Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
হাফিজা সুলতানা - এক সংগ্রামী সঙ্গীত প্রতিভা - Exclusive Adhirath
মেঘে ঢাকা তারা

হাফিজা সুলতানা – এক সংগ্রামী সঙ্গীত প্রতিভা

 

এক্সক্লুসিভ অধিরথের ইউটিউব চ্যানেলে এই শিল্পীর সাক্ষাৎকার টিজারটি প্রকাশ পেয়েছিল অতি সম্প্রতি। তারপর কিন্তু অনেকেই জানতে চেয়েছিলেন কে এই তরুনী শিল্পী? আবার বেশ কিছু এরকম কমেন্টও আসে যে হাফিজা সুলতানা তাদের প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী। কিন্তু অনেকেই জানেন না হাফিজাকে কীভাবে লড়তে হয়েছে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। তাঁর সঙ্গীতের কেরিয়ারের শুরুতেই হাওয়া ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ শিল্পী তাঁর পরিশ্রম দিয়ে সেই হাওয়ার গতিপথেই তুলেছেন অধ্যাবসায় আর গভীরতার পাঁচিল। আর সেই পাঁচিলে ধাক্কা খেয়ে হাওয়া কিন্তু আজ তাঁরই দিকে। এই সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে শিল্পী কী বার্তা দিচ্ছেন সবাইকে? আসুন সেটাই শোনা যাক।

সঙ্গীতের সঙ্গে রিলেশনশিপে কবে থেকে আছেন?

গান-বাজনা শিখছি ক্লাস ওয়ান থেকেই। তখন হারমোনিয়ামের বেলো পর্যন্ত হাত যেত না। একটা বা দুটি বালিশ বাবা দিয়ে দিতেন, তার ওপরে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতাম। অবশ্য তখন গানকে ততোটা সিরিয়াসলি নিই নি। গানের স্কুলে যেতাম, ছড়ার গান শিখে চলে আসতাম। তবে ক্লাস সিক্স-সেভেনে উঠে একটা সচেতনতা বোধ আসে। তারপর থেকেই গানের সঙ্গে আমার প্রকৃত সম্পর্ক শুরু হয়।

আপনার গুরু কারা?

আমার প্রথম গুরু হলেন আচার্য জয়ন্ত বোস। তাঁর ইনস্টিটিউশনে গিয়ে শিখতাম। সেখানে জুনিয়র ক্লাসে দীপঙ্কর বসু ছিলেন আমার গ্রুমার। তারপর সিনিয়র ক্লাসে আমি উত্তীর্ণ হই। সেখানেও দু’বছর শিখে আমি শ্রুতিনন্দনে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কাছে অডিশন দিই। সেখানে আমি নির্বাচিত হই। দেড় বছর হল গুরুজীর কাছে সরাসরি ক্লাস করছি।

কোন কোন ধারার গান আপনি গেয়ে থাকেন?

আমি মূলতঃ ক্লাসিক্যাল মিউজিক শিখি। তবে গান আমি অনেক রকমেরই গাই। যারা ক্লাসিক্যাল মিউজিক শেখেন তাঁরা সাধারনতঃ সবরকম গানের চর্চা করেন না। ধ্রুপদী সঙ্গীতকে কেন্দ্র করেই তাদের একটা ধারা তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু আমি সবধরনের গান ভালবাসি, বিশেষ করে লাইট ক্লাসিক্যাল গানে স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এছাড়া নিজে নিজে ওয়েস্টার্ন মিউজিক শুনেছি। তাই সেগুলো গাওয়ার চেষ্টা করি। রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুলগীতিও আমার গাইতে ভালো লাগে।

এখনও পর্যন্ত সঙ্গীতের ক্ষেত্রে কী কী কাজ করেছেন?

সম্প্রতি কিছু বন্ধু মিলে ‘গায়কী টেলস’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলেছি। সেখানে খুব একটা কেউ প্রফেশনাল সেরকমটাও নয়। কেউ গিটার বাজায়, আমি আর একটা দাদা গান করি, কেউ তবলা বাজায়, আমার দিদি কোনও লেখার নেপথ্য কণ্ঠ দেয় ভিডিওতে। পড়াশুনার পাশাপাশি আমরা গানবাজনা করি। আমরা মনে করি একটা সাংস্কৃতিক বৃত্ত খুব দরকার। সেখানে আমাদের রেকর্ডিং হয়, ভিডিও তৈরি করে নেটজগতে ছাড়া হয়।

কলামন্দিরে ২০১৩ সালে আমার আগের গুরুর প্রতিষ্ঠান বিনকার মিউজিক্যাল সোসাইটির অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছি। লিড সিঙ্গারের ভূমিকায় ছিলাম আমি। ‘আলো হাওয়া’ এবং ‘অনুস্মরণ’ এই দুটি শর্ট ফিল্মে নিজের সুর দেওয়া কম্পোজিশন ছিল।

আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে ইউটিউবে দেখা যায়। কেন ইউটিউবকে এতোটা গুরুত্ব দেন?

