মরসুমী ফুল

আনন্দের বিশ্ব তোলপাড় করা অনুভবে স্খলিত হোক জিঘাংসার কালো অন্ধকার

একজন সনাতন ভদ্রলোক পরলোকগত হয়েছেন ছয়টি ছেলে সন্তান রেখে। ছয়জনের জন্য একই মাপের সম পরিমাণ জমি ভাগ বাটোয়ারা করে দিয়ে গেছেন তিনি। ছেলেরা সামনে বেশ খানিকটা জায়গা বাগান উঠোনে এসবের জন্য রেখে ঘর তুলে সুখেই বাস করছিলেন। মাঝখানের জমির মালিক মেজ পুত্র ও তার স্ত্রী সন্তানকে রেখে আরও একটি বিয়ে করে জায়গাটি বিক্রি করে চলে গেলেন নতুন সংসার করতে। আর সেই জায়গাটি সরকারি চাকরীর শেষ সম্বল দিয়ে কিনেছিলেন আমার বাবা। সেখানেই দীর্ঘ ২৪ বছর আমার বাবার বসবাস। একপাশে তিন ভাইয়ের বাড়ি আর এক পাশে দুই ভাইয়ের বাড়ি। মাঝখানে আমাদের মুসলিম পরিবার। মা বেশ খানিক উদ্বিগ্ন ছিলেন ওরা কেমনভাবে নেয় আমাদের মতো একটি মুসলিম পরিবারকে। যতোই হোক, নিত্য প্রতিবেশী হতে চলেছি ওদের। এমনকি বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে যে মেইন রোডটি, তারও সামনের বাড়িটিও এক হিন্দু ভদ্রলোকের। মনে পড়ে ছয় ভাইয়ের এক ভাইয়ের ছেলে সনি চক্রবর্তীর বয়স তখন পাঁচ। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন। থাকি বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে। খুব একটা চিনি না পাশের অন্য বাড়ির সকলকে। বিশ্ববিদ্যালয় রমজানের ছুটি হলো। আমি বাড়িতে এলাম। আমাদের বাড়িতে রোজা রাখতে হতো পরিণত বয়সের সকলকে। ইফতার সাজানো হতো ডাইনিং টেবিলে মাথা গুনে। দেখি একটি বেশি প্লেজ সাজানো। আর ঠিক মাগরেবের আজান পড়তে না পড়তেই বাড়িতে এসে হাজির আমার মায়ের সবচেয়ে বড় মেহমান সনি। পরে জানতে জানতে পারলাম প্র্রতিদিন মাগরেবের আজান পড়বার সাথে সাথেই সে ইফতার করতে আমাদের বাড়িতে আসবেই। তারপর থেকে সুখে দুঃখে ‍নানা সময়ে এই পাঁচ ছয়টি হিন্দু পরিবারের সাথে আমাদের সুদীর্ঘ বাস। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে এলে আমার উদভ্রান্ত ঘন কোঁকড়ানো চুলে তেল কিংবা যত্ন করবার একজনই ছিলেন। তিনি হলেন সেই মেজ ছেলের পরিত্যক্ত স্ত্রী। আমরা তাকে ডাকতাম সুন্দরী মাসি বলে। তেলের বিশাল একটি বোতল নিয়ে তিনি বসতেন মেঝেতে। প্রায় স্নান করিয়ে ছাড়তেন তেলে। আমার মাকে তিনি বলতেন, দিদি দেখুন দেখুন ওর চুলের দিকে তাকিয়ে, কেউ বলবে যে মাথায় তেল দেওয়া হয়েছে?

