Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
বাংলা ব্যান্ড হৃদয়বাড়ি - মাথার এক ফুট নিচে বাঁ-দিকে যাদের ঠিকানা - Exclusive Adhirath
মেঘে ঢাকা তারা

বাংলা ব্যান্ড হৃদয়বাড়ি – মাথার এক ফুট নিচে বাঁ-দিকে যাদের ঠিকানা

‘হৃদয়বাড়ি’ বলে একটি বাংলা ব্যান্ড রয়েছে, এই কথাটি বহুদিন ধরেই শুনছিলাম। তাই কৌতূহলের টানে একদিন পৌঁছেই গেলাম তাদের ডেরায়। জানা গেল অনেক অজানা তথ্য। ঠিক কী রকম ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ইন্ডিপেনডেন্ট মিউজিককে শেষ করার জন্য। পরিচিত হলাম হৃদয়বাড়ির সঙ্গীতানুভূতির সঙ্গে। তারই কয়েক ঝলক থাকলো আপনাদের জন্য।
দীপঙ্কর (হাবলু) – ভোকালিস্ট
প্রিয়ম – রিদম গীটার (ব্যাকিং ভোকাল)
দীপ্ত – লিড গীটার (ব্যাকিং ভোকাল)
তিতাস – বেস গীটার
কিশলয় – কি বোর্ড
শুভাশিস এবং শাশ্বত – ড্রামার
প্রীতম – প্রোডাকশন
ব্যান্ডের নাম হৃদয়বাড়ি নাম কেন?
আমাদের বন্ধুবান্ধব, সমমনস্ক মানুষদের নিয়ে একটি আড্ডার সূত্রপাত হয় আজ থেকে বছর দশেক আগে। সেখানে গান গাওয়া, কবিতা লেখা, সিনেমা নিয়েও যেমন আলোচনা হতো, ঠিক তেমনই একেবারে পাতি আড্ডা বলতে যা বোঝায় হতো। আমাদের প্রাক্তন ম্যানেজার দেবাশিস ‘হৃদয়বাড়ি’ নামটি দিয়েছিল। বেশ কয়েকটি হৃদয় অর্থাৎ বেশ কয়েকটি মন একটি বাড়ির মধ্যে বাস করে সেটিই হল আদতে হৃদয়বাড়ি। পরবর্তীকালে আমরা সেই নামটিই বহাল রাখি। হৃদয়বাড়ির একটি ব্যান্ড হিসেবে পরিচয় তৈরি করে। হৃদয়বাড়িকে একটা ‘‌থিঙ্কার্স ক্লাব’‌ বলা যেতে পারে। যেখানে আমরা বিভিন্ন শিল্পশৈলী নিয়ে আলোচনা করি, মতামত বিনিময় করি। তারই একটি ফলাফল হল গান, একটি ব্যান্ড।
কোন কোন ধারার গান মূলতঃ হৃদয়বাড়ি করে থাকে?
আমাদের কোনও নির্দিষ্ট ধারা বা জঁর নেই। আমরা রক, ব্লুজ, ফোক, সাইকেডেলিক রক, রক অ্যান্ড রোল, গ্ল্যাম রক, গ্রাঞ্জ সবরকমই করে থাকি। আমাদের কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্র রয়েছে যেগুলো আমরা বেশি পছন্দ করি। যেমন ফোক এবং আটের দশকের গ্ল্যাম রক।
একটি সফল ব্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে গেলে কি প্রতিভা এবং টিমওয়ার্কটাই কি যথেষ্ট?
প্রতিভা এবং টিমওয়ার্কই যথেষ্ট নয়। নিজেদের মধ্যে প্রচুর আড্ডা মারতে হয়, মানে সেটি উদ্দেশ্যবিহীন আড্ডা। সেটা যে মিউজিক্যাল আড্ডা হতে হবে এর কোনও মানে নেই। আর দরকার মার্কেটিং পলিসিটা বোঝা। এখন ইউটিউব, ফেসবুক চলে আসার পর গানের বাজার অনেকটাই খুলে গিয়েছে সবার কাছে। সেখানে কী করে নিজেদের মিউজিক প্রোমোট করবো সেই ধারণাটা খুব স্বচ্ছ হওয়া দরকার। সেই মার্কেটিং সেন্স প্রচণ্ড তুখোড় হওয়া জরুরি।
এখনও পর্যন্ত কী কী উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন?
