Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
লাতিন আমেরিকার বাঙালি ভদ্রলোক মার্কেসকে নিয়ে অরুন্ধতী ভট্টাচার্য - Exclusive Adhirath
প্রত্যাশার পারদ

লাতিন আমেরিকার বাঙালি ভদ্রলোক মার্কেসকে নিয়ে অরুন্ধতী ভট্টাচার্য

স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ অরুন্ধতী ভট্টাচার্য নোবেলজয়ী লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের “Memoria de mis putas tristes” বা “আমার বিষণ্ণ বেশ্যারা” নামক বিশ্বখ্যাত বইয়ের বাংলায় অনুবাদ করেছেন। অন্য প্রখ্যাত লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিকদের গল্প-কবিতা-উপন্যাস ও মার্কেজের আরো বহু রচনা অনুবাদের সূত্রে অরুন্ধতী ভট্টাচার্য কয়েকবছর আগে স্পেনে বক্তৃতা দিতে গেছেন, বহু লিটল ম্যাগাজিনে লিখে সুপরিচিত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহলে। এ বছরই তিনি ঘুরে এসেছেন কলম্বিয়া থেকে। মার্কেজের জন্মভূমি জগদ্বিখ্যাত কলম্বিয়ান শহরে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছেছিলেন মার্কেজের জন্মভিটায়। ভিডিওয় ধরে রাখা সেসব ছবি আর অরুন্ধতি দেবীর সহজ-সরল ভাষা আমাদেরও যেন ঘুরিয়ে আনে কলম্বিয়া থেকে!

লাতিন আমেরিকার সাহিত্য বা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে নিয়ে আপনার আগ্রহ কবে থেকে? অনেকে অনুবাদ সাহিত্য পড়তে গিয়ে উৎসাহিত হন, অনেকে উৎসাহিত্য হন স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষা ও চর্চা করতে গিয়ে। আপনার ক্ষেত্রে কোনটা?

 

পরকীয়ার দরকারই পড়বে না, স্ত্রীকেই এতোটা ভালোবেসে ফেলবেন

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে নিয়ে আমার আগ্রহের শুরু লাতিন আমেরিকার সাহিত্য সম্বন্ধে কিছু না জেনেই। ব্যাপারটা আসলে খুব মজার। গার্সিয়া মার্কেস নোবেল পুরষ্কার পান ১৯৮২ সালে আর আমি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হই ১৯৮৪ সালে। ওই কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা তো খুবই পড়াশুনা জানা; কিন্তু সুদূর মফস্বল শহরের মেয়ে আমি, আমার অত পড়াশুনা করা ছিল না। কলেজে ঢুকে দেখি বন্ধুরা অনেকেই গার্সিয়া মার্কেসের একটি উপন্যাস নিয়ে হইচই করে আলোচনা করছে। আমি বইটা পড়িনি, পড়ে নেব যে তারও উপায় নেই, কেননা আমি তখন ইংরাজী বই পড়তে পারতাম না আর তখনও বইটার বাংলা অনুবাদ হয়নি। তাই বন্ধুদের ওই আলোচনায় যোগ দিতে পারতাম না। সেদিন মনে মনে ভেবেছিলাম, এই বইটা একদিন আমি মূল ভাষায় পড়ব। এই ভাবনার প্রায় ১৬-১৭ বছর পরে স্প্যানিশ ভাষা শিখতে শুরু করি এবং একসময় সে বই পড়েও ফেলি, মূল ভাষাতেই।

মূল ভাষায় পাঠ ও অনুবাদ পাঠের মধ্যে কি কি তফাত আছে বলে আপনার মনে হয়েছে? আপনার ক্ষেত্রে এই দুয়ের তফাত অনুভব করার অভিজ্ঞতাও যদি একটু বলেন।

উঃ পার্থক্যটা প্রধানত নির্ভর করে কোন ভাষা থেকে কোন ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে তার উপর। যদি ধরে নিই যে অনুবাদটি অত্যন্ত সার্থক তাহলেও বাংলা থেকে ওড়িয়া বা হিন্দিতে অনুবাদ করলে মূলের স্বাদ যতটা ধরে রাখা সম্ভব স্প্যানিশ বা রুশ ভাষায় ততটা সম্ভব না। একই ভাবে স্প্যানিশ থেকে ইংরাজীতে অনুবাদ করলে মূলের যতখানি কাছে যাওয়া যায়, বাংলা বা হিন্দিতে করলে অত কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। দুই ভাষার কাঠামো ও প্রকাশভঙ্গীর পার্থক্যের জন্যই তা অসম্ভব। তাই আমার মনে হয় যে অনুবাদে বিষয়বস্তুর ধারণা করায়ত্ত করা গেলেও মূল লেখায় ভাষার যে বিশেষত্ব বা স্টাইল তা অনেকটাই অধরা থেকে যায়। আর এই পার্থক্যটা গদ্যের থেকে কবিতায় আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই কবিতার অনুবাদ একটি সুকঠিন কাজ বলে আমি মনে করি। আমি কবিতার অনুবাদ করতে পারি না।

