Editorial

বাঙালি নারী নিয়ে অশ্লীল মন্তব্যকারী অনীশ সিংয়ের বিরুদ্ধে বাংলা পক্ষের অবস্থান কি সঠিক?

 

অতি সম্প্রতি অনীশ সিং নামক এক মানকুন্ডুর বাসিন্দা ফেসবুকে জাতিবিদ্বেষী পোস্ট করেন। বাঙালি নারীদের নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যে চাঞ্চল্য ছড়ায়। ঘটনার প্রতিবাদে বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠন বাংলা পক্ষ হাজির হয় অনীশ সিংয়ের বাড়ি। অভিযুক্তের মা ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন ক্যামেরার সামনে। সেদিন অনীশ ঘটনাস্থলে হাজির ছিলেন না। এরপর ফের বাংলা পক্ষের সদস্যরা অনীশের বাড়িতে হানা দেন, ক্যামেরার সামনে অনীশকে কাঁদতেও দেখা যায়। ওই যুবক ক্ষমাও চান তার কৃতকর্মের জন্য। এরপরেই বাংলা পক্ষের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অনেকেই সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এমনকি তাদের এই কার্যকলাপকে ‘মব জাস্টিস’ বা ‘খাপ পঞ্চায়েতের’ সঙ্গেও তুলনা করা হয়। অনেকেই এর মধ্যে বিজেপি-আরএসএসের পুলওয়ামা কান্ডের পরবর্তী ঘটনার সাথেও মিল খুঁজে পান। এই প্রসঙ্গেই আমরা গর্গ চ্যাটার্জী, তন্বী দাস এবং অম্লানের প্রতিক্রিয়া জানলাম।

 

অম্লান, স্বাধীন ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের সংগঠক – এই ঘটনাকে সমর্থন করি না। কারণ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যে কারণে বিজেপি একটি ফ্যাসিস্ট শক্তি, তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে বাংলা পক্ষকে তো সেই অর্থে ফ্যাসিস্ট শক্তি বলা যায় না। কিন্তু তারা যে রাজনীতিটি করছে, তা বহুদিন ধরেই একটি পাল্টা ফ্যাসিস্ট রাজনীতির চেষ্টা। প্রোটো ফ্যাসিস্টও বলা যেতে পারে। এখন ফ্যাসিস্টকে তো ফ্যাসিস্ট দিয়ে আটকানো যায় না। বাংলা যে কারণে সাংস্কৃতিক প্রতিস্পর্ধা, সেই প্রশ্নে বাংলার অবশ্যই একটি গুরুত্ব রয়েছে, বাংলা ভাষারও গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বাংলা পক্ষ আসলে যেটি করে ফেলছে সেটি হল, কলকাত্তাইয়া যে বাবু কালচার, অর্থাৎ বড়লোকের যে বাংলা, তার প্রতিনিধিত্ব করে ফেলছে। দেখা যাবে ইংরেজি আগ্রাসন নিয়ে তাদের অতো বক্তব্য নেই, অথচ হিন্দি আগ্রাসন নিয়ে বক্তব্য রাখে। তারা গরিব খেটে খাওয়া মানুষকে হেনস্থা করে। বাড়ি গিয়ে খাপ পঞ্চায়েত খুলে বসে যেটি আদতে ফ্যাসিস্টদের মতোই দেখতে লাগে।

অন্যদিকে আদিবাসী সংস্কৃতি নিয়ে বাংলা পক্ষের বিশেষ কোনও বক্তব্য নেই। বরং তারা উর্দু নিয়ে কিছু কর্মসূচি নিয়ে ফেলে, যে উর্দুর বিরোধিতা আরএসএসও করে থাকে। ফলতঃ এটি ক্রমশ প্রো-ফ্যাসিস্ট রাজনীতির দিকেই চলে যাবে। বাংলা যদি না প্রতিস্পর্ধার ভাষা হয়ে ওঠে, বাংলা যদি না বিদ্রোহের ভাষা হয়ে ওঠে, তাহলে তো বাংলা একটি শাসক শ্রেণীর ভাষা হয়েই থাকবে। আমি যে হিন্দি আগ্রাসনের বিরোধিতা করি, সেটি বাংলা পক্ষও করে। সেটি করতে গিয়ে তারা বাংলা আধিপত্যবাদের সূচনা করছে। কোনও আধিপত্যই বেশিদিন টিকতে পারে না, কারণ বাংলা প্রতিস্পর্ধার ভাষা।