আমাদের কাজ বলতে যদি মিউজিক প্রোডাকশন বলি, তাহলে বলবো আমাদের পাঁচটি গান মুক্তি পেয়েছে। ‘হে প্রেম’, ‘জীবন মানে’, ‘রাধা দরশনে’, ‘জিতে নেবে দিল’, ‘বন্দে মাতরম’। আমাদের চোখে উল্লেখযোগ্য কাজের কথা যদি বলি, তাহলে বলবো আমরা প্রচলিত লোকগান নিয়ে খুব একটা ভাবিত নই। অপ্রচলিত লোকগানগুলি যেগুলি প্রায় হারিয়ে গিয়েছে অথবা যেগুলি কেউ শোনেননি, সেগুলি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সমকালীন বাউল-ফকিররা কী কাজ করছেন সেটা নিয়েও চর্চা করাটা আমাদের কাজ। অনেকেই ভাবেন ফোক হয়তো সেই লালন, সিরাজ সাঁই, হাসন রাজা এঁদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু তারপরেও তো বাউল-ফকিররা গান লিখেছেন, ফোক চর্চার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। আমরা সেই সমকালীন কাজগুলিও তুলে ধরতে চাই। আমি বিশেষ করে বলবো, সুব্রত ক্ষ্যাপার কথা। উনি আমাদের গাইড করেন যে, কী হওয়া উচিৎ, কেমনভাবে হওয়া উচিৎ এই নিয়ে। উনি একজন সাধক বাউল যিনি থাকেন বর্ধমানের কৈচর গ্রামে। আমরা তাঁর কাছে যাই, তাঁর সঙ্গ করি, আলোচনা করি, সময় কাটাই। এই কাজটিকেও আমাদের উল্লেখযোগ্য কাজ বলেই মনে হয়। শো-এর কথা যদি বলি, তাহলে বলতে পারি ২০১৪ সালে নিউ ব্যারাকপুরের কৃষ্টি অডিটোরিয়ামে একটি রক ফেস্টে আমরা পারফর্ম করেছিলাম। কমার্শিয়ালি হিট করার জন্য যে ধরনের মিউজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট তৈরি করা উচিৎ আমরা সেগুলি না করে ব্যাতিক্রমী কিছু করার চেষ্টাই করেছিলাম। মনে হয়েছিল এই মিউজিক হয়তো মানুষের মন ছোঁবে না। কিন্তু দেখেছিলাম আমাদের সেই শো-টিতেই দর্শকের বেশি সাড়া পাওয়া গিয়েছিল।
সঙ্গীত আর দর্শন এরা কি পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলে?
অবশ্যই, দর্শন ছাড়া তো গান হয় না। আর হলেও সেগুলি বেশিদিন বাঁচে না। গানের মধ্যে একটা মেসেজ বা বার্তা থাকা উচিৎ। সেটিই তো আসলে গানটির নির্যাস।

এই মুহূর্তে বাংলায় দু-তিনটি লিডিং বাংলা ব্যান্ড বাদে অন্য কোনও ব্যান্ড চোখে পড়ছে না। এক দশক আগের সময়কেও বলা হতো বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। সেটি কি তাহলে ফুরিয়ে যাওয়ার পথে?
