মরসুমী ফুল

ইতিহাসের আলোয় ব্যান্ডেল চার্চ

 

এক সময় পূর্ব ভারতে চুঁচুড়া, হুগলি, চন্দননগর এবং শ্রীরামপুর দিয়ে গঙ্গা অববাহিকা মুঘল আমল থেকেই হয়ে উঠেছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলির প্রধান বাণিজ্যপথ। একটি জনপ্রিয় মতানুসারে বাংলা শব্দ ‘বন্দর’-এর পর্তুগীজ অপভ্রংশে ব্যান্ডেল শহরের নামাঙ্কন। এই স্থানে ব্যাসিলিকাটি গড়ে তোলেন পর্তুগীজ ব্যবসায়ীরা। শতাব্দীপ্রাচীন এই গীর্জাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এখানে প্রভু যীশু নন, বরং কুমারী মাতা মেরি শুভ যাত্রার দেবী হিসেবে অধিষ্ঠিতা। তার এক হতে রাজদণ্ড এবং মাথায় শোভা পায় স্বর্ণমুকুট! একটি শিশুকে কোলে নিয়ে তিনি এক জাহাজের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন। জাহাজটি পাল তুলে চলেছে উত্তাল সমুদ্রপথে। মাতা মেরির এই রূপ পর্তুগীজদের কাছে ‘নোসা সেনহোরা দো রোসারিও নামে খ্যাত। এর বাংলা অর্থ, ‘আমাদের প্রার্থনার নারী/দেবী।’ মাতা মেরির চরিত্রকে খ্রিষ্ট ধর্মে তুলে ধরা হয়েছে এক রত্নগর্ভা, মমতাময়ী নারী হিসেবে। অন্য যে নামে মাতা মেরির এই রূপ বিখ্যাত তা হল ‘শুভ যাত্রার দেবী।’ পর্তুগীজ বণিকরা এই গীর্জায় যাত্রার প্রাক্কালে আশীর্বাদ প্রার্থনা করতেন। তাদের বিশ্বাস ছিলসমুদ্রে তারা সবরকম বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাবেন।

 

আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবরের শাসনকালে ১৫৭১ সালে পর্তুগীজরা হুগলিতে বন্দর স্থাপন করতে শুরু করে। পাশাপাশি খ্রিষ্ট ধর্মের প্রচারও জোরকদমে শুরু হয়। ১৫৯৮-এর শেষে হুগলিতে ক্যাথলিক জনসংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। যার মধ্যে পর্তুগীজ ছাড়াও ছিল স্থানীয় ও মিশ্র জাতির মানুষজন।১৫৭৯ সালে অগাস্টিনিয়ান ফ্রেয়ার বলে একটি গোষ্ঠীকে পর্তুগীজরা অনুমোদন দেয় এই অঞ্চলে গীর্জা স্থাপনের জন্য। তবে এই গীর্জাকে ঘিরে মাতা মেরির অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার শুরু হয় সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে। শাহজাহানের সঙ্গে পর্তুগীজদের সম্পর্ক অবনতির পথে এগোতে থাকে। সম্রাট শাহজাহান ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে তার বিশ্বস্ত নবাব কাশেম খান জুভেয়নীর নেতৃত্বে ম্যুরদের একটি আক্রমণকারী দলকে পাঠান হুগলিতে। তারা সেখানে এসে ব্যান্ডেল গীর্জাটিকে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেয়। এখানেই তাঁরা থেমে থাকেনি। মাতা মেরির মূর্তিটিকে গঙ্গাবক্ষে ছুঁড়ে ফেলে। শতাধিক পর্তুগীজকে গ্রেফতার করে গীর্জার প্রধান ফাদারকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লি। সেখানে জনগণের সামনে উন্মত্ত হাতির পায়ের কাছে তাঁকে নিক্ষেপ করা হয়। জনশ্রুতি এই যে, হাতিটি পুরোহিতের সামনে এসে তাকে না পিষে পিঠে তুলে নিয়ে শাহজাহানের কাছে ক্ষমা ভিক্ষার ভঙ্গিতে মাথা নত করে দাঁড়ায়। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক শাহজাহান বাধ্য হন পর্তুগীজদের সাথে সন্ধি করতে। গঙ্গায় ফেলে দেওয়া মেরীর মূর্তিটি আগেই স্থানীয় জেলেদের জালে উঠেছিল। প্রচলিত গল্প ও গীর্জার ঐতিহাসিক আর্কাইভ অনুসারে তাঁরাই মূর্তিটিকে যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করেছিলেন। পরে ১৬৬০ সালে গির্জাটি পুনর্নিমাণ করেন গোমেজ ডে সেতো এবং সেই মূর্তিটিকে আবার স্বমহিমায় স্থাপন করা হয়।

 

 

বাংলা শব্দ বন্দরের অপভ্রংশ ছাড়াও ব্যান্ডেল নামকরণের আরেকটি গল্প আছে। সেই গল্পটি মাতা মেরির মহিমা গাথাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে এক বণিক ও তার মাস্তুলের গল্প। পর্তুগীজ ভাষায় সেই
মাস্তুলটিকে বলা হয়, ‘ম্যাস্টো দে ব্যান্দেইরা’। বাংলায় যার আক্ষরিক অর্থ, ‘পতাকার মাস্তুল’। বলা হয়ে থাকে, ১৬৫৫ সালে এক পর্তুগীজ বণিক সাংঘাতিক ঝড়ের মুখে পড়ে শুভ যাত্রার দেবী মাতা মেরির কাছে প্রার্থনা করেন। তিনি মানত করেন, এই বিপদ থেকে রক্ষা পেলে প্রথম যে গীর্জা দেখবেন সেখানে জাহাজের প্রধান মাস্তুলটি দান করবেন। ঝড় কেটে গেলে তিনি ব্যান্ডেল গীর্জার মুখোমুখি হন। তখন গীর্জাটির অবস্থা ম্যুরদের আক্রমণে বিধ্বস্ত। কিন্তু তিনি তার মানত পূরণ করতে গির্জায় মাস্তুল টি দান করলেন। প্রায় ৪৫০ বছর দাঁড়িয়ে থাকার পর ২০১০ সালে এক কালবৈশাখী ঝড়ে বজ্রপাতের ফলে মাস্তুলটি ভূপতিত হয়। ভারতের পুরতাত্বিক সমীক্ষণ সংস্থা এএসআই স্থানীয় পৌরসভাকে আদেশ দেয় মাস্তুলটিকে ফের দাঁড় করানোর জন্য। কিন্তু পৌরসভার গাফিলতিতে বিরক্ত হয়ে গীর্জা কমিটি মাস্তুলটিকে কাপড়ে মুড়ে একটি কাঁচের বক্সে দর্শনার্থীদের জন্য রেখে দেন।

 

স্থানীয় বিশ্বাসমতে মমতাময়ী মাতা মেরি ‘সর্ব কামার্থ মোক্ষদা।’ অর্থাৎ তিনি সমস্ত মনস্কামনা পূরণ করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই চার্চকে ঘিরে একটি রীতি চালু ছিল। সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়লে, সেই সন্তানের মা তাঁর সন্তানের দৈর্ঘ্যের সমান একটি মোমবাতি দিয়ে গীর্জায় স্নেহময়ী মাতা মেরির কাছে সন্তানের আরোগ্য কামনা করতে যেতেন। তবে এখনও মানুষ তার প্রিয়জনের দৈর্ঘ্যের সমান মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে থাকেন। বড়দিনের প্রাক্কালে নতুন সাজে সেজে ওঠে গীর্জা-প্রাঙ্গণ।

 

 

Promotion