জগতের বাহার

কাশীশ্বর মন্দির – হাওড়ার আন্দুলের এক প্রাচীন শিবমন্দির

হাওড়া জেলার সদর মহকুমা অন্তর্ভুক্ত সাঁকরাইল থানার আন্দুলে সরস্বতী নদীর পশ্চিম পারে মন্দিরটি অবস্থিত। চৌধুরী পাড়ায় অবস্থিত প্রাচীন এই শিবালয়। মন্দিরের অধিষ্ঠিত শ্রীশ্রীকাশীশ্বর জিউ এই এলাকার প্রাচীন এক দক্ষিণ-রাঢ়ীয় কায়স্থ ভূস্বামী পরিবার দত্তচৌধুরীদের কুলদেবতা। এঁদের পারিবারিক ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায় যে ষোড়শ দশকের মধ্যভাগে শ্রীযুক্ত কাশীশ্বর দত্তচৌধুরী সরস্বতী নদীতে রোজকার মতোই স্নান করতে গিয়েছিলেন। ঠিক সেইসময় তাঁর দিকে একটি পাথর ভেসে আসায় সেটিকে তোলেন। সেই পাথর মহাদেবের স্বয়ম্ভু স্বরূপ তথা একটি বাণলিঙ্গ হিসেবে শ্রদ্ধাপূর্বক প্রাসাদে নিয়ে এলেন।

বলা হয়, এই ঘটনার কিছু দিনের মধ্যেই কাশীশ্বর মহাশয় স্বপ্নবর পেয়েছিলেন স্বয়ং মহাদেবের থেকে। সেই স্বপ্নে দেবাদিদেব কাশীশ্বরকে জানান যে পরিবারের কেউ সর্পাঘাতে মরবে না। এরপর তিনি সেই পাথর তথা বাণলিঙ্গটি উদ্ধার করার বিষয়টাকে দৈব ঘটনা বলে মেনে নিয়েছিলেন। পরিবারের কুলদেবতা হিসেবে সেটিকে প্রতিষ্ঠা করার মনঃস্থির করেন। কিছু মাসের মধ্যে তাঁর নির্মিত পরিবারের দুর্গাদালানের ঠিক পাশেই একটা মন্দির তৈরী করে সেখানেই পাথরটি কুলদেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন। তারপর কুলপ্রথা অনুযায়ী দেবতার নিত্য সেবার জন্য ‘শ্রীশ্রীকাশীশ্বর দেবোত্তর’ নামে কিছু চিরস্থায়ী সম্পত্তি নির্দিষ্ট করে দেন।

উড়িষ্যার পাঠান, আরাকানের মগ,পর্তুগীজ এবং ১৭৪১ খ্রিস্টাব্দে বর্গীদের দ্বারা বারবার এই দত্তচৌধুরী পরিবার লাঞ্চিত হন। এটি জানতে পারা যায় তাদের পারিবারিক ইতিহাস থেকে। সেই সময়ে আক্রমণকারীদেড় মধ্যেই কেউ এই মন্দির আক্রমন করেছিল। কাশীশ্বর-বাণলিঙ্গকে লুট করে নিয়ে যায় আন্দুলের দুলেপাড়াতে। কথিত আছে, মশলা বেটে সেখানকার এক পানা-পুকুরে সেটিকে ফেলে দেয়। বেশ কিছুদিন ধরে কুলদেবতা নিখোঁজ হওয়াতে চিন্তায় পড়েছিল সেই জমিদার পরিবার। ঠিক তখনই তাঁদের অনুগত প্রজা দুলেরা কাশীশ্বর-দেবকে দেখতে পায় ভাসমান অবস্থায় সেই পুকুরের এক কোণে। ‘এ তো কাশীশ্বর!’। খবর চলে গেলো দত্তচৌধুরী মহাশয়দের কাছে, ‘বাবু , কাশীশ্বরকে পাওয়া গেছে’। দুলেরা তখন সেই দেবলিঙ্গ উদ্ধার করে পুনরায় কুলমন্দিরে নিয়ে আসলেন। কিছু মাসের মধ্যেই এই বাণলিঙ্গটির সঙ্গে সেই মাপে তৈরী করা একটি যোনি আকৃতি কষ্টিপাথর যুক্ত করা হয়। এটি করার কারণ যাতে পুনরায় কেউ সহজে এটি উঠিয়ে নিয়ে যেতে না পারে।

এইভাবে দুলেরা তাদের বাবুদের কুলদেবতা উদ্ধার করার স্বীকৃতি একটু অন্যভাবেই অর্জন করেন। দত্তচৌধুরীদের আদেশানুসারে প্রতি গাজন উৎসবের দিন দুলেরা শোভা-যাত্রা করে তাদের দুলেপাড়াতে নিয়ে গিয়ে এই দেবলিঙ্গ মহানন্দে সেবা এবং পুজো করে। এই জন্যে দুলেরা তাদের পাড়াতে একটি মন্দিরও স্থাপন করেছেন। এক সপ্তাহ ধরে চলে তাদের সেই সেবা ও পুজো, যার পর তারা পুনরায় ফেরত দিয়ে যায় শিবলিঙ্গ। এই রীতি আজও চলে আসছে। শিবরাত্রি এই মন্দিরের বিশেষ উৎসব। তাছাড়া নীলষষ্ঠীতেও বিশেষ পুজোর ব্যবস্থা থাকে এই দেবালয়ে।       চিত্র ঋণ – ধ্রুব দত্ত চৌধুরী।

Promotion