না, এই ধারণাটাই আসলে ভুল। যে সময়টিকে মানুষ বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ বলে মনে করে, এখন তার থেকে গুণগত মানে অনেক ভাল কাজ হচ্ছে। আজ থেকে দশ বছর আগে এফএম চ্যানেলগুলি শুধু বাংলাই নয়, গোটা দেশজুড়েই ব্যান্ড মিউজিককে প্রোমোট করতো। শুধু ব্যান্ড মিউজিকই নয়, ইন্ডিপেনডেন্ট মিউজিক যাঁরাই করতেন যেমন লাকি আলি, ইউফোরিয়া, ফাল্গুনী পাঠক এঁদের গানও আমরা শুনতে পেতাম। এখন সেই ক্ষেত্রটি পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। এখন এফএম চ্যানেলগুলির সঙ্গে সিনেমা প্রোডাকশন কোম্পানিগুলির একেবারে আর্থিক চুক্তি হয়, তাদের গান মানুষের ভালো লাগুক বা নাই লাগুক দিনে এতবার করে শোনাতে হবে। এবার ক্রমাগত হ্যামারিং করে করে সেই গান ভালো লাগানোর চেষ্টা করা হয়। আমি যদি ধরে নিই অনুপম রায়কে। বাংলা ফিল্ম মিউজিকে এই মুহূর্তে প্রথমসারির গায়ক অনুপম রায়। অনুপম রায়ের সিনেমার গানগুলি ফাটিয়ে হিট হচ্ছে। কিন্তু তাঁর ইন্ডিপেন্ডেন্ট অ্যালবাম ততোটা জনপ্রিয়তা পায় নি। এটা কী করে হতে পারে? আসলে রান্নাটা কী হচ্ছে সেটা সমস্যা নয়, সমস্যাটি হল সেই কোন রান্নাটা সবার কাছে পৌঁছচ্ছে? এটা একটি উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে সমস্যা তৈরি করা হচ্ছে যে, স্বাধীন গানবাজনাকে আমি মানুষের কাছে পৌঁছতে দেব না। নাম না করেই বলছি, আজ খোদ কলকাতার বুকে একটি এফএম স্টেশন এই ঔদ্ধত্য দেখাতে পারে যে আমি একটিও বাংলা গান শোনাব না। অথচ এরাই যখন লাইভ শো করে তখন কিন্তু সেই বাংলা ব্যান্ডেরই ডাক পড়ে। সেখানে এতোটাই ভিড় হচ্ছে যে এফএম চ্যানেল কর্তৃপক্ষ জায়গা দিতে পারছেন না। আজ থেকে এক দশক আগের সময়টিকে আমি স্বর্ণযুগ না বলে রেনেসাঁ বলাটা বেশি পছন্দ করবো। সেই সময় নতুন ভাবনার সঙ্গে পথ চলা শুরু হয়েছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আগে যা কাজ হতো এখন তার থেকেও অনেক ভালো কাজ হচ্ছে। রূপমদা বা ফসিলসের কাজগুলি সাড়া দেশজুড়ে ইউটিউবে ট্রেন্ডিং হচ্ছে। তমালের ‘খুচরো’ গানটি ন্যাশনাল ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে। কিন্তু এই ফেসবুক বা ইউটিউবেও কর্পোরেট মুভি প্রোডাকশন হাউজগুলি বিশাল পরিমাণ ডিজিট্যাল প্রোমোশন করাচ্ছে। ইন্ডিপেনডেন্ট মিউজিশিয়ানদের হাতে এতো টাকা নেই। তারা সেটা করতে পারছে না। কাজেই যারা বলছেন, ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ এখন আর নেই তাদের প্রশ্ন করবো এখনকার ক’টা ব্যান্ডের নাম আপনি জানেন? আপনি কটা ব্যান্ডের গান শুনেছেন? আপনি এখনকার নতুন পাঁচটি ব্যান্ডের একটি করে গান বলুন। পারবে না বলতে।
আপনাদের কোন কোন গান মুক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে?
কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ লেখা নিয়ে একটি গান ‘প্রাণগোবিন্দ’। সেটির রেকর্ডিং চলছে। এরপর ভারতের রাজনীতি নিয়ে তৈরি ‘আজব যন্ত্র গণতন্ত্র’ গানটিতে হাত দেবো। সবশেষে আমরা বসবো ‘তোকে নিয়ে চলে যাবো’ গানটি নিয়ে।
৯ বছরের পথ চলায় কোনও ভালো বা খারাপ অভিজ্ঞতা।
ভালো অভিজ্ঞতা যদি বলতে হয়, ফোক গানের মাধ্যমে আমরা নতুন করে লালন ফকিরের কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা করছি। একটা উন্নত মানুষ হওয়ার দিকে এগিয়ে চলেছি। এটা একটি ভালো অভিজ্ঞতা বলা যায়। এটার জন্যই বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে রাতের পর রাত পড়ে থাকা, সেই পরিশ্রমটা পুষিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার এক পরিচিত বন্ধু রয়েছে যে কট্টর মৌলবাদী মানসিকতা পোষণ করে। সে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন করে চলে। তার নিজের ধর্মের প্রতি রয়েছে অন্ধ আনুগত্য এবং উল্টোদিকের ধর্মটি খুব খারাপ এটাই তার বক্তব্য। কিছুদিন আগেই আমরা একটি শো-তে ভবা পাগলার একটি গান গাই। গানটি ছিল ‘ওরে মানুষ দেখবি যদি ভগবান’। বন্ধুটি সেই গানটি শোনে এবং গুনগুণ করে। সে গানটি কতোটা উপলব্ধি করেছে অন্তর থেকে তা জানিনা। তবে আমার বিশ্বাস একদিন না একদিন গানটি গুনগুণ করতে করতেই বুঝতে পারবে, “ভিন্ন নয় রে আলাহ-হরি, শোন রে ফকির-ব্রহ্মচারী”।
খারাপ অভিজ্ঞতা বলতে মানুষ প্রচুর মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছে। বলেছে “তোমাদের গান রেকর্ডিং করতে স্পনসর করবো”। তারপর কোনও সাহায্যই আসে নি। সেটা অবশ্য এখন সব প্রফেশনেই থাকে।
আজকাল ‘ফিউশন’ কথাটি খুব শোনা যাচ্ছে। এই ব্যাপারে আপনাদের কী মত?
