Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
সমপ্রেমী মায়ার চোখে স্বাধীনতা - Exclusive Adhirath
প্রত্যাশার পারদ

সমপ্রেমী মায়ার চোখে স্বাধীনতা

“এই দেখ দেখ, ওটা কি যাচ্ছে ভাই? কি ওটা?” রাস্তায় ঘাটে বা পাড়ার মোড়ে এই ধরনের টিটকিরি তো হামেশাই শোনা যায়। আর এই টিটকিরি ঠিক কাদের লক্ষ্য করে বলুন তো? আমাদের এই অত্যাধুনিক মানবসভ্যতার বাগানে চেনা ফুলেদের সমান্তরালে এমন কিছু অন্য ফুল ফোটে যাদের ফুল বলেই গণ্য করা হয়না। হ্যাঁ, এতক্ষণে আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরে গেছেন যে কাদের কথা বলছি?

যদিও এই বিষয়গুলি সমাজের বুকে কোনও নতুন বা ব্যাতিক্রমী নয় একেবারেই। পৌরাণিক প্রসঙ্গে অর্ধনারীশ্বর বা শিখণ্ডী এবং অজন্তার গুহাচিত্রে এই সমান্তরাল চেতনার নিদর্শন মেলে। সাহিত্যের দলিলেও রয়েছে এর অস্তিত্ব; তা সে শেক্সপেরীয়ান সনেটই হোক বা হোক সিমোন দ্য ব্যুভরের “দ্য সেকেন্ড সেক্স”। এই ব্যাতিক্রমী পথের পথিক ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন বা মার্টিনা নাভ্রাতিলোভার মতো নক্ষত্র। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে দেখা হল মায়া দাস, যিনি এক ট্রান্স-ওম্যান। তার কথায় উঠে এলো দল-মত নির্বিশেষে সভ্যতার মুখোশ পড়া তথাকথিত ভদ্র সমাজের তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরনের কিছু চিত্র।

স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য আপনার কাছে কতোটা?

১৫ আগস্টের আলাদা করে কোনও তাৎপর্য নেই আমার কাছে, আর কোনও মূল্যও নেই। আমার জীবনের স্বাধীনতা দিবসটি তো এখনও আমার কাছে অধরা। স্বাধীনতা দিবস সেই দিনই পালন করবো, যেই দিন আমার মতো মানুষকে প্রতিটা ঘরে ঘরে মেনে নেওয়া হবে। একটা ছোট্ট পৃথিবী এই বড় পৃথিবীটির মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট পৃথিবীটাকে নিয়ে সবাই ফুটবলের মতো খেলা করে। ব্রিটিশরা আমাদের দেশ যেদিন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, সেইদিন হয়তো আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। তবে তারা যে আইনের ৩৭৭ ধারা ধরে রেখেছিলেন, সেই আইনের ৩৭৭ ধারা এখনও বজায় রয়েছে। তাহলে কোথায় আমরা স্বাধীন?

একজন সমপ্রেমী মানুষ হিসেবে নিশ্চয়ই অনেক কটূক্তি, অত্যাচার আপনাকে সহ্য করতে হয়। সেটা কি আপনার কাছে পরাধীনতারই নামান্তর?

অবশ্যই পরাধীনতার নামান্তর। নিজের পরিবার থেকেই সেই পরাধীনতার স্বাদ পাই। ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় নিজের সঙ্গে লড়াই। কীভাবে আমি নিজেকে বাইরে বেরিয়ে রিপ্রেসেন্ট করবো? কারণ প্রতি পদে আমাকে সমাজের কাছে নিজেকে নারী প্রমাণ করতে হয়। চৌকাঠ পেরিয়ে যখন বেরোলাম নিজের ঘর থেকে, তখনই মা-বাবার কটাক্ষ। পাড়ার রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে পাড়া-প্রতিবেশীর বাঁকা দৃষ্টি, ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি সবই সহ্য করতে হয়। স্কুল-জীবনেও স্যারের নেতিবাচক দৃষ্টি, সহপাঠীদের পিছনে লাগা এসব পেরিয়ে এসেছি। বাড়ি থেকে যখন বেরোলাম তখন মা বললো হিজড়ে। রাস্তার শুনলাম ছক্কা, লেডিজ, মওগা এইসব টোন-টিটকিরি শুনি। কাজেই মনে হয় এখনও পরাধীনতার রাষ্ট্রেই বাস করছি।

অনেকেই সমপ্রেমীদের ‘সমকামী’ বলেই সম্বোধন করেন। কোন টার্মটি ঠিক? সমকামী নাকি সমপ্রেমী?

