জগতের বাহার

কোটা…মরুদেশের কাছাকাছি – দ্বিতীয় পর্ব

মহারাজা উমেদ সিং সম্পর্কে কিছু বলার আগে চলুন একটু পিছন ফিরে তাকাই। কোটা রাজবংশের উত্থানের ইতিহাসটা ছোট্ট করে একটু জেনে নেওয়া যাক ।
ইতিহাস বলে যে কোটায় আগে ভীল উপজাতি ও সর্দারদের রাজত্ব ছিল। ১২৬৪ খ্রিস্টাব্দে বুন্দির রাজকুমার জৈত সিং ভীল সর্দারদের পরাজিত করে কোটা অধিকার করে। কথিত আছে যে জৈত সিং পরাজিত ভীল সর্দারদের মুণ্ডছেদ করে নরবলি দিয়েছিলেন। সেই থেকেই হয়তো এই স্থানের নাম দেয়া হয় ‘কোটাহ’ বা কোতল! আবার কোটা শব্দের আর একটি অর্থ সুরক্ষিত দুর্গ বা কোর্ট।

এরপর ১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে রাও রতন সিং বুন্দির দ্বিতীয় পুত্র রাও মাধো সিং কোটার সিংহাসনে বসেন। এর সাত বছর পর মুঘল সম্রাট শাহজাহান একটি ফরমান জারি করে কোটাকে স্বাধীন রাজ্যের স্বীকৃতি দেন। এরপর রাও মাধো সিং এর উত্তরাধিকারী’রা কোটা’র মসনদে বসেন ও রাজত্ব করেন। এঁরা সকলেই মুঘল সম্রাট ও পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসক, উভয়ের সাথেই বন্ধুতপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। ১৯৪৮ সালে ভারত স্বাধীন হবার পর কোটা’কে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


এবার ফিরে আসি মহারাজা উমেদ সিংয়ের কথায়। মহারাজা স্যার দ্বিতীয় উমেদ সিং (১৮৭৩-১৯৪০) কোটার মসনদে বসেন ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজা হিসেবে তিনিই রাজত্ব করেন কোটায়। উমেদ সিং ছিলেন কোটার রাজা কিশোর সিংয়ের প্রপৌত্র। তিনি ছিলেন বহু গুণের অধিকারী। একাধারে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত, যুদ্ধ বিদ্যাতে সুনিপুণ, শিকারে পারদর্শী এবং সেইসঙ্গে তুখোড় রাজনীতিবিদ। নিজের জীবন তিনি শুরু করেছিলেন একজন সেনানায়ক হিসেবে। কিন্তু তীক্ষ্ম বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন এই উমেদ সিং। হয়তো সেই কারনেই ব্রিটিশদেরও নানা ব্যাপারে মূল্যবান পরামর্শও দিতেন তিনি । প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়ে মহারাজা উমেদ সিং তাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনী পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারকে। ২০১১ সালে ব্রিটিশ পার্লমেন্টে তাঁর স্মরণে গান স্যালুট দেওয়া হয়, তাঁর বাঘ শিকারের বিষয়টি নিয়ে একটি প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয় সেখানে। উমেদ সিং তার বীরত্ব, সাহসিকতা ও ব্রিটিশদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার দরুন অনেক উপাধি আর প্রচুর খেতাব পান। মিউজিয়ামে মহারাজা উমেদ সিংয়ের মূর্তির নিচে ওনার প্রশস্তি স্বরূপ লেখা আছে — “His Highness Maharajadhiraj Maharaja Mahimahendra Maharao Raja Shri Sir Umed Sing ll Sahib Bahadur Maharao Raja of Kotah”.