ফিউশন ব্যাপারটি শুধু মিউজিক হিসেবে নয়। আমরা আজকাল পাঞ্জাবীর সঙ্গে জিন্স পড়ি, সেটাও কিন্তু ফিউশন। সাহিত্যবোধ বা খাদ্যাভ্যাস সবের মধ্যেই ফিউশন রয়েছে। দুর্গাপূজোয় হয়তো দেখা যাবে একটি চার্চের আদলে প্যান্ডেল করে পুজো হচ্ছে। সেটাও তো ফিউশন। ফিউশন ভালো না খারাপ সেই বিতর্কে আমি যাবো না। তবে ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ফিউশনকে সমর্থন করি। তার কারণ মানুষ একে ওপরের কাছ থেকে শেখে। আর সংস্কৃতির কাজই হল আদানপ্রদান। আমার সংস্কৃতির স্বাদ আমি অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে পৌঁছে দেবো। তার সংস্কৃতির নির্যাস আমি গ্রহণ করবো। দুটি সংস্কৃতি মিলেমিশে একটি উন্নত সংস্কৃতি তৈরি হবে। এটাই তো ভারতের ঐতিহ্য। “মিলে সুর মেরা তুমহারা, তো সুর বানে হামারা”। এই গান শুনেই তো আমরা বড় হয়েছি। আজ যদি বাংলা গানের সঙ্গে পাশ্চাত্য সঙ্গীতও আমি শুনি, তাহলে দুটি মিশে গিয়ে আমার মধ্যে একটি নতুন জিনিস তৈরি হবে। এর মধ্যে তো খারাপ কিছু দেখি না। এটাই তো হওয়া উচিৎ।
ধরা যাক একটি বাংলা ব্যান্ড যাদের পরিচিত তাদের এলাকার বাইরে নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে নিজেদের টিকিয়ে রাখার অক্সিজেন কী হতে পারে?
সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইউটিউব হতে পারে সেই অক্সিজেন। তারা প্রচুর পরিমাণে কাজ করুক এবং সেগুলি তারা সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসআপ সর্বত্র শেয়ার করুক। আমি এই প্রসঙ্গে নবদ্বীপের একটি মেটাল ব্যান্ডের নাম করবো যাদের নাম ‘ডি-এররস’। নবদ্বীপের মতো জায়গায় থেকেও আজ তারা সফলভাবে মেটাল মিউজিক করে যাচ্ছে। কী দারুণ সম্ভাবনাময় তারা!‌ একদিন নিশ্চয়ই তাদের সকলে চিনবেন। আমিও ওদের গান সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রথম শুনি। এভাবে চললে একদিন কে কলকাতার ব্যান্ড, কে বর্ধমানের ব্যান্ড বা কে শিলিগুড়ির ব্যান্ড এই ভেদাভেদটাই ঘুচে যাবে।
নতুন যারা ব্যান্ড গড়ছেন তাদের কী পরামর্শ দেবেন?