‘কাম’ সর্বস্ব আমাদের জীবন নয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হয়তো বড়জোর ৩০ মিনিট একটা মানুষের মধ্যে যৌনতা থাকতে পারে অথবা সে তার যৌন জীবন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে পারে। ইরোটিকা প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই রয়েছে। আমরাও তার ব্যাতিক্রম নই। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর আমরা দাঁতটাই মাজি, আর ঘুমোনোর আগে ঠাকুরকেই স্মরণ করি। কাজেই গভীর রাতের ওই ৩০ মিনিটের ভাবনাকে ধরে নিয়ে যদি সারা জীবনের একটা তকমা লেগে যায় ‘সমকামী’, এর থেকে খারাপ কিছু হয় না। সমপ্রেমী আমরা, আসলে প্রেমটাই পুরোটা জুড়ে থাকে।

আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমরা কি সত্যিই স্বাধীন নাকি পরাধীন?

প্রত্যেকেই পরাধীন, তবে তার মধ্যে আমরা আরও বেশি করেই পরাধীন। কারণ ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের জন্য তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের বর্তমানে কেস করতে হয়। কোনও হাসপাতালে ভর্তি হলে মেল বা ফিমেল ওয়ার্ড রয়েছে, কিন্তু আদার্সদের কোনও ব্যাবস্থা নেই। আদার্স হলে বলা হয় তুমি পুরুষ আদার্স না স্ত্রী আদার্স? এইসব বোকা বোকা কনসেপ্ট চলে সেখানে। খাদ্য, অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা এগুলোর জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। হাসপাতালে গেলে আমরা মানুষ হিসেবেই চিকিৎসাটা পাই না। আমাদের আগে বলা হয় “উলঙ্গ হয়ে দেখাও তুমি ছেলে না মেয়ে, তারপর চিকিৎসা পাবে”।

সমপ্রেমকে অনেকেই অসুস্থতা বলে মনে করেন। তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কী বার্তা?

প্রতিটা মানুষই আমার দৃষ্টিতে সমপ্রেমী। কারণ একটি বাড়িতে একটি পুত্রসন্তান তার বাবা, জ্যাঠা, কাকাকে ভালবাসে। আবার একটি মেয়েও তার মা, জেঠি, কাকিমাকে ভালবাসে। কামনা আর ভালোবাসার মধ্যে একটা পার্থক্য আছে সেটা আগে বুঝতে হবে।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী এবং রূপান্তরিত মানুষেরা কীভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন?

নারী তার আন্দোলন সম্পর্কে সচেতন নয়। নারী নিজেকে অবলা বলে মনে করে। ছোটবেলা থেকেই একটি কন্যাসন্তানকে খেলনাবাটি, পুতুল এসব দিয়ে খেলতে দেওয়া হয়। উল্টোদিকে একটি পুত্রসন্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয় ব্যাট অথবা খেলনা বন্দুক। এভাবে পরিবার থেকে নারীকে ছোট করার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। এরপর একটা সময়ে গিয়ে নারী তার অস্তিত্বটাই ভুলে যায়। তারপর সেই নারী যখন পরবর্তীকালে যখন শ্বাশুড়ি হন তখন আসলে তিনি শ্বশুরের ভূমিকাই পালন করেন। তার চরিত্রে এবং কথাবার্তায় পিতৃতান্ত্রিক প্রতিনিধির ছবিটাই ফুটে ওঠে। শ্বাশুড়ি-ননদে মিলে বৌ-কে পুড়িয়ে মারছে এরকম ঘটনা তো হামেশাই ঘটে। ফেমিনিজম আন্দোলনটা আমরা দেখিয়েছি। এখনকার ট্রান্স-ওম্যানরা নিজেদের মেয়ে বলতে পছন্দ করেন না, টাই নিজেদের তারা ট্রান্স-ওম্যানই বলেন। যখন রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে যাই তখন একটি মেয়েই কিন্তু তার প্রেমিককে কনুইয়ের গুঁতো মেরে বলে “ওই দেখো, মওগা যাচ্ছে, ওটা ছেলে জানো তো, মেয়ে সেজেছে”। তখন খুব কষ্ট হয়।

রূপান্তরিত মানুষের বৈষম্যটা তাদের প্রমাণ করার জায়গায় ঘটে। তারা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে চান যে আমিও ছেলে অথবা আমিও মেয়ে। একটি ছেলে যখন মেয়েতে রূপান্তরিত হচ্ছে, সেই সময় তার মুখে এক গাল দাঁড়ি, তাও সবে মেক-আপ করতে শিখেছে। শাড়িটাও ভালো করে পড়তে শেখেনি। সেই সময় তাকে চরম বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হয়। সমাজ বলে এরা ভীষণ উগ্র হয়, ল্যাংটো হয়। কিন্তু এই সমাজ প্রতি মুহূর্তে আমাদের ল্যাংটো করেছে বারবার। কখনও চোখ দিয়ে, কখনও সরাসরি। আর ট্রান্স-ম্যান অর্থাৎ যে নারীটি পুরুষ হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে তো আরও জঘন্যতম পরিস্থিতি। বাড়ির লোক কোনোভাবেই সেটি মেনে নেয় না। তাই বাড়ির দাদা বা কাকাকে দিয়ে কারেকশন রেপ করানো হয় তাদের। যাতে তাদের মধ্যে পুরুষের স্বাদটি তারা পায়। এরপর জোর-জবরদস্তি বিয়ে দেওয়া হয়।

আপনি যে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেন সেটা ঠিক কী রকম?

