মরসুমী ফুল

কীভাবে বাংলার সংস্কৃতিতে জড়িয়ে গেল নতুন বছরের হালখাতার উৎসব?

 

আজ থেকে শুরু বাঙালির নববর্ষ। বসন্ত শেষ হয়ে আজ বৈশাখের প্রথম দিনে পা রাখলাম আমরা। বাঙালির নতুন বছরের সঙ্গেই একটি প্রথা ওতোপ্রোতভাবেই জড়িয়ে রয়েছে। সেটি হল হালখাতা। এই হালখাতার ইতিহাসটা ঠিক কী, এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু বেশ কঠিন। প্রাচীন সাহিত্যে, এমনকী কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশাতেও এর তেমন উল্লেখ পাওয়া যায় না। এমনকি বৈশাখ মাস থেকেই যে বাঙালির নতুন বছরের শুরু, এমনটাও একমত হয়ে বলা যায় না। বিতর্ক রয়েছে বঙ্গাব্দের সূচনাকাল ও স্রষ্টার নাম নিয়েও। স্মার্ত রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বেও এর উল্লেখ অনুপস্থিত। সেখানে বরং ‘পুণ্যাহ’ বা ‘পুণ্য উৎসব’ পালনের কথা খুঁজে পাওয়া যায়। বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের তৃতীয়া তিথিকে ‘অক্ষয় তৃতীয়া’ বলা হয়। সত্যযুগে ওইদিনই নাকি মা গঙ্গা মর্ত্যে নেমে এসেছিলেন। এই পুণ্যতিথির কথা মাথায় রেখে বহু বছর আগে থেকেই দুই বাংলার অনেক জায়গায় ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান চলে আসছে। তবে ইদানীং বৈশাখ মাসের প্রথম দিনেই বেশিরভাগ বণিক মহলে হালখাতা পালিত হয়। তবে এবছর করোনা আতঙ্কে চলছে লকডাউন। তাই পয়লা বৈশাখের থেকেও অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই হালখাতার পালনের দিকে ঝুঁকছেন বেশ কিছু ব্যবসায়ীও।

 

‘হাল’ শব্দের একাধিক অর্থের মধ্যেই দুটি বেশ প্রাসঙ্গিক। একটি হল ‘লাঙ্গল’ এবং অন্যটি ‘নতুন’। যেহেতু বাংলা কৃষিপ্রধান দেশ, এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষির নিবিড় যোগ খুবই স্বাভাবিক। আবার বছরের প্রথম হিসাব বা খাতা খোলার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শব্দটি বেশ অর্থবহ। শোনা যায়, সম্রাট আকবরের রাজস্ব মন্ত্রী টোডরমল সারা বছরের কর-খাজনা আদায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন হিসাবের খাতা খোলার রীতিটি চালু করেছিলেন। পয়লা বৈশাখে ফসলী সনের প্রথম দিনেই তা করা হয়েছিল। চৈত্রের মধ্যেই ধান কলাইসহ বেশিরভাগ ফসল চাষি প্রজাদের ঘরে উঠে যেত। ফলে রাজা বা জমিদারদের পক্ষে খাজনা সংগ্রহ করার আদর্শ সময় ছিল বৈশাখের শুরুর দিনটি। বাংলা জুড়ে হালখাতার জন্য তাই এই সময়টাই সবচেয়ে বেশি মান্যতা পেয়েছিল। বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁও হালখাতার জন্য ওই সময়টিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

হালখাতার দিনে ক্রেতাদের বিশেষভাবে আপ্যায়ন করার রীতিও প্রায় বহু দিনের। দু-তিন দশক আগেও নামী ব্যবসায়ীরা তাঁদের দোকানের সামনে প্যান্ডেল বেঁধে বসে খাওয়ানোর আয়োজন করতেন। পুজোর পর ডেকরেটর ব্যবসার সবচেয়ে রমরমা ছিল এই নববর্ষেই। বেশ কিছু সম্ভ্রান্ত দোকান আবার চিত্র-মঞ্চ-ক্রীড়া-রাজনীতি জগতের সেলিব্রিটিদের হাজির করে আলোচনার কেন্দ্রেও চলে আসত। কলকাতায় বউবাজারের স্বর্ণালঙ্কার ব্যবসায়ী মহল, বড় বাজারের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা এবং পোস্তায় তেল মশলার কারবারিদের এই ব্যাপারে বিশেষ সুখ্যাতি ছিল। এমনকি কলকাতার ময়দান চত্বরেও হালখাতার দিন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কলকাতায় ময়দানের বড় তাঁবুগুলিতে, বিশেষ করে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে বারপুজো বা খুঁটিপুজো হয় এই নতুন বছরের শুরু দিনটিতে। প্রায় এক দশক আগে স্বয়ং ফিফা সভাপতি জোসেফ ব্লাটার মোহনবাগানের হয়ে নতুন খাতা খুলতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।

 

সব মিলিয়ে বর্তমানে পয়লা বৈশাখের হালখাতার প্রথা রীতিমত উঠে যেতে বসেছে। তবুও পয়লা বৈশাখের সংস্কৃতিটি টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কিছু ক্ষুদ্র বাঙালি ব্যবসায়ী। কলকাতার থেকে কিছু দূরে মফঃস্বল শহর গুলিতে আজও রমরমিয়ে হালখাতার উৎসব পালিত হয়। গণেশ, লক্ষ্মী, কালী বা অন্য কোনও গৃহদেবতার পুজো সহ দিনটি উদযাপন করে চলেন বেশ কিছু ব্যবসায়ী। তবে বসিয়ে খাওয়ানোর রীতি উঠে গিয়ে বেশিরভাগটাই ক্রেতার হাতে ঠান্ডা পানীয়ের বোতলের সঙ্গে একটি মিষ্টি বা স্ন্যাকসের প্যাকেট ধরানোতে বন্দি হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া এ বছর লকডাউনের বাজারে যে কোনও জমায়েত নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। লোকজনের ভিড় এড়াতে তাই বহু ব্যবসায়ীই হালখাতার দিন পিছোচ্ছেন। আবার কিছু জন এই দিনই অল্প অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন খাতা পুজো উদযাপন করার পরিকল্পনাও রেখেছেন। এভাবেই টিমটিম করে হলেও কলকাতার বুকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই করে চলেছে বাঙালির নতুন বছরের হালখাতার উৎসব।

কভার ছবি – সপ্তক ব্যানার্জী

Promotion