্ধু রচনা করছে। ওই শোনা যাচ্ছে, রনুর ইস্কুল থেকে অঞ্জলীর মন্ত্রের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, কচি কচি গলা সমস্বরে বলছে,”জয় জয় দেবী, চরাচর সারে…”