এবার মিউজিয়ামের ভেতরে ঢুকে চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে মনে হল যে মহারাজা উমেদ সিং শুধুমাত্র রণনিপুণ সেনানায়ক ও তুখোড় রাজনীতিবিদই ছিলেন না । উনি ছিলেন যথেষ্ট শৌখিন ও রুচিসম্পন্ন একজন মানুষও। কাঁচ দিয়ে ঢাকা উমেদ সিং এর মূর্তির পিছনে রয়েছে হাতির দাঁতের তৈরি সুসজ্জিত পালকি, মাথায় ছাতা দেওয়া সুন্দর কারুকার্য করা রাজকীয় রথ, সুসজ্জিত রাজার ঘোড়া। একপাশে রাজার হাতির বিশাল মূর্তি, যার পিঠের উপর জমকালো লালের উপর সোনালী কাপড়ে তৈরি হাওদা; প্রতিটা জিনিসই যেন অত্যন্ত জীবন্ত। মনে হচ্ছে ২০০ বছর আগের কোনও রাজমহলের কক্ষে আমি ঢুকে পড়েছি। চতুর্দিকে রাজাদের শৌখিনতার ও রুচিশীলতার নিদর্শনগুলি যেন তারই সাক্ষী বহন করছে। হাতির দাঁতের তৈরি বাক্স, শ্বেত পাথরের কারুকার্যময় বিভিন্ন রকমের ফোয়ারা, বিভিন্ন ধরনের পিচকারি, সোনা, রুপো, কাসা, পিতলের নানারকম দুর্মূল্য সামগ্রী, রুপোর কারুকার্য খচিত হুকো কাঁচের সেল্ফে শোভা পাচ্ছে। সব কিছুই কেমন যেন স্বপ্নময়! রাজকীয় পোশাক, জুতো, সোনা রূপার নারকেল সযত্নে রাখা রয়েছে বিভিন্ন কাঁচের আলমারিতে। এই সোনা রূপার নারকেলে প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়। রাজ পরিবারে বিয়ের দিনক্ষণ পাকা হয়ে গেলে অন্যান্য দান সামগ্রীর সাথে এই সোনা রূপার নারকেল অবশ্যই পাঠানো হত বর বা কনের বাড়িতে। এটাই নাকি ছিল এই রাজ পরিবারের রীতি। একটা কাঠের তৈরি সিংহাসন দেখলাম যার নির্মাণশৈলী সত্যিই অপূর্ব। সিংহাসনের হাতলগুলোতে ও পায়াতে খোদাই করা হয়েছে সিংহের প্রতিকৃতি, দুপাশে সাপ, ওপরে বাজপাখি, সিংহাসনের মাথায় শিব গণেশের মূর্তি। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হল, রাজা এই সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে বোঝাতে চাইছেন যে বনের হিংস্র প্রাণীরাও রাজার বশে। এক জায়গায় রয়েছে প্রাচীনকালের বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন রকম খেলার সরঞ্জাম, যেমন চৌসার (দেখতে অনেকটাই লুডোর মতো) শতরঞ্জ বা দাবা, পাশা ইত্যাদি। একটু এগোতেই চোখে পড়ল বিশাল বিশাল বেশ কয়েকটা সিন্দুক! সত্যি এতবড় সিন্দুক এর আগে আমি কখনো দেখিনি! কী জানি কী রাখা হতো এই সব বিশাল সিন্দুকের মধ্যে!

 


এবার আরেকটি অভিনব জিনিসের দিকে আমার চোখ আটকে গেল। সেটি হল ভাসমান সিংহাসন। এটি হল এমন একটা সিংহাসন যার চার পায়ে চারটে বড়ো লোহার ফাঁপা বলের মত লাগানো যা জলের মধ্যে ভেসে থাকতে পারে। গাইড এর কথায় বুঝলাম রাজা মাঝেমধ্যে জলে ভাসমান সিংহাসনে বসে থাকতেন বিলাসিতার জন্য। দু- প্রান্তে দড়ি ধরে দুজন রাজকর্মচারী রাজাকে দোলাতেন। সত্যিই বিজ্ঞানসম্মত ভাবে বিনোদেনের কী অভিনব উপায়! অবাক হতেই হয়। কোটার রাজাদের বিভিন্ন রকমের মোহর, মুদ্রাগুলিও সংরক্ষিত রয়েছে অতি সযত্নে। রাজবংশের কুলদেবতা শ্রীনাথে’র বিশাল রূপোর সিংহাসনটিও দেখার মতো।


