দুই বাংলার পুজো পরিক্রমা ২০১৯

আন্দুলের দত্ত চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো

হাওড়া জেলার অন্যতম প্রাচীন এই বনেদি পরিবার। জমিদার রামশরণ দত্তচৌধুরী এই পরিবারে প্রথম দুর্গোৎসব শুরু করেন ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে। পুজোর স্থানটি সেই প্রাসাদের আশেপাশেই কোথাও একটা ছিল। খুব সম্ভবতঃ সেটি ছিল মহিয়াড়ী অঞ্চল যা পুরোনো আন্দুলের মধ্যেই অবস্থান করতো। রামশরণের সময়ের দেবী প্রতিমা ছিল মাটির তৈরী। ঘোড়া আকৃতি সিংহ-সহ মহিষমর্দিনী (সিংহবাহিনী) যা খড়ের আটচালাতে পুজো হত। ছিল পাঁঠাবলির প্রচলনও। পারিবারিক কারণে শাহজাহানের কাছ থেকে ১৬২৪ সালে আন্দুলে তাঁদের পৈতৃক জমিদারির কিছু অংশ পুনরাধিকার করেন কাশীশ্বর দত্তচৌধুরী। নির্মিত হয় এক বিশাল অট্টালিকা এবং পাকা দুর্গা দালান যেখানে সেই দুর্গাপুজো বজায় রাখা হয়। পরবর্তীকালে পরিবারের নামেই সাঁকরাইল থানা অন্তর্ভুক্ত আন্দুল-মৌজার আন্দুল গ্রামের সেই এলাকাটির নাম হয় ‘চৌধুরী পাড়া’। কাশীশ্বর দত্ত চৌধুরীর তৈরি ‘চৌধুরী দুর্গাদালান’ আনুমানিক ১৯২৯ সালে ভেঙে পড়ে। পরিবারের তৎকালীন উত্তরসূরিরা পরের বছরেই পাঁচ-খিলান ও দু’দালান বিশিষ্ট দুর্গা দালান নির্মাণ করে দেন।

বর্তমানে পুজো হয় বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ মতানুসারে। কাঠামো পুজো হয় জন্মাষ্টমীর দিন। বোধন হয় কৃষ্ণনবমী তিথিতে আর শেষ হয় দুর্গা নবমীতে। অর্থাৎ দেবী চণ্ডির কল্পারম্ভ ও ঘট বসে যায় পুজোর ঠিক বারো দিন আগে থেকেই। পরিবারের অবিবাহিতা মেয়েদের দেবীপক্ষ পরলে হাতে শাঁখা পরতে হয়, নোয়া পরায় থাকে নিষেধাজ্ঞা। পুরীর লম্বা জিবে গজা দেবীর প্রসাদের মধ্যে অন্যতম। দেবীর উদ্দেশে তিন দিনই অন্নভোগ দেওয়া হয় এখানে। পুরনো ঐতিহ্য মেনে এখনও বাড়ির সদস্যদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণের সময় “বাবা, রামশরণের কড়াই ধর” বলার রীতি আছে। অষ্টমীর দিনে কালো প্রদীপের আরতি এ পরিবারের বিশেষ রীতি। পাঁঠাবলি বন্ধ হয়েছে বহু আগেই। তার জায়গায় নবমীর দিন এসেছে আঁখ ও চালকুমড়ো বলি। এছারাও হয় চালের পিটুলি দিয়ে মানুষাকৃতি তৈরী করে হয় ‘শত্রু বলি’। তান্ত্রিক আচার মেনে হয়ে থাকে একই সঙ্গে ব্রাহ্মণ এবং অব্রাহ্মণ কুমারী পুজো।

বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় বাড়ির গিন্নিরা দেবীকে কনকাঞ্জলি দিয়ে থাকে। আন্দুলের পাশের ঝোড়হাট গ্রামের রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকেরা দেবীকে কাঁধে করে শোভাযাত্রার করে নিয়ে যায় আন্দুলের দুলেপাড়ায়। যদিও এই শোভাযাত্রায় দত্তচৌধুরী পরিবারের কোনো মহিলাদের অংশগ্রহণের নিয়ম নেই। দুলেপাড়াতে দুলে উপজাতির বউরা মা-কে বরণ করার পর পুনরায় দেবীকে শোভাযাত্রা করে চৌধুরী পাড়ায় নিয়ে আসা হয়। ঠাকুর দালানের কাছে পুকুরেই প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। আগে সরস্বতী নদীর তীরে পরিবারের নিজস্ব ঘাট ছিল, সেখানেই প্রতিমা বিসর্জন হত।

 

চিত্র ঋণ – ধ্রুব দত্ত চৌধুরী

Promotion