বাড়ির কোনো বিয়েতে এমন হয়নি যেখানে পাশের বাড়ির মাসীরা এসে হলুদ না ছোঁয়ানো পর্যন্ত হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। ছিল আমাদের চিরকালের ধর্মীয় আচার এবং অনুষ্ঠানের হিন্দু-মুসলিমের সহাবস্থান। সত্যিকার অর্থে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা, আমরা মানি যে সারামাস জুড়ে তিরিশটি রোজা রাখার পর উপহার হিসেবে আনন্দের একটি দিন ধার্য করা হয়েছে ঈদের দিন হিসেবে। কিন্তু এই আনন্দে সকলের সামিল হতে কোনো বাঁধা নেই। বাবা বলতেন “রোজা রাখ আর নাই রাখ ইফতার সকলের। একসাথে ইফতার করার আনন্দ আলাদা।” আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও রোজার মাসে মৈত্রী হলের সামনের বিস্তৃত খোলা মাঠে বসে কিংবা টি এস সির লনে বসে ছোলা-বুট পেঁয়াজের সঙ্গে ভেদাভেদ ভুলে বন্ধুদের নিয়ে আমার কত যে ইফতার করার স্মৃতি রয়েছে! এগুলি ভেবে আজও একাকী নিঃসঙ্গে চোখে জল আসে। আমাদের বাড়িতে খুব ধর্মীয় আচার আচরণ শিখতে হয়েছে ছয় ভাইবোনকেই। পরিণত বয়সের সকলকে নামাজ এবং রোজা রাখতে হয়েছে বরাবর। কিন্তু কখনো দেখিনি আমাদের বাড়িতে কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের আসা যাওয়া বা খাওয়াতে কোনো বিধি নিষেধ। এমনকি আমার ছোট খালার একশো বছরের পুরোনো জমিদার বাড়িতে তো দেখেছি কুরবানির ঈদে খালাত ভাইয়ের সনাতন বন্ধুদের ভিড়। তারা খালার হাতের রান্না খেতেন। খালার বাড়ির প্রায় ১২/১৪ টি ভাড়াটের বেশির ভাগই হিন্দু। তাদের দুর্গা কি কালী পুজোয় বিশাল মণ্ডপে দেবীর অধিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতেন। আমি সেই লালমাইয়ের পায়ের কাছে থেকে মায়ের সঙ্গে আসতাম ময়মনসিংহ শহরের আমলা পাড়ায় ছোট খালার বাড়িতে। গুটি গুটি পায়ে দেবীর আশে পাশে ঘুরঘুর করতাম। দুর্গার দশ হাত আর তার মায়াময় দু’চোখে মু্গ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ছোট ছোট পায়ে কালীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর তার পায়ের নিচে শিবের শায়িত দেহ দেখে মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম “কেন মা? কী হয়েছিল? কালীর পায়ের নিচে কেন শিব শুয়ে?” মা বলতেন, “কালী নরমুণ্ড হাতে পাগল প্রায় হয়ে যখন দিগ্বিদিক ছুটে চলেছেন তার এই অস্থির প্রলয়ঙ্করী দুর্দমনীয় অবস্থায় যখন কেউই তাকে থামাতে পারছেন না। তখন তাকে থামাতে পথের পরে এসে শুয়ে পড়েছিলেন তার স্বামী শিব। হঠাৎ তার বুকের উপর পারা দিয়েতেই কালি দেখতে পান স্বামীর বুকে পা দিয়ে দিয়েছেন। তখনই লজ্জা এবং অপরাধবোধে তিনি জিভ বের করে ফেলেন।”

এরপর আমার আরও আরও কত কত প্রশ্নের উত্তর মায়ের সব জানা। সে প্রসঙ্গে আজ আর নেই। আমার ছোট মনে মা এভাবেই কালী আর শিবের রূপ আর চরিত্র নির্মাণ করেন। তাই আমার কাছে সকল আনন্দই মানুষের আলাদা করে কোনো ধর্মাবলম্বীর নয়। ধর্মাচরণটা একেবারেই ব্যক্তিগত। তাই আজ রোজার ঈদের এইক্ষণে দুই বাংলার সকল মানুষের সাথে ভাগ করে নিতে চাই আমার আনন্দ। এছাড়াও হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান আরও যারা আছেন গোটা বিশ্বে, তাদের সকলকেই জানাই শুভেচ্ছা। মানুষে মানুষে আনন্দের বিশ্বতোলপাড় করা এক অনুভব আর তার স্বাচ্ছন্দ্য। আন্তরিক প্রকাশই পারে আজকের এই উত্তপ্ত উন্মত্ত পৃথিবীকে সকল হানাহানি আর জিঘাংসার হাত থেকে রক্ষা করতে।

Promotion