নতুন ব্যান্ডদের আমরা সাজেশন দেওয়ার মতো কেউ নই। তবুও যে কোনও কাজ করতে গেলে কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে। প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে এবং নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকতে হবে। ভ্রাতৃত্ববোধ থাকতে হবে নিজের বৃত্তের মিউজিকের ক্ষেত্রে। নিজের গান যেমন সবাইকে শোনাতে হবে ঠিক তেমনি অন্যের গান ভালো লাগলে সেটিও শেয়ার করতে হবে। যদি বাংলা ব্যান্ড মিউজিককে বাঁচিয়ে রাখতে হয় তাহলে নিজের স্বার্থ দেখলে চলবে না। ভ্রাতৃত্ববোধের স্বার্থে সকলের স্বার্থও দেখতে হবে। নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হলে সকলেই বাঁচবে।
সঙ্গীতকে ঘিরে আপনাদের উপলব্ধি কী?
উপলব্ধি একটাই, ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় একটি কথা ছিল। “গান শেষ তো জান শেষ”, এক্ষেত্রেও একেবারেই তাই। এই যে আমাদের প্রত্যেকের পেশাগত জীবন রয়েছে। আমাদের ভোক্যালিস্ট পেশায় ট্রেন-চালক, তার একটি পেশাগত ব্যস্ততা রয়েছে। আমাদের এক গীটারিস্ট সাংবাদিক। এরকম ভাবেই আমাদের সবারই এরকম কিছু না কিছু রয়েছে। এবার ব্যান্ড করতে হবে বলে তো ব্যান্ড করি নি আমরা। ব্যান্ডটা না করতে পারলে পাগল হয়ে যাবো বা মরে যাবো সেই তাড়নাতেই ব্যান্ডটি করা। কটা গান রিলিজ করতে পারলাম সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু ওই মজার সফরটির মধ্যে থাকতে চাই। আরও গান শুনতে চাই, করতে চাই, লিখতে চাই আমরা।
গানের বিষয় হিসেবে কোন টপিকগুলি তোমাদের মগজে ধাক্কা দেয়?
নির্দিষ্ট কিছু জিনিস ধাক্কা দেয় মগজে সেটা নয়। আমরা যার সঙ্গে রিলেট করতে পারি সেটা নিয়েই গান করি। প্রত্যেকটি সৃজনশীল মানুষের জীবনে একটা ব্লক আসে। আমরা নিজেরাও সেটি অনুভব করেছি। কবি জয়দেবের জীবনেও সেটা হয়েছিল যিনি গীতগোবিন্দ লিখেছিলেন। আমরা সেই বিষয়কেই তুলে ধরে ‘প্রাণগোবিন্দ’ গানটি করছি। দেশের রাজনৈতিক বিষয়কে ঘিরে ‘আজব যন্ত্র গণতন্ত্র করছি’। প্রেম আমাদের সকলের জীবনেই খুব ধারাবাহিক। সেটার সঙ্গে রিলেট করে করছি ‘তোকে নিয়ে চলে যাবো।’ আমরা যেটা অনুভব করেছি সেটা নিয়েই গান করেছি, যেটা অনুভব করি নি, সেটা নিয়ে গান বানাই নি।
বর্তমান সময়ে পশ্চিমবাংলার বুকে দাঁড়িয়ে সাইকেডেলিক রককে কীভাবে রিলেট করো?
সাইকেডেলিক রক আমাদের অত্যন্ত প্রিয় একটি জঁর। আমরা লাদেন বলে একটি গান করেছি এই ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। যখন বর্ধমানের কৈচরে সুব্রত ক্ষ্যাপার বাড়িতে যখন গিয়েছি, তখন মাঝরাতে একটি ধানক্ষেতে বসে নিশুতি রাতে গান-বাজনা করছি। সারা গ্রাম তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। পরিষ্কার আকাশ জুড়ে চাঁদের আলো। সেটাই তো একটি সাইকেডেলিক পরিবেশ। অথবা আমাদের যে ভোক্যালিস্ট দীপঙ্কর ওরফে হাবলু। সে হঠাৎ এক রাতে ফোন করে জানালো, একটি জঙ্গলের মধ্যে ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে, সিগন্যাল পায়নি। ওই পরিস্থিতিতে সে সময়কে কাজে লাগিয়ে একটি গান লিখে ফেললো। ভিতর থেকে আমরা সাইকেডেলিক বিষয়টি অনুভব করেছি, তাই গান বেঁধেছি।
অতিরিক্ত সফটওয়্যার নির্ভরতা কি গানের ক্ষতি করছে?
