জগতের বাহার

কালনার রাখাল রাজা উপাখ্যান

 

“গোঠের রাখাল বলে দে রে কোথায় বৃন্দাবন, যেথা রাখালরাজা গোপাল আমার খেলে অনুক্ষণ।” ভাবছেন তো এই নজরুলগীতির কথা কেন বললাম! আসলে রাখাল রাজাকে নিয়ে লিখতে বসেছি যে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই গানটা মনের মধ্যে চলে এলো। তবে এই রাখাল রাজা কে খোঁজার জন্য কিন্তু আপনাদের বৃন্দাবন যেতে হবে না। পশ্চিমবঙ্গের কালনা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে বৈদ্যপুরের কাছে গোপালদাসপুর গ্রামে রয়েছে এই রাখাল রাজার মন্দির। লাল ইটের তৈরি এই মন্দিরটি বহু প্রাচীন। এখানে রাখাল রাজার একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এই মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণ  ব্যাচেলর। উনি সখী পরিবৃত হয়ে থাকতে মোটেও ভালোবাসেন না। তাই এখানে রাখাল রাজার মূর্তির পাশে রাধা বা অন্য কোন সখীর মূর্তি নেই।

 

বৈদ্যপুর শহরটি বহু প্রাচীন শহর। প্রথম মনসামঙ্গলে এই শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়।  বৈদ্যপুর থেকে দু মাইল দূরে গোপালদাসপুর গ্রাম। গ্রামে আসার পথে পড়বে বেহুলা নদী ও এক প্রকান্ড অশ্বত্থ গাছ। মেঠো রাস্তা ধরে এগোলে চারিদিকে গাছ গাছালির মধ্যে শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে রাখাল রাজার মন্দির। চারিদিকে গাছ-গাছালি ও সবুজ মাঠ সত্যিই রাখাল রাজার খেলার প্রকৃষ্ট জায়গা। মন্দিরে ঢোকার মুখেই পড়বে বিশাল লাল পিলার দিয়ে বানানো নাটমন্দির। এই নাটমন্দির প্রাঙ্গণে কৃষ্ণের ছোটবেলার নানান ঘটনা, যেমন পুতনা বধ,কালিয়া দমন ইত্যাদি ছবি সহকারে বর্ণিত আছে। গর্ভগৃহে তিনটি মূর্তি বিরাজমান। মাঝখানে রয়েছেন স্বয়ং রাখাল রাজা। আকাশ নীল গায়ের রং। একহাতে তিনি নাড়ু ধরে আছেন। অপূর্ব সুন্দর দুষ্টু মিষ্টি বালকের মতোই হাসি হাসি মুখ। দেখেই মন ভরে যাবে। দু’পাশে অপেক্ষাকৃত ছোট দুটি বিগ্রহ, একটি রঘুনাথের ও অপরটি গোপীনাথের। রঘুনাথের মূর্তিটি সবুজ রঙের।
গোপীনাথের নীল বর্ণ। পুরোহিতের সাথে কথা বলে রাখাল রাজার আবির্ভাবের প্রায় ৫০০ বছর আগের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা জানা গেল। যদিও সবটাই জনশ্রুতি। গোপালদাসপুর গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারই গোস্বামীদের পরিবার। এই গোস্বামীদেরই এক আদি পুরুষ ছিলেন রামকানাই গোস্বামী। তিনি বর্ধমান জেলার খাতুন্দী গ্রামে বাস করতেন। উনি ছিলেন গোপীনাথের পরম ভক্ত।

 

