কলমের শক্তি

দিল্লির শাহীন বাগে রাজপথের দখল ভারতের মায়েদের হাতে

 

কলমে রূপকথা বসু

১.৭ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে হাড় কাঁপানো রাতে রাস্তায় বাঁধা ছাউনি থেকে ভেসে আসছে, “চলো দোস্ত ইস কড়ি সর্দি মে গরমি লানে কা এক হি তারিকা হ্যায়, নারে লাগাতে হ্যায়, ইসসে গরমি আ যায়েগি, তো ন্যায়ি উর্জা সে আওয়াজ বুলন্দ করতে হ্যায়, রাত বহুত লম্বি হ্যায়……. কাট যায়েগি।” কখনও বা ভোরের নামাজের পর সাথী কমরেডদের জাগিয়ে দিচ্ছেন এই বলে, “উঠো সাথিয়ো আভি জাগ যাও নেহিতো ডিটেনশন ক্যাম্প মে আখ খুলেগি, অভি জাগ নে কা সহি ওয়াক্ত হ্যায়।”

 

এই ছবিটিই তৈরী হয়েছে গত ১৫ ডিসেম্বরের পর থেকে। সিএএ, এনআরসি, এনপিআর’র বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের পুলিশী মারের প্রতিবাদে মায়েরা নেমেছেন রাস্তায়। দক্ষিণ দিল্লীর ওখলার কাছে শাহীনবাগ নামের এক কলোনি এখন এই লড়াইয়ের অন্য নাম। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানসম ছেলে মেয়েদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে এক মিছিল বেরোয়। সেই মিছিল থেকেই ডাক ওঠে, যতদিন না সিএএ ফেরত নেওয়া হবে ততোদিন আন্দোলন চলবে। আপাততঃ দক্ষিণ দিল্লীতে রাজপথের দখল নিয়েছেন ভারতবর্ষের মায়েরা। এবার গত কুড়ি বছরের রেকর্ড চুরমার করে দিল্লীতে পারদ নেমেছে ১ ডিগ্রিতে। এই নিথর হাড় জমানো শীতকে দীর্ণ করেই আওয়াজ উঠেছে আজাদীর। ঘরের মধ্যে পর্দানসীন গৃহস্থলীকে জাপটে ধরে বেঁচে থাকা মহিলারা, বিভিন্ন বয়সের মহিলারা রাস্তায় নেমেছে কার বিরুধ্বে? নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ; এক কথায় হিন্দু রাষ্ট্রের ব্যাপারী ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে। গেরুয়া বাহিনী, মোদী-শাহের দেশকে টুকরো করার বিরুদ্ধে আঁচল পেতে দিয়েছেন তারা। “আজ ওরা আমার বাচ্চাকে মারেনি কাল ওরা আমার ঘরেও ঢুকবে। আমরা জামিয়ার আহত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আমার ছোট্ট সন্তানদের যৌবন দেখতে পাই।” আলিগড় থেকে কাশ্মীর, আসাম উত্তরপ্রদেশ সব জায়গায় সিএএ’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সাধারণ মানুষকে জেলে ভরা, গুলি করা, পিটিয়ে মারা এই সবের বিরুদ্ধ্বতায় ওরা কথা বলছে। সন্ত্রাসবাদী গেরুয়া রাষ্ট্রের চোখে দৃষ্টি শানিয়েছে বোরখার আড়ালে থাকা তীক্ষ্ণ চোখগুলো।

 

যথারীতি মেইন স্ট্রীম মিডিয়া এসব খবর করবে না করছেও না। তাই শাহীন বাগের লড়াই প্রথম পাতায় জায়গা পায়নি, ছড়িয়ে পড়েনি। কিন্তু লড়াইয়ের আঁচ ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বন্ধুদের মাধ্যমে যতোটুকু যা জেনেছি ছবিটা খানিক এরকম। ভীষণ পরিপাট্য নিয়ে সাংগঠনিকভাবে প্রতিরোধ অবস্থান চলছে। রীতিমত সাংসারিক কাজ সামলানোর জন্য মহিলারা দল বানিয়ে শিফট করে এক এক বেলা অবস্থান করছেন। এক সাথে একই সময়ে রাস্তায় বসে আছেন প্রায় সাত-আটশো মহিলা, সঙ্গী তাদের সন্তান রাও। সব চেয়ে ছোট্ট অংশগ্রহণকারী ২০ দিন বয়সী হাবিবা। সর্বাধিক বরিষ্ঠ যিনি তার বয়স ৯২। আন্দোলনের স্বার্থে তৈরী হয়েছে কমিউনিটি কিচেন। বিলি হচ্ছে কম্বল, হাড় জমিয়ে দেওয়া শীতে রাস্তাতেই থাকা-খাওয়া, রান্না-বান্না, বাচ্চাকে পড়ানো, বুকের দুধ খাওয়ানো, আগুন পোহানো সবটাই। আর এসবের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জুড়ে গিয়েছে স্লোগান।

 

