কাটাকুটি

দেবীপক্ষ – বছর জুড়ে শান্তি থাকুক, এইটুকু থাক প্রার্থনা

দূরদর্শন ও আকাশবাণীর পরিচিত মুখ ও কণ্ঠ পিয়ালী পাঠক। তিনি একটু ব্যাতিক্রমী পথেই হাঁটতে পছন্দ করেন। মহালয়ায় মুক্তি পেল এই বাচিক শিল্পীর নিজস্ব মিউজিক্যাল ন্যারেটিভ ‘দেবীপক্ষ’। তবে এই বাচিক শিল্পীর ব্যাতিক্রমী সত্ত্বার ছোঁয়া ‘দেবীপক্ষ’এর পরতে পরতে। এটির কম্পোজিশন এবং মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টে শুভব্রত সাহা এবং ভিডিওগ্রাফি করেছেন শুভঙ্কর দাস। একান্ত আলাপচারিতায় পিয়ালী তার এই অ্যালবাম সম্পর্কে কী জানালেন ‘এক্সক্লুসিভ অধিরথ’ কে? আসুন, সেটাই দেখি…

কোন ভাবনার জায়গা থেকে এই দৃশ্য-শ্রাব্য উপস্থাপনাটি করলেন?

প্রথমেই সবাইকে শুভ মহালয়া। ভাবনা কিনা জানিনা, তবে আমার মনে হয়েছে আমরা অনেকেই নিজেদের অন্ন সংস্থানে ভিন রাজ্যে আস্তানা গেঁড়েছি। তার জন্য  সরকার, অমুক-তমুক দায়ী, দোষ এসবে যাবো না। কিন্তু কখনও নিজের প্রয়োজনে বা পরিবার-পরিজনের মুখে অন্ন তুলে দিতে আমাদের ভিনরাজ্যে থাকতে হচ্ছে। তবে এই সেটেলমেন্ট উৎসবের সময় আরও বেশি করে এই প্রিয়জনদের কথা মনে করায়। ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত ব্যাপারে আমি আমার জীবনের বেশ কিছুটা সময় ব্যাঙ্গালোরে কাটিয়েছিলাম।  আমাকে যখন একটি প্রোজেক্ট-ওয়ার্কের জন্য লক্ষ্মীপূজোর দিনও সেখানে থাকতে হয়েছিল। মা বলেছিলেন, আমাকেই আলপনাটা দিতে হবে?  কোথাও আমার মনে হয়েছে এই যন্ত্রণার অনুভূতি যদি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। শহুরে পূজোর আমেজকে ধরে ‘দেবীপক্ষ’ কবিতাটি লেখা। গোটা শহর জুড়ে পূজোর মরশুম এসে গিয়েছে। চলো, আর কিচ্ছু না, জীবন জুড়ে শুধুই পূজো পূজো গন্ধ। আর এই গন্ধের টানেই তো আমি ফিরে আসছি।  তাহলে যদি আমার এই ফিরে আসা আর শহরের সেজে ওঠাটি যদি জুড়ে দেওয়া যায়। সেখান থেকেই এই উপস্থাপনাটির ভাবনা।

‘দেবীপক্ষ’তে দুটি লাইন পেলাম, “হোক কলরব মন্ত্র বিদায়,  ছাত্র-যুব’র উধাও তেজ”। এটির মাধ্যমে কী বোঝাতে চাইছেন?

হ্যাঁ, এই লাইনগুলি রয়েছে। আমি মফঃস্বলে থাকি, প্রত্যেক দিন ট্রেনে কলকাতা যাই। যেহেতু আমি একই কামরায় উঠি, তাই আমার পাশে যে মেয়েটি বসে তার সঙ্গে আমার ভালোই পরিচয় রয়েছে। মেয়েটি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত।  কিছুদিন আগেই দেখলাম সে মার খেয়েছে, মাথায় ব্যান্ডেজ। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করায় সে তার সমস্যার কথা জানালো আমাকে। সেটি একেবারেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ একটি বিষয়। ঠিক এক সপ্তাহ আগেই দেখলাম ট্রেনে ক্লিপ, কানের দুল বিক্রি হয় সেগুলি সে কিনলো। তারপরেই সে আমাকে বলল, আসলে একটি শপিং মলে যেতে হবে তো, তাই একটু সেজেগুজেই যাবো আর কী। আমার তাই মনে হল, এই বাঁচাটি, এই আনন্দটি সব ধরণের উত্তেজনার থেকে অনেক ওপরে। এই চারটে দিন কোনও কলরব-প্রতিবাদ হবে না। এই চারটে দিন আমি নিজের মতো করে বাঁচবো। সেই জায়গা থেকেই লেখা, “হোক কলরব মন্ত্র বিদায়,  ছাত্র-যুব’র উধাও তেজ”। তারপরেই কিন্তু রয়েছে, “ঘর পুড়ছে, বোম পড়ছে, যুবতী মায়ের ফাটছে বুক, তবুও আবার দেবীর বোধন, শক্তি রূপের আরাধনা, বছর জুড়ে শান্তি থাকুক, এইটুকু থাক প্রার্থনা”।

আপনার আগের কাজটি  পঁচিশে বৈশাখ মুক্তি পেয়েছিল যেটির নাম ছিল ‘কবিপক্ষ’। এই উপস্থাপনাটির নাম ‘দেবীপক্ষ’। আপনার প্রতিটি অ্যালবামের নামে ‘পক্ষ’ শব্দটি কেন রয়েছে? 