ইন্টারনেট মানুষের কাছে পৌঁছানোর বড় মাধ্যম। আর এটা আমরা সবাই জানি যে, ইউটিউব হল মানুষের কাছে নিজের সৃষ্টি পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম একটি মঞ্চ। তাই ইউটিউবও বেশ খানিকটা আমাদের মতো শিল্পীদের কাছে সম্বল।

সঙ্গীতকে পেশা হিসেবে নেবেন এই ভাবনা কবে কীভাবে মাথায় এলো?

আমি একটি মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে এসেছি। তাই আর পাঁচজন যতোটা সহজে গানের চর্চা করতে পারেন, আমার ক্ষেত্রে ততোটা সহজে হয় নি। গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আমাকে লড়াই চালাতে হয়েছে। আমাদের যৌথ পরিবার থেকে প্রবল আপত্তি জানিয়েছে গানের ক্ষেত্রে। বলা হয়েছে, আমি যেভাবে গান করি এভাবে নাকি কোনও সভ্য পরিবারের মেয়ে গান করে না।

ক্লাস এইটে তখন পড়ি, সেই সময়ের একটি ঘটনা কোনওদিনই হয়তো ভুলতে পারবো না। সেদিন ঈদ ছিল। দেশের বাড়িতে আমার ভাই-বোনদের সঙ্গে আমিও আনন্দে মেতেছিলাম। আমার কাকু এসে আমাকে বেশ কিছু কটু কথা শোনান আমার গান গাওয়া নিয়ে। এমনকি আমার মৃত্যুকামনাও করেন। পরে আমি সেই কষ্ট বাবার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলাম। বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘মা তুই গানটাই গেয়ে যা, আমি তোর পাশে আছি’। সেদিন মনে হয়েছিল এতো বড় যৌথ পরিবারে সবাই আপত্তি জানালেও, বাবা সবার বিরুদ্ধে গিয়ে আমার পাশে থাকলেন। সেদিন একটা কথাই মনে হয়েছিল। মা-বাবার এই পাশে থাকাটা তখনই পূর্ণতা পাবে যদি গানটা নিয়ে কিছু করতে পারি।

এক্সক্লুসিভ অধিরথের পাঠকদের জন্য হাফিজার গান…

গানের সফরে কোন ঘটনাকে টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করেন?

আচার্য জয়ন্ত বসুর একটি অনুষ্ঠানে উনি আমাকে ভরসা করে লিড সিঙ্গারের রোল দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথম দিন রিহার্সালে কিছুই পারছিলাম না। এমনকি গুরুজিও হতাশ হয়েছিলেন আমাকে নিয়ে। এটা আমার জীবনের প্রথম বড় অনুষ্ঠান ছিল। তাই নিজের ব্যর্থতায় খারাপ লাগলেও একটা জেদ চেপে গিয়েছিল। টানা দু’মাস লড়াই করলাম, প্রচণ্ড অনুশীলন করলাম। অনুষ্ঠানের দিন সবাই বললো, আমার গানটাই নাকি সব থেকে ভালো লেগেছে। আমিও উপলব্ধি করি যে ওই দুই মাসে আমার গলাতেও একটা পরিবর্তন এসেছে। তারপরেই আমার মনে হয়েছিল যে আমি পারবো। এটা অবশ্যই জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট।

কোন কোন শিল্পীর গান, লেখনী ও জীবনবোধ আপনাকে টানে?