গঞ্জফা বা সিলমোহরের বিশাল সংগ্রহটিও সত্যিই ভীষণই আকর্ষণীয়। আর একটা তাকে চোখ পড়তে চমৎকৃত হলাম, বুঝলাম যে কোটার রাজারা সঙ্গীত অনুরাগীও ছিলেন যথেষ্টই। সেতার, তবলা, এসরাজ, সারেঙ্গি, খোল, করতাল, বাঁশি, হারমোনিয়াম কী যে নেই! প্রতিটা বাদ্যযন্ত্রই এখনও স্বমহিমায় বিরাজ করছে।

মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এবার গেলাম চারশো বছরের পুরনো ঐতিহ্যশালী আর্ট গ্যালারিতে বা চিত্রশালার দিকে। ভেতরে ঢুকেই আমার চোখের পলক পড়লো
না। মুখ থেকে আনমনেই বেরিয়ে এলো “বাঃ”! বিশাল কক্ষের উঁচু ছাদ ও দেওয়াল জুড়ে অপূর্ব সুন্দর ফ্রেস্কো পেন্টিং। ফ্রেস্কো পেন্টিং হল দেয়াল ও ছাদ জুড়ে স্থায়ীভাবে চিত্রাঙ্কনের বহু পুরাতন একটি পদ্ধতি। দেয়াল ভিজে ভিজে থাকা অবস্থায় জলরঙে চিত্রাঙ্কন করা হত। প্লাস্টার শুকিয়ে গেলে চিত্রটি স্থায়ীভাবে দেওয়ালের শোভা বাড়াতো। রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময় ইটালিতে ফ্রেস্কো পেন্টিংয়ের সূচনা হয়। গোটা দেয়াল ও ছাদ জুড়ে নানান বিষয় যেমন রামায়ণ, মহাভারত, নানান দেবদেবী, পৌরাণিক কাহিনী, রাজকীয় নানা ঘটনা, অন্দরমহলের সখী পরিবৃত রাণীদের জীবন যাত্রা, নানান উৎসব অনুষ্ঠান বা যুদ্ধের দৃশ্য বিভিন্ন রঙ এর সমাহারে অপূর্ব সুন্দর করে চিত্রিত আছে কক্ষের দেওয়ালে ও ছাদে, এমনকি কুলুঙ্গিতেও! তন্ময় হয়ে দেখছিলাম.. হঠাৎ বিদেশি একসেন্টে শুনলাম,”ওয়াও, লাভলি”। শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখি এক সোনালী চুলের নীলনয়না সুন্দরী বিদেশিনী মুগ্ধ হয়ে চিত্রকলা দেখছে আর ফটো তুলছে আর নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে।

ফটো গ্যালারি থেকে বেরিয়ে গেলাম রাজার শয়ন কক্ষের দিকে। বিশাল বড়ো ঘরটির চারদিকেই ফ্রেস্কো পেন্টিং। মধ্যিখানে রাজশয্যা, রুপোর পালঙ্কের ওপর মখমলের বিছানা!  এ যেন রূপকথার রাজ্যের রাজার সুসজ্জিত কক্ষ চাক্ষুষ করছি আমি। ফ্রেস্কো চিত্রাঙ্কন শোভিত একদিকের দেয়ালে প্রমাণ সাইজের বিশাল আয়না! আয়নার ওপাশে নিজের প্রতিবিম্বকে কি ছোট্ট লাগছে! চতুর্দিকে রুচিশীল চাকচিক্য, জৌলুস আমাকে মুগ্ধ করছে। একের পর এক বিস্ময়ের রেশ কাটিয়ে এবার এলাম দোতলায় “বাড়হ দড়ি”। এটি ছিল রাজার আলোচনা সভা বা মিটিং হল, যেমন আগ্রাতে আছে দেওয়ান-ই-খাস। চম্বলের তীরে অবস্থিত বাদল মহলের এই “বাড়হ দড়ি” লাল রঙের থাম যুক্ত বেশ বড় জায়গা। মাঝে মাঝে সাদা মার্বেলের কারুকার্য খচিত পিলার। রাজা রাও মাধো সিং ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেছিলেন। বেশ কয়েকটা রেলিং ঘেরা ব্যালকনি আছে। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে আপন খেয়ালে বয়ে চলা চম্বল নদী ও কোটা শহরকে বেশ সুন্দর ভাবে দেখা যায়।