প্রথমত সেই দেশে জেন্ডারের কোনও ভেদাভেদ থাকবে না। সেক্স আর জেন্ডার দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বস্তু। বায়োলজিক্যাল সেক্স অনুযায়ী আমি একজন পুরুষ। আমার জন্মের পর আমার পায়ের ফাঁকে ‘লিঙ্গ’ দেখে ডাক্তারীভাবে আমাকে পুরুষ ঘোষণা করা হয়েছিল। আর আমার জেন্ডার হল, আমি একজন ট্রান্স-ওম্যান। ধরা যাক একজন পুরুষ, সে যেখানে খুশি যেতে পারবে, সে পা ফাঁক করে হাঁটবে, যেখানে খুশি টয়লেট করতে পারবে এবং ব-বাচক ও খ-বাচক খিস্তি দিতে পারবে। একটি মেয়ে মানেই ক্রস লেগ করে থাকবে, পা ফাঁক কোনোভাবেই করতে পারবে না। সে ডানপিটে হতে পারবে না, সে কাঁদতে পারবে। আমার বক্তব্য জেন্ডারের এই যে ভেদাভেদ এটা দূর হোক সবার আগে।

সারা দেশ জুড়ে হিন্দু-মুসলিম, বড়লোক-গরিব, হোমো-হেটেরো, উঁচু জাত-নিচু জাত নানারকম বিভাজন রয়েছে। এর থেকে আদৌ কি মুক্তি সম্ভব?

অন্ততঃ পশ্চিমবঙ্গে তো নয়ই। সবকিছুতেই রাজনীতি। লিঙ্গ থেকে শুরু করে এখানে ভিখারিদের মধ্যেও পলিটিক্স চলে। আগামী ১০০ বছরেও মনে হয় না এই বিভাজন দূর হবে বলে মনে হয় না। তবে আধুনিক সমাজ একটু একটু করে হলেও সচেতন হচ্ছে। তারা উপলব্ধি করছে যে মানুষ হিসেবেই একসাথে বাঁচতে হবে। আদতে আমরা সবাই কিন্তু একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এখানে জেনারেশন গ্যাপও একটি ব্যাপার।

পৃথিবীর সব মহিলারই কি মেন্সট্রুয়েশন হয় আর সব মহিলাই কি মা হয়? তাহলে যাদের হয় না তারা সবাই ট্রান্স। আর যে পুরুষের ঔরসে বাচ্চা হয়না সেই পুরুষও তাহলে ট্রান্স।

কিছু মানুষ বলেন সমপ্রেমকে প্রোমোট করা উচিৎ নয় কারণ এর ফলে সন্তানের জন্ম হবে না। ফলতঃ মানব সভ্যতা ধ্বংসের মুখোমুখি হতেই পারে। এই ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

৩৭৭ ধারাটিকে সমাজ পাতি ভাষায় মনে করে হোমোদের আইন। কিন্তু এই আইনটির সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গেলে দেখবেন এখানে কোথাও লেখা নেই যে এটি একটি হোমো-সেক্সুয়্যাল আইন। যে কোনও আনপ্রোডাক্টিভ যৌন সম্পর্ক অর্থাৎ যেক্ষেত্রে সন্তান উৎপন্ন হয় না এবং প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌন সম্পর্ক অবৈধ। কোথাও বলে দেওয়া হয়নি এটি হোমো-সেক্সুয়্যাল আইন। মিডিয়া এমনভাবে প্রচার করেছে ব্যাপারটি যে, আমাদের পিছনে স্ট্যাম্প লেগে গেছে আমরা মানেই ৩৭৭। কখনও কোনও মহিলা বা পুরুষ মুখমৈথুন করে না? প্রকৃতি বিরুদ্ধ যৌনতা আসলে কোনটি? আনপ্রোডাক্টিভ বলতে তাহলে কী বোঝানো হচ্ছে? আমার-আপনার মা-বাবা প্রতি রাতে যে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছে সেগুলিও তাহলে অবৈধ? কারণ সেক্ষেত্রে তো প্রতি ক্ষেত্রে সন্তান উৎপাদন হয় নি। তাহলে তারাও তো ৩৭৭ আওতায় ঢুকলো। আমার ২৮ বছর বয়েস। এতদিন ধরে আমার বাবাকে দেখছি, তিনি অসংখ্য গে, ট্রান্স মানুষদের সঙ্গে ছিলেন। তার মধ্যে কখনও পুরুষের সঙ্গে সম্ভোগের বাসনা জাগে নি। কাজেই যার মধ্যে এই চাহিদাটি নেই, তার মধ্যে কোনোভাবেই এই চেতনা প্রোমোট বা ইনজেক্ট করা যায় না। বাইরের অনেক দেশ সমপ্রেমকে সম্মতি দেওয়ার পর কি দেশের জনসংখ্যা কমে গিয়েছে?

 

 

 

Promotion