মরসুমী ফুল

ঢাকের বাজনা কি আসলে ঢাকিদের অজানা জীবনযুদ্ধেরই সুর?

 

শরতের আকাশে বাতাসে এখন পুজো পুজো গন্ধ। গ্রাম বাংলায় শস্য শ্যামল ক্ষেতে, কাশবনে, পুঞ্জিভূত মেঘে বাজছে আগমনীর সুর। উমা আসছেন বাপের বাড়ি। বিদেশ-বিভূঁইয়ে থাকা আত্মীয়-পরিজনরা সকলেই আসছেন তাদের আপনজনের কাছে। আর পুজো মানেই ঢাকের বোল, পুজো মানেই বাদ্যি কাঁসর-ঘন্টা। অন্তরা চৌধুরীর গাওয়া একটি গান মনে পড়ে যায়। “আয়রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে, ঢ্যাং কুর কুর ঢ্যাং কুরা কুর বাদ্যি বেজেছে”। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মায়ের আবাহন, বরণ ,আরতি, বিসর্জন সব ক্ষেত্রেই ঢাকের বোল একেক রকম। আবার সপ্তমীর দিন ভোর বেলায় কলা বৌ বা নবপত্রিকাকে দোলায় নিয়ে গিয়ে গ্রামের কোনও পুকুরে স্নান করানো। আবার দোলায় করে নিয়ে আসা অবধি পুরো পথটাই ঢাকির ঢাকের বোল ছাড়া অসম্পূর্ণ।

 

আবহমান কাল ধরেই দুর্গা পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে ঢাকের বোল ও ঢাকিদের জীবনযাত্রা। চতুর্থী-পঞ্চমী থেকেই ঢাকিরা তাদের ঢাক সাজাতে শুরু করে। সুন্দর কাপড় পরায়, ঢাকের পিছনে সাদা পালক লাগিয়ে সাজায়। ঢাকের সাথে ঢাকির থাকে প্রাণের যোগ, আত্মার সম্পর্ক। পুজোর মরসুমেই ঢাকিদের যা রোজগার। অন্য সময় তাদের জীবনযাত্রা নির্বাহ হয় একশো দিনের প্রকল্পে কাজ করে, বাঁশের ঝুড়ি বা মাদুর বিক্রি করে। পুজোর মরসুমে আশেপাশের জেলা ও গ্রামগুলি থেকে ঢাকিরা দলে দলে চলে আসেন কলকাতায়। দুই চব্বিশ পরগনা ,হুগলি, বাঁকুড়া, বীরভূম ইত্যাদি অনেক জেলার ছোট শহর ও গ্রাম থেকে ঢাকিরা এসে জড়ো হয় শিয়ালদহ অথবা হাওড়া স্টেশন চত্বরে। অনেক পূজোর কর্মকর্তারা ওখানে ঢাকিদের ঢাক বাজানো শুনতে ভিড় করেন। বাছাই করে নেন তাঁদের পছন্দের ঢাকিকে। তারপর বায়না হয় বোধন থেকে বিসর্জন অবধি। ঢাকে কাঠি দেবার সাথে সাথে ঢাকের তালে তালে নানা ধরনের নাচ নাচে ঢাকিরা। চরকি, ঝাঁপ, ঘূর্ণি, হাফ চরকি নাচের সাথে সাথে পড়তে থাকে ঢাকে কাঠি। আরতির সময় ঢাকিরা যখন মাতোয়ারা হয়ে ঢাক বাজায় তখন মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তিতে যেন উপচে পড়ে খুশির ঝলক। আবার বিসর্জনের সময় ঢাকির বোলে যেন কন্যা বিদায় লগ্নের বিষাদের সুর। ঢাকের বোলের সাথে সাথে মায়ের চোখেও যেন ঝরে বেদনাশ্রু।

 

পুজোর দিনগুলিতে ঢাকিদের ঘরে বাজে দুঃখের বোল। এমন কথাই জানালেন বেশ কিছু গ্রামের ঢাকি পরিবার। উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের প্রত্যন্ত এক গ্রাম ঢাকিপাড়া নামে পরিচিত। গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারের মানুষের জীবিকা ঢাক বাজানো। তাদের পূর্ব-পুরুষদের কাছে শেখা ঢাকের বোলকে তারা উপার্জনের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাঁকুড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বর নদীর কাছে বাঁকি সেঁদড়া গ্রামকেও অনেকে ঢাকিদের গ্রাম বলেন। এই গ্রামের প্রায় ৯৫ টি পরিবার উৎসব অনুষ্ঠানে ঢাক বাজিয়ে সংসার চালায়। কিন্তু উৎসব অনুষ্ঠানে বেশিরভাগ ঢাকিকেই বাড়তি রোজগারের আশায় যেতে হয় অন্য রাজ্যে। পুজোর পাঁচদিন আগেই ঢাকিরা রওনা দেয় সুদূর পাঞ্জাব, উড়িষ্যা, বেনারস, গুজরাট, দিল্লির পুজো মন্ডপগুলিতে। ঠিক এই কারণেই রামপুরহাটের কুসুম্বা গ্রামের বায়েন পাড়ায় ঢাকি পরিবারদের ঘরে পুজোর সময় জমাট বেঁধে থাকে মন খারাপের কালো মেঘ। ভিন রাজ্যে ঢাক বাজিয়ে পয়সা রোজগার করে আনলে তবেই পুজোর পর ঘরের বাচ্চাদের নতুন কাপড় জোটে।  দূর শহরে আলোর রোশনাইতে ঢাকিরা যখন ঢাক বাজাচ্ছেন ঠিক তখনই তাদের পরিবারের ঘরে টিম টিম করছে  হ্যারিকেনের আলো আর চরম নিস্তব্ধতা।

 

এখন সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে সাবেকি বোলের পরিবর্তে সমকালীন বাংলা বা হিন্দি গানের কদর অনেক বেশি। তাই ঢাকিরা পুজো উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ঢাকের  অভিনব নিত্য নতুন বোল আবিষ্কার করে যান। কোথাও কোথাও ঢাকিদের ঢাক বাজানো প্রতিযোগিতাও করানো হয়। আজকাল খরচ কমানোর জন্য প্লাস্টিকের ঢাক এসে গেছে বাজারে। কিন্তু আগেকার কাঠের ও চামড়ার ঢাকে কাঠি পড়লে যখন ঢাক বাজতো তার শব্দই আসলে অন্যরকম। সেই ঢাকের আওয়াজ আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। তাই এখনকার প্লাস্টিকের ঢাকের আওয়াজ আর মন টানে না। এখন তো আবার খরচ কমানোর জন্য  ঢাকের ক্যাসেটও বাজানো হয়! পুজো ক’দিন ঢাকি পাড়ায় নেমে আসে নিস্তব্ধতা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের বাবার অপেক্ষায়, সদ্য বিবাহিত স্ত্রী তার স্বামীর অপেক্ষায়, কোন পরিবারে বোন তার দাদার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকে। ভাবে কবে পুজো শেষ হবে, আর দূরে জমির আলপথ দিয়ে কাশবনের ভেতর দিয়ে ঘরে ফিরে আসবে তাদের প্রিয় মানুষটা। উদ্বেগ,সহানুভূতি আর ভালবাসার প্রদীপ জ্বেলে এভাবেই অপেক্ষায় বসে থাকে তাদের ঘরের আপনজন।

Promotion