লেখা বলতে গেলে রবিঠাকুরের লেখা আমাকে খুব টানে। ওনার লেখার ওজনটাই অন্যরকম আমার কাছে। ‘কেন মেঘ আসে, হৃদয়-আকাশে’ এই কথাটি সবাই বলতে পারে না। তাছাড়া জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের গানের কথা ও সুর দুটোই ভালো লাগে। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গান এবং জীবনবোধ আমাকে আকৃষ্ট করে। উনি যখন শুরু করেন তখন ওনার প্রায় কিছুই ছিল না। একটা ভাঙা হারমোনিয়াম নিয়ে শুরু করেছিলেন। সেই জায়গা থেকে আজ উনি এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন। যেটা উনি সারাজীবন ধরে অর্জন করেছেন তা প্রায় তিন-চার হাজার ছাত্রছাত্রীকে দিচ্ছেন। আমরা সুযোগ পেয়েও অনেক সময় করি না, ফাঁকি মারি। কিন্তু উনি অনেক কিছু না পেয়েও সঙ্গীত নিয়ে সাধনা চালিয়ে গিয়েছেন। ওয়েস্টার্নের মধ্যে অ্যাডেলের গান শুনি, তাঁর গলার একটি বিশেষ টোন আছে যেটা আমার ভালো লাগে। এছাড়া অরিজিত সিংহ, রেখা ভরদ্বাজ, নন্দিনী শ্রিকারের গান ভালো লাগে।

গানের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের অনেকেরই মুম্বই হল এক স্বপ্নপুরী। আপনারও কি সেই স্বপ্নপুরীতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে?

আমার আপাততঃ সেরকম কোনও স্বপ্নই নেই। আমার মনে হয় আগে ভিতরের ভিতটা তৈরি করা ভীষণ দরকার। আজকাল অনেককেই দেখি, তাঁরা ঈশ্বর প্রদত্ত প্রতিভার অধিকারী। বেশিরভাগ জনেরই দেখি ‘সা’ বললেই ভালো লাগছে। তাদের খুব বেশি রেওয়াজই করতে হয় না। আমাকে কিন্তু প্রচুর রেওয়াজ করতে হয় একটা সুরে লাগাতে গেলে। অনেকেই কিছুদিন শিখেই বলে মুম্বই যাবো, প্রতিযোগিতায় নাম দেবো। তবে আমার মনে হয় বড় জায়গায় যদি যেতে হয়, তাহলে অন্তরের গভীরতাকেও যেন বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে। ভিতরের শেখাটাও বাড়াতে হবে। আমি গান নিয়ে পড়াশুনা করে আরও জানতে চাই।

সামনে কোন কোন কাজ মুক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে?

ইউটিউবে নিজের কম্পোজিশন খুব একটা যায় নি এখনও। বেশিরভাগই বর্তমান সময়ের গান এবং তাঁর মধ্যে বেশ কিছু নানা ভাষার ম্যাশ আপ রয়েছে। এইবার ক্লাসিক্যাল অভিমুখী কিছু একটা কাজ দর্শকদের উপহার দিতে চাই। নিজের লিরিক্স এবং সুর আছে যেগুলো ভালো করে অ্যারেঞ্জ করে ইউটিউবে প্রকাশ করতে চাই। এছাড়া অন্বয়দা তাঁর পরবর্তী স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতে আমাকে গান গাইতে বলেছেন। সেটারও প্রস্তুতি চলছে।

আপনার সঙ্গীত সফরে কোনও এক্সক্লুসিভ অভিজ্ঞতার কথা আমাদের জানান।

খুব জাঁকজমকপূর্ণ কোনও অভিজ্ঞতা মনে পড়ে না। আমার পরিচিত একটি মেয়ে গানবাজনা করতে খুব ভালোবাসতো। ওর নাম শ্রাবণী। যখন ক্লাস টেনে পড়াকালীন ওর বাবা মারা যান। বেশ কিছুদিন পরে বিষয়টি জানতে পেরে দেখা করতে যাই। বুঝতে পারি ও খুবই ভেঙে পড়েছে। সে জানালো কোনও রকমে পড়াশুনা করছে এবং সেই মুহূর্তে গান শেখার সামর্থ্য নেই। আমি তাঁকে আমার কাছে গান শিখতে আসতে বলি। তারপর ক্লাস ইলেভেন থেকে সে আমার ছাত্রী। গতবছর জন্মদিনে আমি সকাল থেকে অনেক উপহার পেয়েছিলাম। শ্রাবণী রাত ন’টায় এসে আমাকে বলল, দিদি আমি তো তোমার জন্য সেরকম কিছু আনতে পারিনি। শুধু নিজের হাতে রান্না করে এনেছি। অনেক বড় বড় অভিজ্ঞতার থেকে এই ভালবাসাটাই অনেক বেশি দামী আমার কাছে।

বর্তমান গুরু অজয় চক্রবর্তীর কাছে ভর্তি হওয়ার দু’মাস পরেই কলামন্দিরে একটি অনুষ্ঠান হয়। এই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার জন্য বাকি ছাত্রছাত্রীদের অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার মধ্যে যেতে হয়েছিল। যদিও আমার গান শুনে গুরুজি একবারেই আমাকে নিয়ে নিয়েছিলেন। সিনিয়র দাদা-দিদিদের সঙ্গে গান গাওয়ার একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল।

রিয়্যালিটি শো কি শিল্পী তৈরি করে, নাকি তারকা তৈরি করে?

