বিশেষ অবশেষ

এই সময়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষা কি পণ্য হয়ে উঠেছে? কী জানালেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা?

শিক্ষা হল একটি দেশ গড়ার মন্ত্র, সমাজ তৈরির সোপান। তাই শিক্ষককে বলা হয় সমাজ তৈরির কারিগর। এই শিক্ষকরাই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন পড়ুয়াদের। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে কিছুদিন আগে পর্যন্ত বলা হত মানুষ তৈরির কারখানা। যদিও সাম্প্রতিক কালে বদলেছে সেই চিত্র। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান আজ ছাত্রকে দেখে কাস্টোমার বা গ্রাহক হিসেবে। শিক্ষার নামে কদর্য ব্যবসা খোদ এ রাজ্যেই মালদা জিকেসিআইটির মতো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পড়ুয়াদের জীবন গড়ার স্বপ্নকে খুন করেছে। তাই প্রশ্ন ওঠে, “এই সময়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষা কি পণ্য হয়ে উঠেছে?” এর উত্তরে প্রতিক্রিয়া দিলেন দুই বাংলার চেনা-অচেনা শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

 


শাপলা সপর্যিতা, কথা সাহিত্যিক এবং শিক্ষিকা, বাংলাদেশ – নির্দিষ্ট শব্দের উপর চন্দ্রবিন্দু না দিলে নম্বর কাটা যাবে না করে বিস্তর তর্ক হতো আমার ম্যাপললিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সুপারভাইজারের সাথে। চারটে বানান ভুল হলে পয়েন্ট ফাইভ নম্বর কাটতে গিয়ে খাতা দেখার সময় মনে হতো বাংলা নয় বরং গণিতের চর্চাই বেশি করা দরকার। বাংলা বিষয়ের কোনো অধ্যায়ের কোনো বিষয় বোঝানোর উপায় ছিল না সেখানে। আর প্রশ্নের নোটস বাংলা শিক্ষকদের করে দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। কারা কোথা থেকে নোট করে পাঠাচ্ছেন তাও অস্পষ্ট শিক্ষকদের কাছে। বোর্ডে লিখে দিলে ছাত্রছাত্রীরা সেগুলো নিজের খাতায় তুলতে তুলতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট শেষ। শ্রেণি অনুযায়ী নির্দিষ্ট বয়সের চেয়ে বেশি বয়সের ছেলেমেয়েরা ছিল ইঁচড়ে পাকা। লেডি শিক্ষকদের নিয়ে নানা কথা তারা এখানে সেখানে লিখে রাখতো। আর সেগুলো তাদের অন্যান্য বন্ধুরা এসে জানাতো। লম্বা দাঁড়ি আলখাল্লা পরিহিত দরবেশ আউটলুকের সুপারভাইজার সেই ছাত্রকে ক্ষমা করে মুচকি হেসে বিরক্ত শিক্ষিকাকে বলতেন, “আপনি কেন বিরক্ত হচ্ছেন। নাইন টেনের মেয়েরা তো আমার কথা লেখে আই লাভ মিষ্টার অমুক’ আমার তো ভালোই লাগে।” আর দিন শেষে আমাকে যেদিন বলা হলো, “ছোট ক্লাস, ছেড়ে দিন। বানান ভুল নিয়ে এতো ভাববার কিছু নেই। এতো চাপ ছোট ক্লাসে না দেওয়াই ভালো।” আমি বললাম, “ছোট ক্লাসেই যদি না শেখে তাহলে বড় হলে ভুল তো বাড়তেই থাকবে।” তখন আমাকে বলা হলো, “শুধু একটি কথাই মনে মনে রাখা ভালো, “Student, the most important customer.” দেশের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে আদি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা এটি।

তার আগে একটি বাংলা মাধ্যম স্কুলের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সময় স্বয়ং প্রিন্সিপাল সাহেব খাতা ধরিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘দেখুন, একে পাশ করাতে হবে। না হলে আমার একটি ছাত্র ছুটে যাবে।’ শিক্ষক হিসেবে যে কোনো স্কুলে পড়ানোর অভিজ্ঞতা এরকম হয় তখন আমার একটি কথাই মনে হয়। শিক্ষা আসলেই এই সময়ে পণ্য হয়ে উঠেছে।

 