অবশ্যই ক্ষতি করছে। মানুষের শরীর থেকে স্বাভাবিক শব্দ বের হয়, তার কোনও বিকল্প থাকতে পারে না। যদি সেটি হতো তাহলে মানুষ আজ রোবটের গান শুনতো। যারা গাইতে আসছে তারা না শিখেই গাইতে আসছে। ফলস্বরূপ, সে রেকর্ডিংয়ে সে বেসুরো গাইছে এবং পিচ কারেকশন করাতে হচ্ছে। এটা শুধু গায়কের পক্ষেই খারাপ নয়, যারা শুনছেন তাদের জন্যও খারাপ। আমি বাজি রেখে বলতে পারি কলকাতার বহু নামজাদা সঙ্গীতশিল্পীর গান রেকর্ডেড কণ্ঠ শুনতে একরকম লাগে এবং সামনা সামনি গাইলে এতোটাই খারাপ লাগবে যে শুনতেই ইচ্ছে করবে না। এভাবে ৮০% মানুষের কানকে ফাঁকি দেওয়া গেলেও যারা এসব নিয়েই চর্চা করেন সেই ২০% মানুষ ঠিকই কারসাজিটা ধরে ফেলবেন।
রিয়্যালিটি শো কি শিল্পী তৈরি করে নাকি তারকা তৈরি করে?
শিল্পী কখনোই তৈরি করা যায় না। শিল্পী তো জন্মায়। রিয়্যালিটি শো আসলে তারকা তৈরি করে। তবে আমি এখনও মনে করি, রিয়্যালিটি শো ধারণাটি খারাপ নয়। কিন্তু সেখানে স্টারকে যেভাবে ব্যাবহার করা হয় সেটা আসলে খারাপ। তারা শিল্পীকে গান নির্দিষ্ট করে দেয়। আপনার ইচ্ছে থাকতেই পারে আপনি কোনও যন্ত্রসঙ্গীত ছাড়াই খালি গলায় গান গাইতে চান। অথবা বড়জোর একটি গীটার বাজবে। কিন্তু রিয়্যালিটি শো সেটি হতে দেবে না কোনও ভাবেই। তারা শিল্পীকে একটি বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলতে বাধ্য করবেন।
নির্দিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলের ট্যাগ না থাকলে শিল্পীরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন। এ ব্যাপারে আপনাদের কী মত?
আমরা নিজেরা কখনও এই বৈষম্যের স্বীকারও হইনি, আবার নির্দিষ্ট টেলিভশন চ্যানেলের ট্যাগও পাইনি। আমরা শুনেছি এরকম বৈষম্যের কথা। কিন্তু নিজেরা এটির মুখোমুখি হই নি, তাই এটা বলাটা ঠিক হবে না।
শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি কী দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন?
আমরা আসলে যে দর্শনের চর্চা করি সেটাকেই গানের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করি। আগেই একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম আমাদের এক বন্ধু ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনায় বিশ্বাসী। সে আমাদের গান মন ভরে শোনে এবং গুনগুন করে গায়ও। গানের মাধ্যমেই তাকে বোঝাতে হবে সঠিক পথটা মানুষে মানুষে হানাহানি নয়। এটাই আমাদের শিল্পী হিসেবে দায়বদ্ধতা হওয়া উচিৎ।
সঙ্গীতকে ঘিরে আপনাদের স্বপ্ন কী?
আমাদের স্বপ্ন এটা নয় যে, আমরা প্রচুর শো করে টাকা কামাবো বা স্টার হয়ে অটোগ্রাফ দেবো। আমাদের স্বপ্ন, আমরা যেটা বলতে চাইছি সেটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাক। অন্ততঃ পৌঁছনোর সুযোগটুকু দেওয়া হোক। আজকে ফিল্ম মিউজিক যে হারে প্রোমোশন পাচ্ছে তাতে এক অসম লড়াইয়ের মুখোমুখি আমরা। প্রত্যেক স্বাধীন সঙ্গীতশিল্পী প্রত্যেকে সমান সুযোগ পাক, বণ্টনটা সমান হোক। পাঁচটি সিনেমার গান বাজলে, বাকি পাঁচটি স্বাধীন শিল্পীর গানও বাজুক। বাকি লড়াইটা আমরা লড়ে নেবো।

Promotion