দুই বাংলার পুজো পরিক্রমা ২০১৯

দুই বাংলাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে কী বললেন সেই চেনা-অচেনা মুখেরা?

চিত্র গ্রাফিক্স – SMP Photostory Creator

তাপস বাপি দাস (মহীনের ঘোড়াগুলির ব্যান্ড সদস্য) – দুর্গা পুজোর সংজ্ঞা একেক বয়েসে একেক জনের কাছে আলাদা ভাবে ধরা দেয়। কেউ ভাবেন পুজো এলে তার বকেয়া টাকা উদ্ধার হবে। কেউ আবার ভাবে পুজো এলে অমুক জিন্স-জামা বা অমুক শাড়িটি কিনতে হবে। কিন্তু আসলে ওসব নয়; ফুটেছে কাশফুল, একটাই শরৎ এপার বাংলা, ওপার বাংলায়। একই পেঁজা তুলোর সভা সমাবেশ দুই প্রান্তে। আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ধর্ম,জাতপাত নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য। আসুন নিজস্ব রঙে রাঙিয়ে দিই উৎসবের এই কটা দিন।

একবার টাকির ইছামতী নদীতে দেখেছিলাম বিসর্জন, এপার এবং ওপার বাংলার। মাঝ নদীতে কোন নৌকা কোন বাংলার কিছুই বোঝা যাচ্ছিলো না। অন্ধকার হয়ে এসেছিল। তাই এপার-ওপার বাংলা বলতে অস্বস্তিই হয়। আসলে শারদোৎসব একটাই, যেটি সাড়া পৃথিবী জুড়েই শরৎ কালেই হয়ে থাকে। আরও একবার সবাইকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। সবাইকে অনুরোধ উৎসবের মাত্র এই কটি দিন আমরা যেন সব ভুলে আনন্দে ভরিয়ে তুলি।

 

রঞ্জনা বিশ্বাস (কবি ও গবেষক, বাংলাদেশ) – প্রাচীন বাংলার অধিবাসীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দূর্গা পুজা। পৌরাণিক দেবমণ্ডলীর শীর্ষে অবস্থানকারী দেবী দুর্গার আধিপত্য প্রাগ-বৈদিক ধর্মের উত্তরাধিকার। বর্তমান বিশ্বাস আমার যাই হোক; নারীর শক্তি, সামর্থ্য ও যোগ্যতার প্রামাণ্য প্রতিমূর্তি হিসেবেই দেবী দুর্গাকেই আমি আদর্শ জ্ঞান করি। সকল প্রকার দৈত্যের বিনাশ, রোগ, বাধা, পাপ ও শত্রু বিনাশকারী মাতৃদেবী হিসেবে তিনি আদৃত ও পুজিত হন। আমরাও এই দিনে সকল বাধা অতিক্রম করে, পাপ চিন্তা নাশ করে হয়ে উঠতে চাই সুন্দরের পূজারী। ভারত ও বাংলাদেশের সকল বাঙালি এক বিশেষ সংস্কৃতির মানুষ, যাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য একটি সূত্রে গাঁথা। তাই উভয় দেশের সকল বাঙালিকে জানাই শারদীয় দুর্গা পুজোর শুভেচ্ছা। জয় হোক সুন্দরের, নাশ হোক সকল অশুভ আর অসুন্দর।

 

সিধু (বাংলা স্বাধীন সঙ্গীতশিল্পী, ক্যাকটাস) – বাঙালির হৃদয়ে পুজো এতোটাই জায়গা জুড়ে থাকে যে তা কোন ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক ব্যবধান মানে না। ভারতের নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি, বিদেশে থাকা বাঙালি এবং বাংলাদেশে থাকা বাঙালি একই আনন্দে পুজো উদযাপন করে। সেই ভ্রাতৃত্ববোধ জেগে থাকুক। আমাদের নিজেদের মধ্যে অনেক সময় বোঝাপড়ার অভাব থাকে। উৎসবের আনন্দে সেই সব ভুল বোঝাবুঝি মুছে যাক।

 