আমি ‘কবিপক্ষ’ অ্যালবামটি মুক্তির সময়ও আপনাদের বলেছিলাম আসলে যাপনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কিন্তু মহালয়ার দিনটির জন্য বাঁচছি। আমরা কারা? আমরা মানে আপামর বাঙালি। আমি একজন বামপন্থী, আমি তর্পণ করার জন্য বাঁচছি না, যেহেতু এটি একটি উৎসবের দিন তাই একসঙ্গে বহু মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া যাবে। আর এই দিনটি মানে কিন্তু এই চব্বিশটি ঘণ্টা নয়। একটা যাপন, একটি টাইম-পিরিয়েড। সন্ধ্যে ৭ টার পর আমি যে শহরে থাকি তার স্টেশন চত্বরে মানুষের ঢল দেখলেই বোঝা যাবে যে মানুষ কিন্তু প্লাস-মাইনাস এই ১৫ টি দিনের জন্যই বাঁচছে। সবটা আনন্দ করে নিতে চাইছেন তারা। আসলে একটি উৎসব মানে একটি দিন, দুটি দিন বা পাঁচটি দিন নয়। এক পক্ষ বা সময়কাল বোঝায়, যার একটি রেশ শুরুতেও থেকে যায়, থেকে যায় শেষেও। দেখবেন, কোনও অজ পাড়াগাঁয় রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করে সাধারণতঃ কোনও নেতা এসে গুরুগম্ভীর ভাষণ দিয়ে যায় না। যে ছেলেটি প্রচণ্ড দুষ্টুমি করে, অন্যের বাগানে ফল চুরি করে খায়, সেও কিন্তু বুকে হাত দিয়ে সেদিনের জন্য বীরপুরুষ। দুর্গাপূজোও ঠিক তাই। জানে যে দশমীর রাতটা পেরোলেই জবকার্ডটি দেখিয়ে সেই কাজে যেতে হবে।  তাও নবমীর রাতে বেস্ট শাড়িটা পড়তে এক মুহূর্ত দেরি করে না গ্রামের ওই বৌদিটা।  বেঁচে থাকার ইচ্ছা, ভালো থাকার ইচ্ছা। আর সেটি কিন্তু জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে। আমাদের ব্যর্থতা যে আমরা তাজিয়াকে নিয়ে মাতামাতি করতে পারি না। কিন্তু আমাদের বাড়িতে ৪১৩ বছরের প্রাচীন দুর্গাপূজোতে ইব্রাহিম চাচা, সেলিম চাচারা দীর্ঘদিন ধরে এসে ঠাকুরদালানে বসে প্রসাদ খেয়ে যান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেটিও তারা করেন নতুন পোশাক পড়ে। তাহলে এটা যাপন নয়তো কী?

উপস্থাপনাটির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কী বার্তা দিতে চাইলেন?

আমরা শিল্পীরা জানি যে একটি ভিডিও বা সিনেমা বানালে মানুষের কিচ্ছু যায় আসে না। সত্যিই যায় আসে না। কিন্তু আমার এই পাঁচ মিনিটের ভিডিও কিন্তু আমার যেসব এনআরআই বা ভিনরাজ্যের বন্ধু রয়েছেন, তাদের মনে করাবে; হ্যাঁ, এই বছরের পূজোটায় বাড়িতে ফিরতেই হবে। মানুষের যে সামগ্রিক চাহিদা সেটিই আমি তুলে ধরার চেষ্টা করি সবসময়। এবারেও তাই করেছি। অনেক তো হল জাতের নামে বজ্জাতি, অনেক তো হল ভাই তুমি কালো, আমি সাদা। এই পূজোটা নাহয় মিলেমিশে নিজেদের মতো করেই থাকি না সবাই। আমি ঐশ্বরিক চিন্তাভাবনা, আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনায় যাবো না। ঘরের মেয়ে ঘরে এসেছে,ঘরে রইলো কটা দিন। চলুন না সবাই মিলে আনন্দ করি। আর এই প্রার্থনাটাই করি, সবাই যেন সারা বছর শান্তিতে থাকি।

Promotion