রিয়্যালিটি শো আমার মতে পারফর্মার তৈরি করে। গান শেখাটা একটা জিনিস, পারফর্ম করাটা আরেক জিনিস। অনেককেই দেখেছি হয়তো ভালো গান গাইলেও মঞ্চে উঠলেই সবার সামনে ঘাবড়ে যান। ফলে নিজের সেরাটা দিতে পারেন না। এই একটা অ্যাডভান্টেজ রয়েছে রিয়্যালিটি শো-র। কিন্তু শিল্পী তৈরি করেন এটা বলবো না। শিল্প মানে আমি বুঝি সাধনা। সাধনাটা বাড়িতে চার দেওয়ালের মধ্যে সব কিছুর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে হয়। প্রচুর ত্যাগ লাগে নিজের সুরকে খুঁজে পেতে। তারপর সেই খুঁজে পাওয়ার ওপর চলে রেওয়াজ। যারা রিয়্যালিটি শো করেন সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব না। কারণ তাদের বাইরের আড়ম্বর এতো বেড়ে যায় যে সেই সাধনা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

সঙ্গীতকে ঘিরে আপনার উপলব্ধি কী?

প্রথমতঃ সঙ্গীত একটা এমন ফর্ম যেটা মানুষের সূক্ষ্মানুভূতিগুলো অনেক বাড়ায়। আমার যে ভিডিওটি এই ওয়েব মিডিয়ায় আজ দর্শকরা দেখছেন সেখানে একটি গানের লাইন রয়েছে। ‘ছুটে চলা, সূচ-সুতো’। এই কথাটা গানের সুরে আমি কীভাবে বলছি? সুরটাও এমনভাবে দিতে হবে যাতে ফিলটা আসে। এগুলো নিয়ে রিসার্চ করতে করতেই মানুষের মধ্যে গভীরতা বাড়ে, জীবনবোধ গড়ে ওঠে। গানের হাত ধরে অনেক সময় মনের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারি। দুঃখের সময়ও একটা গান গাইলে বা লিখে ফেললে মনে হয় দুঃখটা চলে গেল। আর অবশ্যই মানুষে মানুষে ধর্ম যে বিদ্বেষ তৈরি করছে তাঁর প্রতিবাদও হল গান।

মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এই মুহূর্তে নতুনদের জায়গা ঠিক কতোটা?

আমার মনে হয় প্রচুর ছেলেমেয়ে ভালো গায়। ফলে প্রতিযোগিতাও বেশি হয়ে গেছে। ফলতঃ মানুষ প্রতিযোগিতাকেই খুব বেশি প্রাধান্য দিয়ে ফেলছেন। গভীরতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই নতুনদের মধ্যে কিছু প্রতিভা উঠছে কিন্তু একটা সময়ের পর তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন আজও আমরা রফিজি বা লতাজির গান শুনে মুগ্ধ হই। কিন্তু নতুন যারা কাজ করছেন তাঁরা কভার সং বেশি গাইছেন, পুরোনোকেই কিন্তু আমরা ভেঙে ভেঙে খাচ্ছি। ফলত চিরকালীন কাজ সেভাবে তৈরি হচ্ছে না।

অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভরতা কী কোথাও গিয়ে গানের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

সেটা নির্ভর করছে কীভাবে যন্ত্রকে কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে খারাপ লাগে যখন দেখি, স্রেফ স্টুডিওর কারসাজির সাহায্যে কেউ কোনও গান ইউটিউবে ছেড়ে দিল। যা লাখ লাখ মানুষ দেখে আনন্দ পেলেন। ওদিকে তাঁকে লাইভ গাইতে গেলে তাঁর হয়তো সুরেই লাগে না। এই নির্ভরতা আমার কাছে অসৎ। তবে গানের মধ্যে যন্ত্রশিল্পটাও তো আদতে একটি শিল্প। তাতে যদি গানের সৌন্দর্য বাড়ে তাহলে ক্ষতির কোনও জায়গা নেই।

নির্দিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলের ট্যাগ না থাকলে সঙ্গীতশিল্পীরা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলছেন?