আজকের তরুণ প্রজন্ম কেন লাতিন আমেরিকার সাহিত্য নিয়ে উৎসাহী হওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন? বিশেষত গার্সিয়া মার্কেস…

১৪৯২ সালে কলম্বাসের লাতিন আমেরিকা পৌঁছান থেকে আজ পর্যন্ত এই মহাদেশটির ইতিহাসে আছে ঔপনিবেশিক আগ্রাসন, নির্বিচারে গণহত্যা, দাসপ্রথা, একনায়কতন্ত্র, অসংখ্য গৃহযুদ্ধ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য, মাদক উৎপাদন ও চোরাচালান, রাজনৈতিক অন্তর্ধান, রাজনৈতিক নির্বাসন, আমেরিকার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ এবং তার পাশাপাশি প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, বিপ্লব। রয়েছে জাতীয় ও আত্মিক সত্তার সংকট এবং শিকড়ের সন্ধান। এমন বিচিত্র ও বহুমাত্রিক বাস্তবের ভূমি থেকে উঠে এসেছে যে সাহিত্য, খুব স্বাভাবিকভাবেই তা মানুষকে সমৃদ্ধ করবে, সে যে প্রজন্মেরই হোক না কেন। আর গার্সিয়া মার্কেস তো ওই মহাদেশের অন্যতম প্রতিনিধি স্থানীয় লেখক, সুতরাং তাঁর সাহিত্যের সচেতন পাঠ ওই ভূখন্ডটিকে চিনে নিতে, তার সত্তার গভীরে প্রবেশ করতে বিশেষ সাহায্য করে।

“একশো বছরের নিঃসঙ্গতা” ছাড়া গার্সিয়া মার্কেসের আর কোন লেখাকে আপনি কালোত্তীর্ণ বলে মনে করেন?

“একশো বছরের নিঃসঙ্গতা” ছাড়া গার্সিয়া মার্কেস নিজে যে উপন্যাসটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তা হল “El otoño del patriarca” বা “কুলপতির শরৎকাল”। পৃথিবীতে যতদিন ক্ষমতার দম্ভ বজায় থাকবে ততদিন এই উপন্যাসটি প্রাসঙ্গিক থাকবে। আর অন্য একটি উপন্যাস, আমার মতে, অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য, তা হল “El amor en los tiempos del cólera” বা “কলেরার সময়ে প্রেম”। এটি তো প্রেমের মহাকাব্য।

 

আপনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য কি কি অনুবাদ করেছেন? আপনার আগে যাঁরা বাংলায় অনুবাদ করেছেন, তাঁদের মধ্যে কে বা কারা অনুসরণ করার মতো বা অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো  বলে আপনি মনে করেন?

গার্সিয়া মার্কেসের একটি উপন্যাস (“Memoria de mis putas tristes” বা “আমার বিষন্ন বেশ্যারা”), বেশ কিছু ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছি। এছাড়া লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের কিছু সাহিত্যিকের ছোটগল্প ও প্রবন্ধ অনুবাদ করেছি, যেমন হুয়ান রুলফো, কার্লোস ফুয়েন্তেস, আলেখো কার্পেন্তিয়ের, বোর্হেস, হুলিও কোর্তাসার, হুয়ান হেলমান, ইসাবেল আইয়েন্দে, হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি, মারিও বেনেদেত্তি, আউগুস্তো রোয়া বাস্তোস, রোবের্তো বোলান্যিয়ো ইত্যাদি।

আমার অগ্রজ অনুবাদকদের সকলেই অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। তাঁরা যে সময় অনুবাদ করেছেন তখন ইন্টারনেট ছিল না; আজকের মতো মূল বই ও অভিধান পাওয়া এত সহজ ছিল না। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করব অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা – তাঁর অনুবাদ পড়েই তো আমরা লাতিন আমেরিকার বিশাল সাহিত্য জগতের অন্দরে প্রবেশ করতে পেরেছি, বিশেষত আমরা যারা ইংরাজী পড়ায় স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। আর বলব তরুণ ঘটকের কথা, আমার প্রথম স্প্যানিশ ভাষার শিক্ষক। তিনিও বহুদিন ধরে স্পেন ও লাতিন আমেরিকা দু’ জায়গার সাহিত্যই অক্লান্তভাবে অনুবাদ করে যাচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিন বাংলার বাইরে আছি, অন্যান্য অনুবাদকদের বই সবসময় হাতে পাইনা, তাই আর যারা অনুবাদ করেছেন ও করছেন তাঁদের কথা আমি বলতে পারব না।

আপনার প্রথাগত শিক্ষা ও স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষা কোথায়, আপনার ছোটবেলা ও বড়বেলা কোথায় কেটেছে এসব যদি একটু বলেন।