অরুণ কুমার চক্রবর্তী (কবি, গায়ক ও পরিবেশ-আন্দোলন কর্মী) – আসলে দুর্গা পুজো মানে বিশ্বসংসারের পুজো। দেবদেবীরা মানবায়িত রূপে, তাদের বাহনেরা প্রাণী রূপে, নবপত্রিকা ঔষধি উদ্ভিদ রূপে পূজিত হয়ে থাকে। আর আমাদের প্রিয় পৃথিবী বা বিশ্বসংসার, মনুষ্য জগৎ, প্রাণী জগৎ ও উদ্ভিদ জগৎ এই তিন জগতেই মায়ের অধিষ্ঠান। এই দেবদেবীর গঠনে রয়েছে জড় পদার্থ অর্থাৎ সবটাই পূজিত হচ্ছে। তার মানে বিশ্বসংসারেরই পুজো। আমাদের সবার সংসারই পূজনীয়। দুর্গা আমাদের এই শিক্ষায় দেন, আমাদের পূজনীয় সংসারে শান্তি আর সম্প্রীতি বজায় থাকুক। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাই।

 

অরিজিৎ বিশ্বাস (স্বাধীন সঙ্গীতশিল্পী) – আমি স্বঘোষিত নাস্তিক। আমার কাছে ধর্মীয় আচার-আচরণের থেকেও বেশী গুরুত্বপূর্ণ মানুষ কতখানি স্বাধীন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিচ্ছে। সেদিক থেকে শারদোৎসব যে সেরা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিজে স্বাধীন ও মৌলিক বাংলা গান নিয়ে চর্চা করি বলে, দেশ-কাল-স্থান-পাত্র এসবে আমার অনীহা আছে। তাই এপার বা ওপার বাংলার সকল বাঙালি বা প্রবাসী বাঙালি – সকলকে সমানভাবে জানাই শারদীয়ার আগাম শুভেচ্ছা। ভালবাসা অপার।

 

অরিত্র ভট্টাচার্য (পুরোহিত) – দুর্গা পূজো অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির বিজয় লাভ। মায়ের পূজোর দ্বারা আমরা প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে শান্তি, প্রীতি ও সুখ প্রার্থনা করবো। আমি চাই প্রতিটি মানুষ এই পুজোয় সম্মিলিত হোক। মায়ের আশীর্বাদ যেন সকলের ওপর বর্ষিত হয়। সকলে যেন ভালো থাকে, সুস্থ থাকে। সেই সঙ্গে আপনাদেরও শুভেচ্ছা, সমাজের সব স্তরের মানুষের বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াসটিও সুন্দর। মা আপনাদেরও শক্তি দিন।
মৌলানা মহম্মদ শফিক কাজমি (শাহী ইমাম, নাখোদা মসজিদ) – দুর্গা পুজো পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের সব থেকে বড় উৎসব। এই বাংলার ঐতিহ্যই হল বিপদে প্রতিবেশীর পাশে থাকা, সাহায্য করা। বাংলার তামাম জনতার উৎসব এটি। তাই মানুষ যখন ঠাকুর দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, সেই সময় অন্ততঃ তাকে জল দিয়ে সাহায্য করার আবেদন জানিয়েছি আমার ভাইদের। আমার তরফ থেকে সমাজের প্রতিটি ধর্ম-বর্ণ-জাতির মানুষকে পূজোর শুভেচ্ছা।
তন্বী দাস (বিশিষ্ট গ্রাফিক ডিজাইনার ) –  আমরা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে শরতের আকাশ ভাগ করতে পারিনা। পারিনা কাশফুলের মাথা ছুঁয়ে যাওয়া হাওয়াকে দেশের সীমানার মধ্যে ধরে রাখতে। শিউলি ওপারের হাওয়াকেও সুবাসিত করে। ওপারের ঢাকে কাঠি পড়লে, এপারে পুজোর গন্ধ ভেসে বেড়ায়। তাহলে যে শারদীয়ায়, এপার আর ওপার বাংলার আপামর বাঙালি একই খুশীর উদ্বেলে মেতে ওঠে তাকে দেশ গণ্ডির পরিসীমায় বেঁধে রাখার সাধ্যি কার! দুর্গাপুজো বাঙালির উৎসব, সম্প্রীতির উৎসব। দুই বাংলার মনের মেলবন্ধন একেই ঘিরে, ইছামতীর জলে তার সাক্ষ্য বহমান। গঙ্গা-পদ্মা পার করে এ শুধু বাঙালির ঐতিহ্য, বাঙালির অহঙ্কার।

 

 

 

 

Promotion