আমার মনে হয় অবশ্যই বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ভালো শিল্পী যাদের এক্সপোজার খুব বেশি নেই। তাঁরা তাদের প্রাপ্য সম্মান পাচ্ছেন না। যতদিন মানুষের এই মানসিকতা না বদলাচ্ছে এটা চলতেই থাকবে। এই রুচির যে অবনতি হয়েছে সেক্ষেত্রে গানের লিরিক্সও একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। যারা লিরিক্স লেখেন তাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। এইটুকু বাচ্চা যাদের ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ গাওয়ার কথা তাঁরা শিখছে চটুল গান। তাদের অভিভাবকরা আবার সেটির প্রশংসা করে পাড়া-পড়শিকে সেটাই শোনাতে বলছেন। তাই মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি যত্নবান হতে হবে, ভালো সাহিত্য পড়তে হবে। সেইসঙ্গে মানসিকতার বদল চাই। তবেই এই খারাপ দিকগুলো বদলাবে।

একজন শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি আপনার কী দায়িত্ববোধ রয়েছে?

আমার গুরুজি সবসময়েই বলেন, তুমি যা অর্জন করলে সেটা যেন পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে যেতে পারো। ধর্মের নামে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অতি সম্প্রতি আমি একটি প্রতিষ্ঠানে গান শেখার ব্যাপারে কথা বলতে যাই। আমার ড্রেস-আপে কোনও ধার্মিক চিহ্ন ফুটে ওঠে নি। তাই অতিরিক্ত কোনও প্রশ্ন করা হয় নি। তারপর আমার নথিপত্র তাঁরা দেখে বলে ওঠেন, ‘হাফিজা সুলতানা! তা তুমি গানবাজনাটা সিরিয়াসলি করবে তো? নাকি মাঝপথে ছেড়ে দেবে?’ আমার দিদি সঙ্গেই ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন আমার নামটি দেখে কি এটা মনে হচ্ছে? উত্তরে তাঁরা বললেন, তাদের মনে হয়েছে আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি। তাই সিরিয়াসলি গানটা করতে পারবো না, সময় দিতে পারবো না। তখন আমি বললাম যে আমি পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর ছাত্রী, গানের ব্যাপারে আমি যথেষ্টই সতর্ক। আপনাদের সেটা নিয়ে না ভাবলেও চলবে। তখন তাঁরা একেবারেই চুপ করে গেলেন। এরপর তো চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে গেল। কারণ আমাকে তো দেখাতে হবে যে একটা নাম দিয়ে, ধর্ম দিয়ে কখনোই কোনও মানুষকে ডিফাইন করা যায় না। এই যে ধর্মের নামে মানুষে মানুষে দেওয়াল উঠছে, ভালোবাসা খুন হয়ে যাচ্ছে। একজন শিল্পী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে গানকে বেছে নিতে পারেন। তাই আমিও গান গাইবো, আপ্রাণ চেষ্টা করবো ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেওয়ার।

সঙ্গীতকে ঘিরে আপনার স্বপ্ন কী?

একটা সাংঘাতিক বড় জায়গায় গেলাম, খুব নাম হল এটা সবারই স্বপ্ন। এটা যদি স্বপ্ন নয় বলি, তাহলে মিথ্যা বলা হবে। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে চাই। অথচ এমন কিছু গাইবো না যা রুচিতে বাধে। আর চাই, শ্রোতাদের কাছে যেন প্রাপ্য সম্মানটুকু পাই। যাদের গান শেখাবো তাঁরা যেন ভালো মতো তৈরি হয় এবং তাঁরা যেন তাদের শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মকে দিতে পারে। বাবা-মা আমাকে নিয়ে যে যুদ্ধ করছে তাদের মুখে যেন হাসি ফোটাতে পারি।

এছাড়া আমি ক্লাসিক্যাল মিউজিককে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের শ্রোতা অনেকটাই কমে গেছে। আজকাল একঘণ্টা ধরে অনেকেই খেয়াল শোনেন না। যদিও একঘণ্টা ধরে খেয়াল শোনানো আমার লক্ষ্য নয়। আমি চাই ধ্রুপদী সঙ্গীতের হয়ে এমনভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে, যাতে যারা ক্লাসিক্যাল গানের সঙ্গে যুক্ত, তাদেরও মন ছুঁয়ে যাবে। আবার যারা সাধারণ শ্রোতা তাদেরও কোথাও গিয়ে ভালো লাগবে।

 

 

 

 

 

Promotion