মরসুমী ফুল

রঙ খেলো, সকল আনন্দই পূণ্য সব কলুষতাই পাপ

আমার ক্রিয়েটিভ রাইটিং কিংবা বাংলা সাহিত্যের ক্লাসে ছাত্র ছাত্রীরা ভীষন আনন্দের সঙ্গে কাজ করে। তারা যা যা বলবার জায়গা পায়না, যা যা জানবার জায়গা পায় না তা সবই আমার কাছে বলতে চায়। আমার কাছেই জানতে চায়। হঠাৎ আজই প্রত্যয় জানতে চাইল – আপু, আমি কি রং খেলতে পারবো? দোলের দিনে? আমি বললাম রং তো খেলো তুমি প্রায়ই। ছবি আঁক, চোখে কাজল দাও, ঠোঁটৈ লিপস্টিক দাও। আমিও রং বে-রঙের টিপ দেই কপালে। রাজেশ্বরীও ছবি আঁকে। সারাদিনই তো আমরা নিজেকে রঙে সাজাই। সারাদিন রঙে একাকার আমার ঘরবাড়ি। তাহলে দোলের দিন রঙ খেললে দোষ কোথায়?

 

চিত্র ঋণ – SMP Photostory Creator

 

এই প্রশ্ন দিয়েই এবার শুরু হলো আমার, আমার বাংলাদেশে হোলির আয়োজন, তার রেশ। এ এক দারুণ পূর্ণিমা। ব্যক্তিগতভাবে এই পূর্ণিমার রাতে আমি ভীষন রোমাঞ্চিত হই। আমার ঘরের জানালা খুলে দিলে পূর্ণ আকাশ যেন ঢুকে পড়ে তার চাঁদ নিয়ে আমার পুরোটা ঘর জুড়ে। আজও চাঁদে লেগেছে পূর্ণিমার জোয়ার। ফাগুণের এই পূণ্য তিথি। যে রাতে জন্মেছিলেন চৈতন্যদেব। যৌবনে শ্রীকৃষ্ণ জোৎস্নায় স্নাত পৃথিবীর কোনো এক আনন্দযজ্ঞে রাধার সাথে খেলেছিলেন আবিরের রঙে, এই দিনেই। তাতেই কি অশুচি হয়ে পড়লো আজ দোল আমার জন্য? প্রত্যয়ের জন্য? কিংবা পৃথিবীর যে কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য! একেবারেই তা নয়। আমি প্রত্যয়কে বলেছিলাম – “হ্যাঁ, তুমি খেলতে পারবে। তোমার মনে যদি আনন্দ হয় তবে তুমি খেলবে। যেভাবে খুশি রং খেলবে। যাকে খুশি রাঙাবে।” পৃথিবীর সকল আনন্দই পূণ্য। সকল কলুষতাই পাপ। শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রং কালো ছিল বলে তার খুব দুঃখ ছিল। একদিন তাই তিনি রঙে রঙে সাজিয়েছিলেন নিজেকে। রাধার সঙ্গে খেলেছিলেন তিনি রঙের এই খেলা। তাই থেকে দোল পূর্ণিমা তিথিতে লোকে রং খেলে। আর ফাল্গুন-চৈত্র এই দু’মাসে ফুলে পাখিতে বনে বিজনে যেমন সেজে ওঠে, তেমনই মানুষের মনেও রং লাগে, বসন্ত আসে দিকে দিকে। বাংলাদেশে তাই ফাগুন আর দোল মিলে মিশে এক হয়ে যায়। একসময় এই দিনে রঙিন শাড়ি পরে চুলে নানা রঙের ফুল দিয়ে নারীরা সাজায় নিজেদের। পুরুষেরাও রং বে-রঙের পাঞ্জাবী পরে আনন্দ করে ঘুরে বেড়াতো বা বেড়ায় সখীদের নিয়ে। ভগবান কি মানুষ, হিন্দু কি মুসলিম, ভারত কি বাংলাদেশে; এই বসন্তদিনে সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়।

চিত্র ঋণ – SMP Photostory Creator

একসময় হোলির রং তৈরী হতো প্রাকৃতিক উপায়ে। ফুলের পাপড়ি ডাল রেনু পাতা ফল নানা কিছু দিয়ে তৈরী হয় এই রং। হলুদ গাদা থেকে হলুদ রং, লাল জবা থেকে আবির, অপরাজিতার পাপড়িতে নীল, মেহেন্দি পাতা থেকে সবুজ, আমলকী থেকে খয়েরী এভাবে যে রং তৈরী করা হতো তা কেবল আনন্দযজ্ঞে প্রলয় তুলতো তা নয়। বসন্তের শুরুতে বাতাসে বাতাসে যে নানারোগের জীবাণু ভেসে বেড়াতো তাকেও নিশ্চিহ্ন করতো এই রং। আজকাল রঙে ব্যবহৃত হয় রাসায়নিক। এই হোলির জন্য পুরোনো ঢাকার একমাত্র শাখারী বাজারেই প্রায় লক্ষাধিক টাকার রং বিক্রি হয়। বিক্রি হয় ওয়াটার গানও। রং খেলার মাধ্যমে আনন্দের যে জোয়ার আর ভালোবাসার এই দুর্দান্ত আদান প্রদান হয় তা বিস্ময়কর। বাংলাদেশে অনেকেই হয়তো নিজেরা সরাসরি এই রঙের খেলায় অংশ নেন না। তবু জানালায় দাঁড়িয়ে, বাড়ির ছাদে উঠে নানাভাবে রঙিন করে তোলার চেষ্টায় তাদেরও কমতি থাকেনা। আগের দিন হোলিকা দহনের মাধ্যমে সকল অশুভ শক্তির বিনাশের লক্ষ্যে পরদিন যে দোলযাত্রা কিংবা হোলিখেলার আয়োজন তা আজ মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান নির্বিশেষে এক প্রাণের মেলা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রাণের মেলা – ভালোবাসার বন্ধন ছড়িয়ে যাক, ছড়িয়ে থাকুক আর সকল চেতনার উর্ধ্বে উঠে মানুষের মনে। ধ্বনিত হোক আনন্দের শুভ বার্তা দেশ-কাল-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষে মানুষে। বসন্তের এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সকল সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই রঙিন অভিবাদন।

Promotion