 

তন্বী দাস, বাংলা পক্ষ – অনীশ সিংয়ের বাড়ি যাওয়ার দু’দিন আগে আমাকে খবর দেওয়া হয় আমাকে যেতে হবে। গোটা ঘটনাটিও আমি ফেসবুকের দৌলতে জানতে পারি। এই মুহূর্তে সংগঠনের অভ্যন্তরে যে আইডেন্টিটি কনফ্লিক্ট তৈরি হয়েছে, সেটি তখনও হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই একজন সিনিয়র হিসেবে আমি বাংলা পক্ষের বাকি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছই। অনীশ সিং যে সোসাইটিতে থাকে, সেই জায়গায় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলা হয়। অনীশের মা আমাদের সামনে আসেন, তাকে গোটা ঘটনাটি আমরা জানাই।  একজন মা হিসেবেই অনীশের মা-কে প্রশ্ন করি, আপনার কি উচিৎ ছিল না আপনার ছেলের গতিবিধিতে অভিভাবক হিসেবে নজর রাখা? কেন এভাবে জাতিগত হিংসা ছড়াচ্ছে সে? ওই ভদ্রমহিলা অত্যন্ত লজ্জিত ছিলেন এবং ছেলে ফিরলেই তাকে কড়া শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে আমি কখনোই হিংসার পক্ষে ছিলাম না। পরের দিন বাংলা পক্ষের তরফে ফের যাওয়া হয় অনীশের বাড়িতে, আমি সেখানে হাজির থাকতে পারিনি। দ্বিতীয় দিন যে পদ্ধতিতে ক্ষমা চাওয়ানো হয় আমি তা মানতে পারছি না। আমার মনে হয় না আমরা এভাবে সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারবো। অবাঙালিরা আমাদের বিরুদ্ধে যেরকম হিংসা প্রদর্শন করে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরাও সেই হিংসার পথ নিতে পারি না।

 

গর্গ চ্যাটার্জী, বাংলা পক্ষ – এটি কোনওভাবেই মব-লিঞ্চিং বা মব-জাস্টিসের ঘটনা নয়। বরং ছেলেটি যে ধরণের কান্ড ঘটিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মব-লিঞ্চিং থেকে ছেলেটিকে বাঁচানো। যারা পুরোপুরি ঘটনাটি জানেন না, তারা হয়তো এটিও জানেন না যে এলাকার লোক ক্ষেপে রয়েছে ছেলেটির ওপর। জাতিকে নিয়ে কেউ এরকম কুৎসিত মন্তব্য করলে কেউ তাকে ছেড়ে দেয় না। কাজেই ঘটনাটি আঁচ করে বাংলা পক্ষের সহযোদ্ধারা সেখানে উপস্থিত হন।

তারা অনীশের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এই মা একজন আদর্শ মা, কারণ সেই মা সন্তানকে সুশিক্ষা দেওয়ার পক্ষেই বলেন। ভিডিওটি ভালো করে দেখলে দেখতে পাবেন, আমাদেরই এক সহযোদ্ধা অমিত সেন তার মা-কে বলছেন, “ছেলেকে মারবেন না”। বাংলা পক্ষ আগামী দিনে তার কাছে মনোবিদ নিয়ে যাবে, কারণ মানসিক বিকার থেকেই এভাবে জাতিবিদ্বেষ জন্ম নেয়। যাতে আগামীদিনে বাংলার মাটিতে আগামী দিনে অনীশ আর পাঁচ জনের মতো সুস্থভাবে বাঁচতে পারে। এর সঙ্গে মব-লিঞ্চিং, মব-জাস্টিস বা খাপ-পঞ্চায়েতের কোনও সম্পর্ক নেই।

Promotion