একবার বর্গী আক্রমণের ভয়ে রামকানাই গোস্বামী তার পরিবার ও গোপীনাথকে নিয়ে বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। পথে জঙ্গল পড়লো। গোপীনাথ কে তো ভোগ দিতে হবে! তাই রামকানাই গোস্বামী ও তার স্ত্রী জঙ্গলেই ভোগ রান্নার ব্যবস্থা করলেন। ওই সময় এক রাজা জঙ্গলে মৃগয়া করতে এসেছিলেন।( রাজার নামটা পুরোহিত মশাই বলতে পারলেন না) সারাদিন শিকার করে রাজা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ রীতিমত ক্লান্ত ও ক্ষুধার্থ। হঠাৎ রাজা দেখতে পেলেন দূরে জঙ্গলে ধোঁয়া উঠছে। কৌতুহলী হয়ে রাজা ও তার লোকজন ওই জায়গায় গিয়ে পৌঁছালেন। দেখলেন এক সাধক ও তার স্ত্রী ছোট হাঁড়ি করে ভোগ রান্না করছেন তাদের আরাধ্য দেবতা গোপীনাথের জন্য। রাজাকে দেখে রামকানাই গোস্বামী সসম্মানে অভ্যর্থনা করে প্রসাদ খেয়ে যেতে বললেন। রাজা বললেন যে ওইটুকু হাঁড়িতে ভোগ এতজন লোকের কি করে হবে। রামকানাই গোস্বামী রাজাকে আশ্বস্ত করলেন যে গোপীনাথের দয়ায় কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না। অগত্যা রাজা এবং তার দলবল খেতে বসলেন। দেখা গেল ওইটুকু হাঁড়ির ভোগ শেষ হচ্ছেনা কিছুতেই।সকলের পেট ভরলো। গোপীনাথের মাহাত্ম্য রাজা বুঝতে পারলেন। রামকানাই গোস্বামীকে রাজা খুশি হয়ে কিছু জমি জমা দিলেন দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে।এ ই ঘটনার পরদিন রামকানাই গোস্বামী বৃন্দাবন যাবেন বলে মনস্থ করেছেন। রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখলেন স্বয়ং রাখাল রাজার রাখাল বালকের রূপ। স্বপ্নাদেশ এলো, “আমাকে দর্শন করার জন্য বৃন্দাবন যাবার দরকার নেই। আমি দারু কাঠ হয়ে জঙ্গলের মধ্যে পুষ্করিণীতে ভেসে আসছি। তুই পুষ্করিণীর ধার থেকে ওই কাঠ নিয়ে বাঘনাপাড়ায় যা। সেখানে পাঁচ বছরের এক বালক খেলা করছে। তাকে দিয়ে আমার রাখাল রাজা রূপ মূর্তি বানিয়ে এই গোপালদাসপুর গ্রামে জঙ্গলের মাঝে স্থাপন কর।”

 

ঘুম ভেঙে গেল রামকানাইয়ের। জঙ্গলের মাঝে পুষ্করিণীতে গিয়ে দেখেন সত্যিই একটা দারুকাঠ ভেসে আসছে। উনি দারু কাঠ নিয়ে বাঘনাপাড়ায় গিয়ে দেখলেন এক পাঁচ বছরের বালক খেলা করছে। যথারীতি দারু কাঠ দিয়ে রাখাল রাজার মূর্তি তৈরি করে জঙ্গলের মাঝে তাকে স্থাপন করা হলো। রাখাল রাজার সেই দারু কাঠের তৈরি মূর্তিই আজও পুজিত হয়ে আসছে। প্রত্যেকদিন তিন মূর্তির পুজো এবং ভোগ হয়। মাঘী পূর্ণিমার দিন যে পাঁচ বছরের বালক রাখাল রাজার মূর্তি বানিয়েছিল, তার বংশধরেরা রাখাল রাজাকে ভাড়ার ঘরে নিয়ে গিয়ে দ্বার রুদ্ধ করে তিনদিন ধরে অঙ্গরাগ করেন। তিনদিন পর রাখাল রাজাকে আবার মন্দিরে নিয়ে এসে পুজোর ভোগ নিবেদন করা হয়।

 

এই গ্রামে আমার কাকিমাও থাকেন। উনিও গোস্বামী পরিবারেরই একজন। কাকিমার থেকে জানলাম যে রাখাল রাজাকে কখন কী ভোগ দেওয়া হয়। রোজ সকাল থেকে ভোগ দেওয়া শুরু হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মেজেই রাখাল রাজা, রঘুনাথ ও গোপীনাথের চাই মাখন, মিছরি, ক্ষীর ও নারকেলের নাড়ু। এরপর সকাল সাড়ে ন’টায় ফলমুল ও মিষ্টি দেওয়া হয়। যদি শীতের দিন হয় তাহলে মধ্যাহ্নভোজনের আগে একবার সকাল ১১ টায় খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়। এই ভোগটিকে বাল্যভোগ বলে। দুপুর ১২ টায় এই ত্রয়ী মধ্যাহ্নভোজন সারেন। মধ্যাহ্নভোজনে থাকে পাঁচ রকমের ভাজা সহ দু’রকমের ডাল, তিন-চার রকমের তরকারি, শুক্ত, চচ্চড়ি, পোলাও, চাটনি, পায়েস, ক্ষীর দই ও মিষ্টি। বিকেলে আবার রাখাল রাজা গোপীনাথ ও রঘুনাথের একটু খিদে খিদে পায়। তখন ছানা ফলমূল মুগ বা ছোলা ভিজে ও তিনটে ডাব দিয়ে বিকেলের ভোগ দেওয়া হয়। রাত্রে তিনজনকেই লুচি, ফল, মিষ্টি ভোগ দেওয়া হয়।মধ্যাহ্নভোজনের সময় দুই রকমের চালের ভোগ থাকে। পাঁচ কিলো সেদ্ধ চালের ভোগ হয় রঘুনাথের জন্য। সঙ্গে তরিতরকারি, পায়েস-মিষ্টি থাকে। রঘুনাথ রান্নাশালে এসে খেয়ে যান। শালগ্রাম শিলা নিয়ে যাওয়া হয় রান্নাঘরে। আর রাখাল রাজা ও গোপিনাথের জন্য গোবিন্দভোগ চালের পোলাও বানিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। বহু দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর মানুষ জন প্রতিদিন এসে খেয়ে যান। ভোগের জন্য আগের থেকে কুপন কাটতে হয়। এছাড়া বড় উৎসব যেমন রামনবমী ও জন্মাষ্টমীতে হাজারের ওপর মানুষ আসেন।

