দুই বাংলার পুজো পরিক্রমা ২০১৯

বারুইপুর রাজবাড়িতে বিসর্জনের পর নীলকন্ঠ শিবকে খবর দেয় মা ফিরছেন

কলমে অরিত্র

লর্ড কর্ন‌ওয়ালিসের আমলে তৈরি হয় বারুইপুরের রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি। বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে এটি তৈরি করান জমিদার রাজবল্লভ চৌধুরী। তিনশো বছরের পুরনো এই বাড়ির দেওয়ালে আজ বট, পাকুড়, শ্যাওলার বসতি। তবুও আভিজাত্যের অহঙ্কার চোখে পড়ার মতো। অনেক ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে আজও সে দাঁড়িয়ে।

শোনা যায়, তৎকালীন নবাবের কাছ থেকে বারুইপুর থেকে সেই সুন্দরবন পর্যন্ত এক বিশাল এলাকা যৌতুক পান জমিদার রাজবল্লভ রায়চৌধুরী। রায়চৌধুরী উপাধিও স্বয়ং নবাবের কাছ থেকেই পাওয়া। স্বাধীনতার আগের এবং পরের বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী এই জমিদার বাড়ি। ঋষি অরবিন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিত্বের পায়ের ধুলো পড়েছে এই বাড়িতে। বারুইপুরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এখানকার ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন এই বাড়িতে বসেই ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের কিছুটা লিখেছিলেন। সেই চেয়ার, টেবিল এখনও সযত্নে রাখা জমিদার বাড়িতে।

প্রায় তিনশো বছর আগে এই জমিদারবাড়িতেই দুর্গাপুজোর সূচনা করেন জমিদার রাজবল্লভ রায়চৌধুরী। জমিদার বাড়ির ঠাকুরদালানে তৈরি হয় দুর্গা প্রতিমা। নিয়ম মেনে এখনও এক চালচিত্রের প্রতিমারই পুজো হয়। প্রাচীন রীতি মেনে তিনজন পুরোহিত পুজো করেন। প্রতিপদ থেকে পুজো শুরু হয়। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ছাগল বলি হয়। আগে ১০১ টি বলি হতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাটা কমেছে। বিশাল পরিবারের দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সদস্যরা প্রত্যেকেই বাড়ির পুজো দেখতে ফিরে আসেন। অষ্টমীর দিন জমিয়ে আড্ডা বসে।

একসময় জমিদার বাড়ির দালান পূর্ণ থাকতো নৈবেদ্যর ডালাতে। বহু দূর থেকে অগুনতি মানুষ আসতেন জমিদার বাড়ির পুজো দেখার জন্য। এখন চারিদিকের বারোয়ারি পুজোর হিড়িক তাতে অনেকটাই থাবা বসিয়েছে। সময় বদলেছে, তবে নিয়ম বদলায়নি আজও। প্রথা মেনে আজও প্রতিমা বিসর্জনের পর নীলকন্ঠ পাখি ওড়ান রায়চৌধুরী বাড়ির কর্তারা। পুরাণ মতে, নীলকন্ঠ পাখিরাই কৈলাসে গিয়ে শিবকে খবর দেয় মা দুর্গা ফিরছেন। সেই বিশ্বাস আজও চলে আসছে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য ছাড়তে নারাজ রায়চৌধুরীরা।

Promotion