EXCLUSIVE NEWS

পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষায় কলকাতায় নাগরিক কনভেনশন ২৪ এপ্রিল

অযোধ্যা পাহাড়ে প্রকৃতি-পরিবেশ এবং মানবাধিকার রক্ষার যে লড়াই শুরু হয়েছিল ২০১৮-র জুন–জুলাই থেকে, সেই লড়াই এই মুহুর্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ২০১৮-র অক্টোবরে সারা বাংলা যখন দুর্গোৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা, ঠিক সেই সময় অযোধ্যাবাসী গোটা পাহাড় জুড়ে অযোধ্যা বাঁচানোর তাগিদের কথা ঘোষণা করেন। নবমীর দিন অযোধ্যা পাহাড় চুড়োর মেলায় একটি প্রচারপত্র হাতে হাতে ফিরতে দেখা যায়। প্রচারপত্রের হেডিং এ লেখা – “ঐতিহ্যমন্ডিত পবিত্র সুতানতান্ডির অযোধ্যা রক্ষার্থে আদিবাসীদের চাই জঙ্গলের অধিকার”। জঙ্গলের অধিকার কার? এই নিয়েই অয্যোধ্যায় বেজেছে লাগড়া। সপ্তাহান্তিক ভ্রমণের হটস্পট অযোধ্যা পাহাড়ে যারা বেড়াতে যান তাদের কাছে আপার ড্যাম লোয়ার ড্যাম প্রধান বেড়ানোর যায়গা। মোদ্দায় অযোধ্যা ট্যুরিজম ঘুরে বেড়ায় এ ড্যাম থেকে সে ড্যাম। এই ড্যাম কী করে ‘আযোদিয়া বুরু’র মৃত্যু ডেকে আনছে তাই নিয়ে অযোধ্যাবাসী আরো একটি প্রচার পত্র করেন নভেম্বর মাসে।

জুলাই থেকে অয্যোধ্যায় চলেছে পালা করে গ্রাম মিটিং। যার মূল উদ্যোক্তা থেকেছেন সাধারণ অযোধ্যাবাসী। সাহায্যকারী ভুমিকা নিয়েছেন হাওড়া, ঝাড়গ্রাম, কলকাতা থেকে অযোধ্যাকে ভালোবেসে ফেলা কিছু শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী। গ্রাম মিটিংগুলি মূলতঃ চলেছে অযোধ্যাবাসীকে তাদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করার মাধ্যমে অধিকার রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে পারার মতো জায়গায় সমষ্টিগতভাবে পৌঁছতে। কী তাদের অধিকার? দীর্ঘ আন্দলনের ফলশ্রুতিতে পাওয়া সাংবিধানিক অধিকার – বনের অধিকার। বনাধিকার আইন বলে, কোনও জঙ্গল এলাকায় প্রকল্প করতে গেলে সম্মতি নিতে হবে ওই জঙ্গলে বসবাসকারী অথবা জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর অন্তত ৫০% মানুষের। এই অধিকার সাম্প্রতিক অতীতে রক্ষা করেছে জঙ্গল-নির্ভর মূলনিবাসী মানুষকে। নিয়মগিরিতে ভেদান্তের গ্রাস থেকে ডোংরিয়া, কোন্ধরা রক্ষা পেয়েছেন অনেকাংশে এই বনাধিকারের বলেই। অযোধ্যায় বনাধিকারকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঠুড়গা নদীর গতি রোধ করে ২৯৪ হেক্টর বনভূমি কৃষিভূমিতে পাম্পড পাওয়ার স্টোরেজ প্রকল্প গড়ার কাজ শুরু করে দেয় রাজ্য-কেন্দ্র যৌথ উদ্যোগ। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোওপারেটিভ এজেন্সির থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ধার করে ডব্লুবিএসিডিসিএল-এর এই প্রকল্প গড়ার কথা। প্রকল্প গড়তে কাটা পড়ার কথা প্রায় ৩ লক্ষ গাছ, যদিও সরকারি নথি দাবী করছে মাত্র ৬৬০০ গাছ! শুকিয়ে যাওয়ার কথা ঠুড়গা নদী, ডুবে যাওয়ার কথা বেশ কিছু পাহাড় যার মধ্যে একটি পাহাড়ের নাম মারাংবুরু পাহাড়। ১২ টি হাতির বাসস্থান, প্যাঙ্গোলিন, ট্রিশিউ অগণিত প্রজাতি বৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাবার কথা। নষ্ট হয়ে যাবার কথা অন্ততঃ ৩০ টি গ্রামের জীবন-জীবিকা। সুদূরপ্রসারী ঋণাত্মক প্রভাব পড়ার কথা অন্তত ৬৫ টি গ্রামের মানুষের স্বাধীন জীবন-জীবিকার উপর। এই যে এত কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা সেসব সরকার বাহাদুরের ইআইএ রিপোর্টে কিচ্ছুটি বলা নেই।