গর্গ চ্যাটার্জী, অধ্যাপক এবং রাজনীতিবিদ, ভারত – যে রাষ্ট্রে “শিক্ষক দিবস” পালিত হয় এক জালিয়াতের নামে। যে এক বাঙালী ছাত্রকে বঞ্চিত করে তার কাজকর্ম ও গবেষণা নিজের বলে চালিয়েছে নাম কামানোর জন্য। সেখানে শিক্ষা যে পণ্য হবে, এ তো স্বাভাবিক। শিক্ষা পণ্য হলে শুধু ক্রয়ক্ষমতা আছে যার, তারই হয়। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষাকে প্রকটভাবে পণ্য বানাতে উদগ্রীব। আমাদের বাঙালী হিসাবে দেখতে হবে যে আমরা যেন এই বাংলায় সরকারি শিক্ষা ক্ষেত্রের ব্যাপ্তি নিয়ে বাংলার সরকারকে চাপে রাখতে পারি। আবার একই সঙ্গে এখানে রাজ্য সরকারি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য রাজ্যের দখলদারি আটকাই। বিহার-ইউপি বাংলার রাজ্য সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওদের ভোগের পণ্য মনে করে। একজন অসৎ টুকলিবাজকে নিজেদের শিক্ষক দিবসের আইকন মনে করে। রাধা নয়, কৃষ্ণ নয়, বাংলা ও বাঙালির জাতীয় শিক্ষক বিদ্যাসাগর। ‌

 

কোয়েল গাঙ্গুলী , শিক্ষিকা, ভারত – আমি একাধারে গৃহশিক্ষিকা, পাশাপাশি একটি সরকারি স্কুলে পার্ট টাইম করি। প্রাইভেট টিউশনের কিছুক্ষেত্রে আমাদের হাত পা একপ্রকার বাঁধা। যেখানে আমরা শুধুমাত্র সিলেবাসটুকুই বা স্কুলে যতটুকু বলা হয়  সেটুকুই পড়াতে পারি। কারণ অভিভাবকরা প্রতি ক্লাস হিসেবে সাম্মানিক দেন, বাইরের কিছু শেখানোতে তাদের প্রবল আপত্তি। সেখানে যোগ্যতা বা শেখানোর নিরিখে বিচার প্রায় হয় না বললেই চলে। যে গৃহশিক্ষক/গৃহশিক্ষিকা যতো দর হাঁকবেন তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ততো বেশি। শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি কিছু কোচিং সেন্টারে ছাত্রছাত্রীদের রীতিমতো ‘ক্লায়েন্ট’ হিসেবে দেখা হয়। আমায় এক প্রাইভেট স্কুলের ইন্টারভিউতে বলা হয়েছিল যত স্টুডেন্ট আনতে পারা যাবে ওই স্কুলে, তত ‘কমিশন’ দেওয়া হবে। পরে সেই স্কুলের নার্সারিতে ভর্তির খরচ শুনে প্রায় আঁতকে উঠি। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষা পণ্যই হয়েই দাঁড়ায়। কিন্তু পাশাপাশি এও বলবো যে সরকারি স্কুলের সঙ্গে আমি এখন যুক্ত তার পরিবেশ অত্যন্ত ভালো। মাত্র এই ক’দিনেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আমার হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাদের সান্নিধ্যে আমি “শিক্ষা মাত্রই পণ্য” এই ছোঁয়াচ একটুও পাই না।

 

কৌশিক চক্রবর্তী, স্বাধীন বাংলা সঙ্গীত শিল্পী তথা সঙ্গীত শিক্ষক, ভারত – “এই সময়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষা কি পণ্য হয়ে উঠেছে?” এটি দুই ভাবে বিচার করা যেতে পারে। এক আমি যদি ছাত্র হই। দুই আমি যদি শিক্ষক হই। এক্ষেত্রে আমি মনে করি আমি ছাত্র এবং শিক্ষক দুটিই। আমার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অন্যরকম। ছোটবেলা গুরুর কাছে শিখেছি, আমি এখনও শিখছি প্রতিনিয়ত নানা মানুষের কাছে। এখানে ‘গুরুদক্ষিণা’ বলে একটি শব্দ রয়েছে যেটি আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ। একেক জন একেক রকম ভাবে গুরুদক্ষিণা দেয়। কিন্তু আমি আমার শৈশব থেকে দেখছি মূলতঃ অর্থের বিনিময় সেই গুরুদক্ষিণা শিক্ষক অথবা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হচ্ছে। যদিও শিক্ষা বা সাধনার কোনও মূল্য হয়না।

