Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
হেতমপুরের রাজবাড়ি - ইতিহাসের এক অমূল্য সাক্ষী - Exclusive Adhirath
জগতের বাহার

হেতমপুরের রাজবাড়ি – ইতিহাসের এক অমূল্য সাক্ষী

রাজবাড়ি, বহু প্রাচীন মন্দির বা অট্টালিকা দেখার এক আলাদাই আকর্ষণ থাকে। রাজবাড়িগুলির ইট-কাঠ-কড়ি-বর্গা, পুরোনো তৈলচিত্র, আসবাবপত্র বা পাল্কি সবই তো আসলে ইতিহাস বলতে চায়। এমনই এক ঐতিহ্যময় রাজবাড়ি দেখার টানেই বোলপুর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম হেতমপুরের উদ্দেশ্যে। প্রায় ৪৫ কিমি রাস্তা, ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম।

ভেতরে ঢুকে বেশ খানিকটা হেঁটে গিয়ে পৌঁছলাম মূল রাজবাড়ির সামনে। সুদীর্ঘ স্তম্ভের ওপর সগৌরবে দণ্ডায়মান রাজবাড়ির একাংশ এখন ডিএভি পাবলিক স্কুল। স্কুলের ভেতরে ঢুকে চারিদিকে দেখি সারি সারি ঘর। আর ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল প্রাঙ্গণ। প্রতিটি ঘরের সামনে খিলান আকৃতির তোরণ। প্রতিটি ঘরের ওপর তলাতেও রয়েছে ঘর। একসময় এখানে কতোই না জৌলুস-আভিজাত্যের ছোঁয়া ছিল। আজ সেখানেই ছোট ছোট ফুলেদের দল পড়াশুনা করছে, খেলছে।

স্থানীয় লোকজনদের জিজ্ঞাসা করে অচিরেই পৌঁছে গেলাম রাজবাড়ির সিংহদুয়ারের সামনে। এটা দেখতে অনেকটা দুর্গের দরজার মতোই। সিংহদুয়ারের ঐতিহ্যময় গঠনশৈলী সত্যিই মনমুগ্ধকর। এবার এলাম রাজবাড়ির অন্য অংশে। এখানে রাজপরিবারের কেউ কেউ এখনও বাস করেন। প্রাঙ্গণে বেশ কিছু ধানের গোলা চোখে পড়লো যেখানে তালা-চাবির ব্যবস্থা রয়েছে। সামনেই একটা পাল্কি রাখা। মনে হল, একসময় এই পাল্কিকেই কতো সুন্দর করে সাজিয়ে রাণী মা অথবা রাজকুমারীদের বাহকরা নিয়ে যেত। আজ মূল্যহীন হয়ে অবহেলায় এক কোণে পড়ে রয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই দেখলাম এক ভদ্রলোক চেয়ারে বসে। জানতে পারলাম উনিই বর্তমানে বাড়ির দেখাশোনা করেন। ওনার কাছেই শুনলাম বয়েসের ভারে জর্জরিত রাণী মা অসুস্থ হয়ে রাজবাড়িরই কোনও একটি ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা গেল হেতমপুরের এই রাজবাড়ির কিছু ইতিহাস। রাজবাড়িটি দুর্গের আকারে নির্মিত এবং এখানে মোট ৯৯৯ টি দুয়ার রয়েছে। মুর্শিদাবাদের নবাবের হাজারদুয়ারির সম্মান রক্ষার্থে এখানে একটি দুয়ার কম রাখা হয়েছে। এটি হেতমপুর হাজারদুয়ারি রাজবাড়ি নামেও পরিচিত।

 

চলুন, এবার একটু এই ঐতিহাসিক দলিলের ভেতর ঢুকে আনাচে-কানাচে ইতিহাস খোঁজা যাক। হেতমপুর রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন রাধানাথ চক্রবর্তী যিনি প্রথম জীবনে এক সাধারণ গোমস্তা ছিলেন। তিনি পূর্বতন রাজনগর রাজবংশের রায়দের দমন করে ক্ষমতায় আসেন। এরপর ১৭৮১ থেকে ১৭৯ সালের মধ্যে তিনি ১৯ টি মৌজা অধিগ্রহন করেন। এমনকি মুর্শিদাবাদের নবাবের থেকেও বেশ কিছু মহল এবং জমিদারি কেনেন। সেইসময় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অধীনতা স্বীকার করে নেন। এর পরিবর্তে ব্রিটিশ সরকারের থেকে তিনি ‘মহারাজা’ উপাধি লাভ করেন। ১৮৩৮ সালে তার মৃত্যু হয়। সেই সময় তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল সেই সময়কালীন ২ লক্ষ টাকা।

এই বংশের আরেক প্রভাবশালী রাজা ছিলেন রাজা রামরঞ্জন চক্রবর্তী(১৮৫১-১৯১২)। ১৮৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় ইনি ব্রিটিশদের নানাভাবে সাহায্য করেন। ফলস্বরূপ রামরঞ্জন চক্রবর্তী ‘রাজা বাহাদুর’ খেতাব পান। তাঁর সময়েই এই রাজবাড়ির বিশাল অংশ নির্মিত হয়। এই জন্য এটি ‘রঞ্জন প্যালেস’ নামেও খ্যাত।

স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেও এই রাজবাড়ির ভূমিকা নেহাৎ নগণ্য নয়। নজরুল ইসলাম এবং চারণ কবি মুকুন্দ দাস ব্রিটিশদের নজর এড়াতে রাজবাড়ির দোতলার একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যদিও শেষ রক্ষা হয়নি, নজরুল ইসলাম ধরা পড়ে যান। এরপর বহরমপুর জেলে বসে হেতমপুর রাজবাড়ি নিয়ে কবিতা লেখেন। এই রাজবাড়ি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিশ্চিত আস্তানা। ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যার বহু নীল-নক্সা এখানেই তৈরি হতো। ৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পড়ে তৎকালীন রাজা বিশ্বরঞ্জন চক্রবর্তী বীরভূম জেলার প্রথম পতাকা  উত্তোলন করেন এই রাজবাড়ি থেকেই।

ভারাক্রান্ত মনে রাজবাড়িকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাই রাধানাথ চক্রবর্তী দ্বারা নির্মিত প্রায় ২০০ বছর প্রাচীন আরেকটি রাজবাড়ির দিকে। পোড়ামাটির ইটে তৈরি রাজবাড়িটি শুধু কঙ্কাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বহু প্রাচীন বটগাছের ঝুরি রাজবাড়ির পাঁজর বিদীর্ণ করে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই ভগ্নপ্রায় রাজবাড়িতেও একটি স্কুল খোলা হয়েছে।

ফেরার পথে দেড়শো বছরের পুরোনো একটি শিব মন্দির চোখে পড়লো। এটির গায়ে টেরাকোটার কাজ এবং নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করলো। এভাবেই ঐতিহাসিক হেতমপুরের রাজবাড়ি দেখে ফিরে চললাম ফের বোলপুরের উদ্দেশ্যে।