সরকারি আমলা জেলাশাসক প্রয়োজন বোধ করেননি গ্রামসভা করে বনাধিকার আইন অনুযায়ী গণ শুনানীর মাধ্যমে গ্রামবাসীদের সম্মতি নেওয়ার। আসলে জেলাশাসকের কাছে বোধহয় অরণ্যবাসীর সাংবিধানিক অধিকার জুতোর ধুলো ছাড়া কিছুই নয়। মিথ্যা কথা বলে মাত্র ২৪ জন গ্রামবাসীর থেকে সই করিয়ে নেওয়া হয় সম্মতিপত্রে। কেবল মাত্র অযোধ্যা গ্রাম পঞ্চায়েতেই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১৮০০-র বেশি। ২৪ জন তার কতো শতাংশ হয়? গ্রামবাসীরা পরিনতি যা হতে চলেছে তা আঁচ করে ক্রমশ জোট বেঁধেছেন। চোখের সামনে খোলা চিঠির মতন পড়ে রয়েছে আপার ড্যাম লোয়ার ড্যামের পিপিএসপি তৈরীর সময় সরকারের দেওয়া যাবতীয় প্রতিশ্রুতির কবর খানা। যে প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস মৃত্যু প্রসব করেছিলো অযোধ্যাবাসীর জন্য। গতবছর সেপ্টেমবেরে শেষদিক নাগাদ অযোধ্যা পাহাড়ের বারেলহর গ্রাম থেকে সারা অয্যোধ্যার প্রতিনিধি হয়ে তিন জন গ্রামবাসী কোলকাতা হাইকোর্টে পিটিশন দাখিল করেন। পিটিশনার রবি বেসরা, মুনিরাম টুডু, সুশীল মুর্মু বারে বারে কোলকাতায় এসে বিচারালয়ের দরজায় অধিকার দাবী করেছেন।

এই সবের মধ্যেই সরকার বাহাদুরের পেয়াদারা প্রায় ৫০০ টি গাছ রাতারাতি কেটে নেয়। গ্রামবাসীদের নজরে আসলে তাঁরা তৎক্ষণাৎ গাছ কাটা আটকান সমবেত ভাবে। অবশেষে ১৬ই জানুযারি হাইকোর্ট গাছ কাটার উপর স্থগিতাদেশ জারি করেন ৩১ মার্চ অবধি। এর পর শুরু হয় শাসক দল এবং পুলিশের হুমকি। কখনো গ্রেফতারের হুমকি কখনো মাওবাদী কেসের হুমকি প্রায় প্রতি দিনের রুটিন হয়ে ওঠে। কিন্তু অযোধ্যাবাসী হাল ছাড়ছেন না দেখে পিটিশনারদের টাকা ও চাকরির লোভ দেখানো হতে থাকে। তাতেও কাজ হয়নি বেচারা বাহাদুরের। ক্রমশ অযোধ্যা জুড়ে গ্রাম মিটিংগুলি ছড়িয়ে পড়েছে ক্রমশ। মেয়েরা অগ্রণী ভুমিকা নিয়ে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। মিটিংগুলি এখন তিরিশ চল্লিশ জনের থেকে তিনশো-চারশো জনের হয়ে উঠেছে। সারা পাহাড় জুড়ে দেওয়ালগুলি ভরে উঠেছে – “আমরা ঠুড়গা প্রকল্প চাইনা, প্রকৃতি আমাদের মা তাকে ধ্বংস হতে দেব না” স্লোগানে, স্লোগানে। এর মধ্যে পাহড়ের কিছু অলাভজক সংস্থা এবং ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের পুরুলিয়া জেলার সদস্যরা আন্দোলনকারীদের পাশে এসে দাঁড়ান। আর হাওড়া, ঝাড়গ্রামের মাস্টারমশাই ও ছাত্রছাত্রীরা তো ছিলেনই অযোধ্যাবাসীর পাশে। গত ১৭ এপ্রিল কোলকাতা হাইকোর্ট জেলাশাসকের কাজকে তিরস্কার করে পুনরায় স্থগিতাদেশ দিয়েছেন ৩১ আগষ্ট অবধি। অযোধ্যায় ইতিমধ্যে তৈরী হয়েছে ‘প্রকৃতি বাঁচাও আদিবাসী বাঁচাও মঞ্চ’। এদিকে এই আন্দোলনের সংহতিতে গড়ে উঠেছে ‘অযোদিয়া বুরু রক্ষা আন্দোলন সংহতি মঞ্চ’। এই সংহতি মঞ্চের ডাকে আগামী ২৪ এপ্রিল কলকাতার ভারতসভা হলে একটি কনভেনশনের আয়োজন করা হয়েছে। উপস্থিত থাকবেন অযোধ্যা পাহাড়ের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা মানুষেরা। জমিতে এবং কোর্টে অযোধ্যার লড়াই নতুনের কথা বলছে। মঞ্চের নাম নির্দিষ্ট আন্দোলনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকা সেই নতুনের সুচকগুলির একটি বলে মনে করা যায়।

Promotion