“এই সময়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষা কি পণ্য হয়ে উঠেছে?” এই প্রশ্নটি আমি নাকচ করবো, কারণ সেরকম কোনও অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। আমার ছেলেও সেই শিক্ষা-ব্যবস্থায় ঢুকে গিয়েছে, সেক্ষেত্রেও সেরকম কিছু মনে হয় নি। ওভাবে বললে, পণ্য তো সবকিছুই। গান থেকে শুরু করে শিক্ষা সবই তো একটা সময়ে বিক্রি হয়। কিছু কিছু সম্পর্ক ছাড়া সবই পণ্য। তাই ‘পণ্য’ বলে শিক্ষাকে ছোট করবো না। আমি নিজেও শিখেছি এবং বর্তমানে শেখাই। যে সামান্য অর্থের বিনিময়ে শেখাই, সেই সময়টি, সেই শিক্ষাটি, সেই সম্পর্কটি এসব পণ্য-অপণ্যের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে। তাই শিক্ষাব্যবস্থা আমার কাছে পণ্য নয়, কারণ তাকে আমি সেই ছোট চোখে দেখি না।

 

মনিকা সরকার বিশ্বাস, শিক্ষিকা, ভারত – প্রকৃত শিক্ষা কোনো কালেই সার্বিক ছিল না। প্রাচীনকালের শম্বুক একলব্যর মতো আজও হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা বুঝতে পারছে তা। টিভি সিনেমার পর্দায় যখন গাড়ি,বাড়ি, ক্রিম বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি অমুক প্রতিষ্ঠান এবং তমুক প্রকাশনী পড়ে ফার্স্ট হয়েছে বলে বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠে। তখন তো তাই-ই মনেই হয় । যত্রতত্র প্লাস্টিক পড়ে থাকার মতো নার্সারি আর কেজি স্কুল গজিয়ে যাচ্ছে। অথচ সমস্ত ব্যবস্থা থেকেও ছাত্র অভাবে ধুকছে সরকারি স্কুল। যদিও সরকারি চাকরি পেলেই ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মরতরা কিন্তু দৌড় দেয়। শিক্ষা আত্মিক না হয়ে পণ্য হওয়ার কম বেশি উদাহরণ তো দিকে দিকেই। ছাত্র-শিক্ষক আবেগের বন্ধন অনেক ক্ষেত্রেই শিথিল। অভিভাবকরা এরপর প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে গেলে সেটাও স্বাভাবিক হবে। ব্যক্তিগতভাবে কিন্তু কিছু নৈতিক দায়বদ্ধতা পালন করে শিক্ষক সমাজের একাংশ। আসুন না, সবাই একটু উল্টো স্রোতে হেঁটে দেখি। খারাপ তো লাগবে না আশা করি।

 

অরুণ রায়, শিক্ষক ও বাঁশিবাদক, বাংলাদেশ – কেউ কেউ বলেন শিক্ষকতা হলো একটি থ্যাংকলেস জব, কেউ বা বলে সম্মানজনক পেশা। আর কেউ বলে অর্থ উপার্জনের উর্বর শষ্যক্ষেত্র। শিক্ষাজীবনে রাষ্ট্র আর সমাজের মুনাফাবিহীন বিনিয়োগ ছাড়া, শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন একেবারে অসম্ভব ছিল। সে উপলব্ধি এবং দায়বদ্ধতা থেকেই আমিও অন্য অনেকের মতো শিক্ষাকে সার্বিক কল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করি। আমি বিশ্বাস করি শিক্ষা একটি শিল্প আর শিল্প কখনো পণ্য হতে পারে না। অনেকেই শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে ভাবতে চান। তারা মূলত শিক্ষার প্রসার এবং মান বাড়ানোর জন্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার বদলে বাজারের প্রতিযোগিতা, বেসরকারি ব্যবস্থাপনা এবং বেসরকারিকরণের পক্ষেই সাফাই গেয়ে থাকেন।

আমার শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটেছিল একটি প্রত্যন্ত গ্রামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনেককেই আজও আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। সবকিছুতেই ‘আমার কী লাভ’, এ চিন্তা তখনও আধিপত্য তৈরি করতে পারেনি। এখনকার নব্য-ব্যবসাবাদের যে সময় আমরা পার করছি, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের বিষয়টা সে রকম ছিল না। অথচ রাষ্ট্র ও সমাজের পৃষ্ঠপোষকতায় আজকে যাদের অনেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, আমলা হয়েছেন, রাজনীতিবিদ হয়েছেন। শিক্ষক হয়ে নিজের শ্রেণীর উত্তরণ ঘটিয়েছেন, তারাই শিক্ষাকে বাজারকেন্দ্রিক দর্শন দ্বারা পরিচালনার ব্যাপারে মহা আগ্রহী। কিন্তু আমি এই ধরণের পণ্যায়নে বিশ্বাস রাখি না। এখন শুধু প্রয়োজন নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরে ওঠার পথটি আরও সহজ করে দেওয়া।

 

২০১৮-তে মানুষ গড়ার কারিগররা কী বলেছিলেন দেখুন!

Promotion