কাটাকুটি

BLOCKLIST রিভিউ – ধর্ষক মনগুলোও ভালবাসতে শিখুক…

১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল ধর্ষণকে চাপ প্রদানের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ওপর সংগঠিত যৌন প্রকৃতির শারীরিক আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে। (তথ্যসূত্র: ক্রিমিনাল কোড)। আমি অবশ্য এই সংজ্ঞায় বিশ্বাসী নই। একজন ধর্ষক যে বিকৃত মানসিকতা নিয়ে বিপরীত বা স্ব-লিঙ্গের অন্য আরেকজনের প্রতি আগ্রাসী হস্তক্ষেপ চালায় তাকে কতগুলো শব্দে আবদ্ধ করা অসম্ভবই নয়, অমানবিকও বটে। গত কয়েকশো বছরে এই ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্ষণের শিকার নারী ও পুরুষের সংখ্যা আফ্রিকার কোনো পশ্চাৎপদ বড় দেশের জনসংখ্যার চেয়ে নেহাৎ কম নয়। ধর্ষণ হয় কখনও ক্ষমতার উন্মত্ত বহি:প্রকাশ ঘটাতে, কখনও ব্যক্তিগত বা জাতিগত চরিতার্থ করতে। কখনও তা ধর্ষকামী মনোভাবের কারণে। মাত্র ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশেই ২০১৬ সালে ১০৫০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর ২০১৭ এর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতিমাসে ৫৫ জনের বেশি শিশু গড়ে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই তিন মাসে ধর্ষিত ১৭৬ শিশুর মধ্যে ১৫ জনেরই বয়স ১ থেকে ৬ বছরের মধ্যে! (তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা ও দৈনিক কালের কণ্ঠ)।
একজনের ধর্ষককে খুব কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আমি কুড়িয়েছি আরও বছর দুয়েক আগে। আমার জেলায় বিভিন্ন বেসরকারি সামাজিক ও গবেষণামূলক আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাজ করার সুবাদেই এমন অভিজ্ঞতা হয়। আমার ১৬ মিনিটের আলাপচারিতার উপর ভিত্তি করে একটি গবেষণা করেছিলাম। এই গবেষণার সারবস্তুর সঙ্গে উডপেকার ক্রিয়েটিভ আর্টসের ব্যানারে করা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ব্লকলিস্টের অন্তর্নিহিত বক্তব্যের মিল খুঁজে পাই। গবেষণাপত্র দাখিল করার আগে এই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি দেখা হলে হয়তো আরও একটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে পারতাম। এরকম আফসোস বুকে চেপেই রিভিউটি করতে বসা।
মূলত সূর্য এবং বন্যা নামের চরিত্র দুটিকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে ‘ব্লকলিস্ট’এর কাহিনী। এই শর্ট ফিল্মে একজন ধর্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সাহসীভাবে বিচক্ষণতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। মূল চরিত্রদ্বয়ে অভিনয় করেছেন রু এবং বিদিশা। অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন শুভজিৎ, সোমা এবং সন্বয়। সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন সৌভিক এবং কুন্তল। সম্পাদনা করেছেন সুপ্রতিম। যতদূর জানি, ব্যক্তিগতভাবে এটি তার চতুর্দশ পরিচালনা। ব্লকলিস্টের সঙ্গীতায়োজন রয়েছে এসএনএফ (ভিওএক্স- সৌম্যদীপ, ব্যাস-বুবলা, গিটার: দ্বৈপায়ন, কীবোর্ড-মৈনাক, পারকাশন-সায়ান)। ব্লকলিস্টের মূল ভাবনা, স্ক্রিপ্ট এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন সুপ্রতিম সিনহা রায়। পুরো ইউনিটের নির্দেশনার কাজও সামলেছেন তিনি। কাজেই পুরো আয়োজনটিই সুপ্রতিম সিংহ রায়ের একটি ব্রেইন চাইল্ড, এমনটা বলা ভুল হবে না।
