মরসুমী ফুল

বাংলাদেশে গারো পাহাড়ের পাদদেশে বড়দিন

 

নেত্রকোনা জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক এলাকা। এই জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে ময়মনসিংহ জেলা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সারি সারি পাহাড়ে ঘেরা বাংলাদেশের নেত্রকোনার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকা কলমাকান্দা ও দূর্গাপুর উপজেলা। এখানেই প্রাচীন কাল থেকে বসবাস করে আসছে গারো, হাজং, মারমা ও সাঁওতাল উপজাতির মানুষজন। এই মানুষগুলো অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করে। এদের তেমন কোন শিক্ষা ও মৌল মানবিক চাহিদা নেই। ওরা শুধু বোঝে কাজ করে খেতে হবে। কাজ করলে দু’মুঠো ভাত জুটবে নয়তো অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটবে। সামনেই বড়দিন। তাই দেখতে গিয়েছিলাম কলমাকান্দা’র পাতলাবন, সন্ন্যাসী, পাঁচ গাও ও গোবিন্দপুর গ্রামে। সেখানে তেমন কোনো দৃশ্যমান প্রস্তুতিই নেই বড়দিনের। আর দুদিন পর বড়দিন অথচ কোন রাখঢাক নেই। চারদিকে শুনসান নিরবতা।

 

এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের সাথে কথা হলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “মামা আর দু’দিন পর আপনাদের বড় উৎসব বড়দিন! কী প্রস্তুতি নিচ্ছেন?” ভদ্রলোক মলিন স্বরে বললেন, “কি আর করবো, ছেলে মেয়ে ঢাকায় কাজ করে। ওরা আসলে যা করবে তা-ই।” আসলে বাস্তবতাটাই এমন যে, এখানে কোন কাজ নেই, উপার্জন নেই তাই উৎসবও নেই। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। বাস্তবতা যেখানে রসিক, ভাগ্য যেখানে নির্মম সেখানে উৎসব মানেই বিড়ম্বনা।

 

যাই হোক, গোবিন্দপুর গিয়ে দেখলাম একটু ভিন্ন আবহ। সেখানে একটা খ্রিস্টান পাড়া আছে তবে কোনও গির্জা চোখে পড়েনি। এখানকার মানুষজন তুলনামূলক একটু সচ্ছল। তাই তাদের কাছে বড়দিনের আনন্দটা প্রতিবছরই একটা ভিন্নমাত্রা পায়। সবাই বেশ ফুরফুরে মেজাজে দিনটি উদযাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মহিলারা খুবই ব্যস্ত। প্রতিটা বাড়ি খুবই পরিপাটি আর রকমারি পিঠা প্রস্তুতের জন্য চালের গুড়া করা, চুঁ ও হান্ডি প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। তাছাড়া বিভিন্ন গ্রামে যেখানে খ্রিষ্টানদের আধিক্য বেশি সেখানে ২৪ ডিসেম্বর রাতে বিশেষ প্রার্থনার পর হয় কীর্ত্তন বা নাটক। এ ছাড়া ২৫ ডিসেম্বর থেকে সপ্তাহব্যাপী থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা। বাঙালি খ্রিষ্টানদের আয়োজনে কিছু দেশীয় খাবারেরও প্রচলন দেখা যায়। পোলাও-কোর্মা সহ থাকে নানা রকম দেশি খাবার। প্রায় প্রত্যেকটি গির্জায় সবাই মিলে ভোজের আয়োজন করে থাকে। এই ভোজে সবাই মিলে পিকনিকের ঢংয়ে একসঙ্গে রান্না করে থাকে। প্রার্থনা শেষে একসাথে খাওয়া-দাওয়া তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরী করে। মোটামুটিভাবে সব প্রস্তুতি দেখে আন্দাজ করে যায়, এবারে গারো পাহাড়ের এই অঞ্চলে বড়দিন অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গেই পালিত হতে চলেছে।

 

Promotion