রাখালরাজা মন্দিরের পাশে একটি ছোট মন্দির রয়েছে যেটিকে বলা হয় দোলমন্দির। রামনবমীর আগের দিন ন্যাড়া পোড়ানো হয়। রাম নবমীর দিন দোলমন্দিরে একটা দোলনা বা ঝুলা টাঙানো হয়। রামনবমীর সময় রাখালরাজা, গোপীনাথ ও রঘুনাথ ওই দোলনায় দোল খান। ওই সময় সবাই আবির দিয়ে রাখাল রাজা,গোপীনাথ, রঘুনাথকে ভক্তি নিবেদন করেন। পুরোহিত ভক্তবৃন্দের উদ্দেশ্যে আবির ছড়িয়ে দেন। পাশে আরেকটি মন্দির রয়েছে যেটি সাধক রামকানাই গোস্বামীর সমাধি মন্দির। জন্মাষ্টমীর দিন মন্দির আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। পরদিন নন্দ উৎসব পালিত হয়। অর্থাৎ বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে কারাগার থেকে নন্দের বাড়িতে জন্মাষ্টমীর দিন নিয়ে এসেছিলেন। রাখাল রাজা মন্দির জন্মাষ্টমীর পরের দিন নাচ-গানের মধ্য দিয়ে নানা রকম খেলার মধ্যে দিয়ে এই উৎসব পালিত হয়।একটা নারকেল তেল সিঁদুর দিয়ে বালকদের মাঝে ছেড়ে দেওয়া হয়। বালকদের মধ্যে কাড়াকাড়ি হয় কে ওই নারকেলটি নিতে পারবে। মন্দিরগুলির স্থাপত্য ও ভাস্কর্য দেখে মোহিত হতে হয়। অপূর্ব সুন্দর টেরাকোটার কাজ করা লাল পাথরের মন্দিরগুলি ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

 

মন্দিরের চারপাশের গাছগাছালি ভরা পরিবেশ অতি মনোরম। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে বটগাছের নিচে কিছুক্ষণ সমাধিস্থ হয়ে বসে থাকলে এক অপূর্ব অনুভূতি হয়। মন আকুল করে রাখাল রাজাকে ডাকলে কেউ কেউ হয়তো রাখাল রাজার বাঁশির মূর্ছনাও শুনতে পাবেন। অবশ্যই একবার গোপালদাসপুর এসে ঘুরে যান আর ঐতিহ্যশালী মন্দির ও রাখাল রাজার দারু কাঠের অপূর্ব বিগ্রহটি দর্শন করে যান। আমি নিশ্চিত, এক অনন্য অনুভূতি ও প্রশান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরবেন।

প্রয়োজনীয় তথ্য – হাওড়া  থেকে কাটোয়াগামী যে কোনো ট্রেন ধরে নামতে হবে কালনা স্টেশনে। কালনা থেকে যেসব বাস বৈঁচি যাচ্ছে সেই বাসে উঠে নামতে হবে বৈদ্যপুর বাজার। একটু হেঁটে টলার মোড়ে এসে গোপালদাসপুর যাওয়ার অটো ধরতে হবে। গোপালদাসপুরে যে কেউ দেখিয়ে দেবে রাখালরাজার মন্দির। কেউ যদি থাকতে চান তাহলে বৈদ্যপুরে হোটেল বা লজে থাকতে পারেন। আবার বৈদ্যপুর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে কালনা শহরে থাকার জন্য অনেক হোটেল পেয়ে যাবেন।