উঃ কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে এক ছোট্ট মফস্বল শহর রাণাঘাটে আমার জন্ম। সেখানেই মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার পর বেথুন স্কুলে দু’ বছর পড়েছি। তারপর বাংলা নিয়ে পড়াশুনা করি প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর অনেক পরে তরুণদার (তরুণ ঘটক) কাছে স্প্যানিশ শিখতে শুরু করি এবং ২০০৩ সালে হায়দ্রাবাদের Central Institute of English & Foreign Languages-এ স্প্যানিশ বিভাগে হায়ার ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হই। ওখানে এক বছর পড়ার পর সপরিবারে বাঙ্গালোরে চলে যাই। সেখানে বাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্প্যানিশ পড়াই, প্রায় ন’ বছর। ইতিমধ্যে স্প্যানিশে স্নাতকোত্তর পাশ করি হায়দ্রাবাদের ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই, তখন অবশ্য নাম পালটে হয়েছে English & Foreign Languages University। এর পর ২০১৪ সালে দেরাদুনের দুন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্প্যানিশ বিভাগ থেকে ডাক আসে, ওখানে দু’ বছর পড়ানোর পরে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাঙ্গালোরে ফিরে আসি। এখন অনুবাদ আর অন্যান্য লেখালেখি করি। ইতিমধ্যে ২০১৬ সালে স্পেন ও ইটালি যাওয়া হয় – স্পেনের গ্রানাদা ও কোর্দোবা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইটালির মিলান ও বেরগামো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে। তারপর এ বছরের মে মাসে কলোম্বিয়া যাওয়ার সুযোগ পাই, ওখানকার তিনটি বিশ্ববিদ্যায়ের আমন্ত্রণে। আমার বলার বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্যের জগতে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের স্থান।

ভারতীয় উপমহাদেশ অনেকটা এগোলেও নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আপনি কিভাবে স্বাধীনচেতা লেখিকা হয়ে উঠলেন?

উঃ এর সর্বপ্রধান উৎস আমার মা। মা কোনদিন স্কুলে যাননি, মায়ের গ্রামে সেই সময় মেয়েদের কোনও স্কুল ছিল না। তিনি বাড়িতে দাদুর কাছে লিখতে-পড়তে শিখেছিলেন, তারপর শুধু নিজের আগ্রহেই তাঁর দাদাদের স্কুলের সব বই পড়ে নিতেন। বিয়ের পর রাণাঘাট পাবলিক লাইব্রেরির সদস্যা হন, আজীবন তাঁকে বই পড়তে দেখেছি, আক্ষরিক অর্থে আমৃত্যু তিনি বই পড়েছেন। ৬৩ বছর বয়সে যখন তাঁর সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়, তখন তিনি “শেষের কবিতা” পড়ছিলেন। মা ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা মহিলা আর আমার বাবা ছিলেন খুব উদার মনের মানুষ। তাই আমাদের বাড়িতে অন্যান্য পরিবারের মতো পুরুষতন্ত্রের আধিক্য ছিল না। আমি আমার বয়সী অন্যান্য মেয়েদের থেকে অনেক বেশি স্বাধীনভাবে বড় হয়েছি। মায়ের পরে যে দুটি মানুষ আমাকে গড়ে তুলেছেন তাঁরা হলেন আমার দিদি ও জয় গোস্বামী। দিদিও খুবই স্বাধীনচেতা ছিলেন। মা অসুস্থ থাকায় দিদি আমায় মায়ের স্নেহে বড় করেছিলেন। তারপর লেখাপড়া শেখানো, কলকাতায় নিয়ে আসা, বিয়ে, সবকিছুই আমার ওই দিদি, একাধারে আমার মা ও বাবা। আর সাহিত্যকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার শিক্ষা যাঁর কাছে পেয়েছি, তিনি কবি জয় গোস্বামী। সেই কোন ছোটবেলা থেকে আমি ওনার বাড়িতে যেতাম, দিদির হাত ধরে, জয়দার মা দিদিমনির কাছে। যে স্নেহের আশ্রয় ওনার কাছে পেয়েছি এবং আজও পেয়ে আসছি, তা-ই আমার সাহিত্য ও ব্যক্তি জীবনের প্রধান নির্ধারক।

আমার বিয়ে অবশ্য হয় উত্তর কলকাতার রক্ষণশীল পরিবারে, কিন্তু তাঁরাও খুব ভালো মানুষ ছিলেন, বিশেষত আমার শ্বশুরমশাই। এই পরিবারের আবহে বিধি-নিষেধের ঘেরাটোপ থাকলেও আমাকে তা বাঁধতে পারেনি। আর আমার স্বামীও প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র, সব সময়েই ও আমার পাশে থেকেছে ও উৎসাহ দিয়েছে। লেখার কাজে ফাঁকি দিলে ও আমায় বকাবকি পর্যন্ত করে। তবুও যে বাধা আসেনি, তা নয়। আমাদের সমাজের সর্বত্র এই বাধা ছড়িয়ে আছে। তাই হয়তো আমার ইচ্ছার অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেল। তবে মনের দিক থেকে আমি স্বাধীন, এটাই আমার সৌভাগ্য। আমাদের মেয়েরা তো এই স্বাধীনতাটাই বোঝে না, তাই তাদেরকে বেঁধে ফেলা খুব সহজ হয়।

 

Promotion