বাড়হ দড়ি থেকে বেরিয়ে এবার মহল এর ছাদে এলাম। দেখলাম সেই নীল নয়না স্থানীয় একটা মেয়েকে বলছে ফটো তুলে দিতে। ধবধবে সাদা গায়ের রঙ। স্লিম ফিগার, চোখে নীল রঙের একটা সানগ্লাস।খুব ইচ্ছে হলো এই বিদেশিনীর সাথে একটা ফটো তুলতে। কাছে গিয়ে বললাম “এক্সকিউজ মি ম্যাম”। ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, “ইয়েস”। আমি বললাম “ক্যান আই টেক অ্যা স্ন্যাপ উইথ ইউ “? নীলনয়নার চোখে মুখে তখন খুশির ঝলক! হেসে বলল “ইয়েস প্লিজ” আমার কাঁধে হাত রেখে হাসি হাসি মুখে পোজ দিল। এক ফ্রেমে বন্দি হলাম সাগরপাড়ের এপার ওপারের দুই কন্যা। চলে যাবার আগে নাম জিজ্ঞেস করলাম। বললেন মার্গারিটা। মিউজিয়ামে ঘোরার সময় আরো একজন বিদেশী দম্পতি আমাকে ডেকে গাইডকে বললো ফটো তুলে দিতে। এই বিদেশিনী’র নাম বলেছিল জুলিয়েট। হাত মেলালাম, পূর্ব পশ্চিমের অদ্ভুত একটা মেলবন্ধন হয়ে গেল ওই ছোট্ট অবসরে।
এবার গেলাম রাজার অস্ত্রাগারে। নানা রকমের যুদ্ধাস্ত্র সামগ্রী দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ! কত রকমের বন্দুক,তলোয়ার, গুপ্ত লাঠি, চাকু, চপার, ঢাল তলোয়ার, তীর ধনুক, কামান আরো কত কি! একটা নতুন জিনিষ দেখলাম ব্যাটল মিরর। এই আয়নার সাহায্যে সূর্যের আলো রিফ্লেক্ট করে শত্রুর চোখে চড়া আলো ফেলে তাকে বিভ্রান্ত করা হত । এছাড়া রয়েছে বাঘ ছাল, কুমির এর চামড়া, হরিণের মাথা, বাইসনের মাথা ইত্যাদি।


এরপর বাদল মহল থেকে বেরিয়ে গেলাম ;অভেদা মহল’ এর দিকে। চম্বল নদীর তীরে অবস্থিত এই মহলের সাথে রয়েছে উদ্যান, নৌকা বিহারের ব্যবস্থা, সঙ্গে ছোট্ট রেস্তরাঁ। রাজ পরিবারের সদস্যরা মাঝে মাঝে এখানে বিশ্রাম এর জন্য এসে কদিন কাটিয়ে যেতেন। এতক্ষণ ঘুরেছি, পেটে দানাপানি পড়েনি! প্রচণ্ড ক্ষিদে পাচ্ছে। পাশের ক্যান্টিনে গিয়ে একটা হাক্কা নুডুলস ও লেবু জল জিরা পানীয় অর্ডার করলাম। কিন্তু এত ঝাল দিয়েছে যে খেতে খেতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এলো। রাজস্থানীরা খুব ঝাল পছন্দ করে জানতাম! কিন্তু তাই বলে এতটা! যা হোক কোনোরকমে গলাধঃকরণ করলাম ! সবুজ ঘাসের উপর সাদা ধবধবে খরগোশ গুলো নির্ভয়ে খেলা করছে, কী সুন্দর দৃশ্য।

অভেদা মহলের  নির্মাণশৈলীটি সত্যিই প্রশংসনীয়। খুঁটিনাটি অনেক কিছুই দেখলাম।অভেদা মহল থেকে বেরিয়ে আবার অটোতে চড়ে বসলাম। এবার কোটা ব্যারেজ ও সেভেন ওয়ান্ডার দেখতে যাব। আজকের আমার সারাদিনে দেখাটুকু সেরে ফেলতেই হবে। অটোতে যেতে যেতেই মনটা আমার গুনগুনিয়ে উঠল “আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ”।

 

Promotion