দেশ ও সাংবিধানিক অধিকার বাঁচাতে, মানুষের মধ্যে ঘৃণার বীজ উপড়ে ফেলে দিতে আজ জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, নির্বিশেষে সারা দেশের মানুষ রাস্তায়। ঠিক তখনই পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সমাজের পচে যাওয়া নিয়মের আগল ভেঙে মুসলিম অধ্যুষিত মহল্লায় বোরখার আড়ালে থাকা মেয়েরা নিস্তব্ধতা ভেঙে রাস্তায়। এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন পুলিশ ওদের উঠে যাওয়ার জন্য হুমকি দেয়নি। সরগরম দিল্লীর বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা জড়ো হচ্ছেন শাহীন বাগে। তারাই পালা করে পাহারা দিচ্ছে, পোস্টার আঁকছে, স্লোগানে লিড দেওয়া শেখাচ্ছে। এমনকী অফিস করে এসে তরুণ-তরুণীরা রাতে অবস্থানে বসছেন। কেউ কেউ বলছেন স্বাধীনতার ৭৩ বছর পর শাহীন বাগের গলি থেকে এক নতুন দেশ তৈরীর ডাক উঠছে। আর সেই ডাক দিচ্ছেন এতোদিন চুপ করে সব সহ্য করতে থাকা মায়েরা। ৪৭ সাল থেকে বারবার দেশের সমানাধিকারী নাগরিক প্রমাণ দিতে থাকা মেয়ে মানুষ উগড়ে দিচ্ছেন স্লোগান

“ইয়ে সড়কে হামারি আপ কি
নেহি কিসিকে বাপ কি,

ইয়ে মুলক হামারি আপ কা
নেহি কিসি কে বাপ কা।”

আন্দোলনের সমর্থনে থাকা এক অংশগ্রহনকারীর টুইট থেকে জানা যাচ্ছে, কেউ শাহীন বাগে গেলেই তার সাথে অবস্থানকারী মহিলাদের কথা শুরু হচ্ছে এই ভাবে। “আপ কুছ খায়ে হো? নেহি না? আপ ইতনে দূর সে আয়ে হো হামারা সাথ দেনে কে লিয়ে কুছ খা লো পেহলে।” আজ্ঞে হ্যাঁ, মায়ের জাত আগামী প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে এভাবেই লড়াইয়ে নেমেছেন। শাহীন বাগের হার না মানা মায়েরা আজ এক ভবিষ্যতের ইতিহাস লিখছে নিজেদের জীবন দিয়ে, তাদের আন্দোলন দিয়ে। মনে রাখতে হবে এই ভারতের মাটি থেকে ব্রিটিশদের উৎখাত করতে পিছিয়ে ছিলো না মহিলারাও। প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন লক্ষ্মীবাঈ, বেগম হজরত মহল। এই মাটি কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতার মাটি, তেমনি স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজের ছেলের প্রাণও কবুল করেছিলেন আবেদী বেগম। প্রথম মুসলিম সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া মহিলা রিজিয়া খাতুন যাকে ইংরেজরা দীপান্তরে পাঠিয়েছিল। বিপ্লবীদের গোপন খবর পাচার করতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করেন আজিজান, তিন তিনটে গুলি খাওয়ার পর ৭৩ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনীর শরীর নুয়ে পরলেও হাতে ধরা দেশের পতাকা দাঁড়িয়েছিল। সেই ব্যাটন আজ ৭২ বছর পর উত্তরসূরী প্রজন্মের জামিয়ার ছাত্রীদের হাত হয়ে শাহীন বাগে মহিলাদের হাতে এসে উড়ছে। দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনের ভেরী বেজে গিয়েছে। শাহ-মোদীর হাত থেকে দেশ স্বাধীন করার শপথ জোরালো হয়েছে। শাহীন বাগ লড়ছে, শাহীন বাগের লড়াকু মহিলারা তাদের বুক দিয়ে আগলাচ্ছেন ভেদাভেদহীন ভালোবাসার মাটিকে। চোখের মণির মতোই পাহারা দিচ্ছেন জাতপাতহীন নতুন সমাজের স্বপ্নকে। যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি শাহীন বাগের প্রতিরোধের ময়দানে ইকবাল বানু গাইছেন,
“হাম দেখেঙ্গে
লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে
ওহ দিন জিসকা ওয়াদা থা।”

নতুন বছর এসেছে, নতুন দশকও।  নতুন শপথে নতুন দেশ গড়ার ডাকে, রাত্রি জেগেছে আমার দেশ। জামিয়া, জাফরাবাদ, শাহিনবাগ, ওখলাতে লাখো মানুষ মোমবাতি মোবাইল টর্চের আলো জ্বেলে জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছেন। গান-কবিতা-শায়েরি-স্লোগানে উদযাপিত হয়েছে নিউ ইয়ার ইভ। ৪৭-এর স্বাধীনতার পর আবার ভারতবাসী স্বাধীনতা চাইছে হিন্দু রাষ্ট্র থেকে। ২০ দিনের শিশু থেকে ৯০ বছরের বৃদ্ধা রাস্তায়। আমাদের বোধহয় ঠিক আর ভয় পাওয়ার সময় নেই। শাহীন বাগ রাস্তা দেখিয়েছে। দেশের মায়েরা তাদের সন্তানের আগামীর জন্য ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই রেখে যেতে চান না। তাই বুক ভরা সাহস আর স্নেহ নিয়ে আজ তারা রাস্তায়। আফস্পা প্রতিরোধে মণিপুরের মায়েরা হোক আর সিএএ-এনআরসি প্রতিরোধে শাহীন বাগের মায়েরা। রাষ্ট্র ভয় পেয়েছে, যখনই স্নেহময়ীরা ফুঁসে উঠেছেন।

লেখিকার মতামত সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, আমরা তা আপনার কাছে পৌঁছে দিচ্ছি মাত্র। ‘এক্সক্লুসিভ অধিরথ মিডিয়া’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই।

Promotion