ব্লকলিস্ট ইউনিটের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর পরিচালক, চিত্রগ্রাহক এবং আলোকসজ্জাকারী। সিনেমাটোগ্রাফিও দারুণভাবে মূল গল্পের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সূর্যর চরিত্রে রু’র স্বভাবজাত ও অকৃত্রিম অভিনয়সত্ত্বার প্রতিফলন বেশ ভালো লেগেছে।  মানসিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক নেতিবাচক চিন্তাধারার ব্যক্তির চরিত্রকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তা দিয়েই ওর অভিনয় জীবনের অনাগত সাফল্যগুলি খানিক আন্দাজ করা যায়। এক পর্যায়ে রু’র হাসতে হাসতে কান্না করার একটি দৃশ্য আমি রিওয়াইন্ড করেছি বারকয়েক যদিও এখনও সে মুগ্ধতার ঘোরটুকু লেগেই আছে। এখানে খানিক সাফল্য পরিচালকেরও। একই ইউটিউব চ্যানেলে ‘মেকিং অফ’ শিরোনামের ভিডিওটিও আমি দেখেছি। স্ক্রিপ্ট হাতে তার শশব্যস্ত ভঙ্গি দেখেই আমি তাকে একজন পেশাদার পরিচালক হিসেবে ধরে নিয়েছি৷ রু’র অন্ধকারে সিগারেট জ্বালানোর দৃশ্যটির কথাই ধরা যাক। নতুন চিন্তাভাবনার পরিণত উপস্থাপনাগুলো সত্যিই রুচিশীল ও সহজ গ্রহণযোগ্য ছিলো। পাশাপাশি দুটো অসাধারণ সুন্দর গানের সম্মেলনও এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী তৃপ্তির রেশ এনে দিয়েছে।
ব্লকলিস্ট ইউনিটের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে আমি দুটো সীমাবদ্ধতা বা অপূর্ণতার কথা বলবো।
এক. শব্দগ্রহণে অপেশাদারিত্ব।
দুই. বন্যার চরিত্রে বিদিশার কিছুটা কৃত্রিম অভিনয়।
প্রথমত, এরকম একটি অর্থবহ এবং বার্তাবাহী আয়োজনের শব্দগ্রহণ পেশাদার মানের হওয়া উচিত ছিলো। আর দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতা নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলে নিই, রিভিউ করার আগের হোমওয়ার্কের অংশ হিসেবে ব্লকলিস্টের পরিচালক সুপ্রতিমের সাথে কথা বলে আমি যতদূর জানতে পেরেছি, বিদিশার প্রথম ক্যামেরার সামনে আসা এই ব্লকলিস্ট দিয়েই। কাজেই শুধু তার সমালোচনাই করবো, নিন্দা করবো না। বিদিশার অভিনয় এবং কণ্ঠ দুজায়গায়ই আমি একটি অপ্রয়োজনীয় জড়তার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি যা একজন পেশাদার অভিনেত্রীর চরিত্র অর্জনের স্বার্থে এখনই ঝেড়ে ফেলা উচিত। তাছাড়া কিছু অভিব্যক্তির অকারণ প্রয়োগ আমাকে হতাশ করেছে। আমার মতে শ্যুটিং ইউনিটের ক্যামেরার পেছনে এবং সামনের সব সীমাবদ্ধতাতেই পরিচালকের একটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে। কাজেই ব্লকলিস্টের এই সীমাবদ্ধতার দোষ যদি বিদিশার হয় তবে দায়টা অবশ্যই পরিচালকের। আমি জানিনা বিদিশা এই চরিত্রে আরও সহজাত অভিনয় করতে পারতো কিনা৷ তবে যদি করতে পারতো, তাহলে হয়তো এই আয়োজনটি আরও তৃপ্তিদায়ক হতো৷ কন্ঠ এবং অভিনয় দুজায়গারই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদিশার মুভগুলো আমার কাছে বেখাপ্পা মনে হয়েছে৷ গল্পের অন্যতম প্রধান এই চরিত্রের দিকে পরিচালকের আরও একটু সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত ছিলো৷ এই দুটো বিষয় বাদে আমি পুরো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেই শক্তিশালী পেশাদারিত্বের ছাপই পেয়েছি।
সেরা চরিত্র: সূর্য।
সেরা অংশ: ব্যাপ্তিকাল ৬ মিনিট থেকে ব্যাপ্তিকাল ১৫ মিনিট।
ক্যামেরার পেছনের নায়ক: যৌথভাবে পুরো সঙ্গীতায়োজক দল এবং সুপ্রতিম।
সেরা উক্তি:
১. সূর্য সবার হয়, বন্যা সবার হয়না।
২. রেপিস্ট মন দিয়েও ভালোবাসা যায়।
পুরো ব্লকলিস্ট ইউনিটের প্রতি ভালোবাসা রইলো। সেলুলয়েডীয় জগতে গ্রহণযোগ্য এই আগ্রাসনটা জারি থাকুক। নিকট ভবিষ্যতে আরও রুচিশীল ও সময়োপযোগী উপস্থাপনার সাক্ষী হতে পারবো এমনটাই আমার প্রত্যাশা। রেপিস্ট মনগুলোও ভালোবাসতে শিখুক, ভালোবাসুক। পরজন্মে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসীরা সবাই যদি এ জন্মেই দর্শনটা বদলে ফেলেন, তবেই হয়তো বা মানবিক হতে পারবেন। সত্যিকারের মানুষ হতে পারবেন। পরিবর্তনটা আসুক খুব দ্রুতই। প্রেমিকার দেহে নখ বসিয়ে নয়, তার রক্তিম ললাটে ভালোবাসার বহুল আকাঙ্ক্ষিত চুমু এঁকেই ‘মানুষ‘ হোক হোমো সেপিয়েন্সরা।
দেখুন BLOCKLIST স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবিটি…

Promotion