Notice: Undefined index: status in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/plugins/easy-facebook-likebox/easy-facebook-likebox.php on line 69

Warning: Use of undefined constant REQUEST_URI - assumed 'REQUEST_URI' (this will throw an Error in a future version of PHP) in /home/dailynew7/public_html/exclusiveadhirath.com/wp-content/themes/herald/functions.php on line 73
রাজকুমার রায় – দোসর যার মাটির গান - Exclusive Adhirath
প্রত্যাশার পারদ

রাজকুমার রায় – দোসর যার মাটির গান

প্রতিকূলতার প্রাচীর অতিক্রম করে তিনি আজ জয় করেছেন তাঁর স্বপ্নকে। এই মাটির মানুষটির পথচলায় দোসর মাটির গানই। সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তীব্র। এদিকে তাঁর প্রতি মানুষের তীব্র আকর্ষণকে চরিতার্থ করতেই এক বিকেলে ‘এক্সক্লুসিভ অধিরথ’ হাজির হল তাঁর বাড়িতে।

এই গরমে কেমন আছেন দাদা?

সব মানুষ যেমন আছেন তেমনই আছি। আমার জন্য আলাদা করে কিছু নয়। তবে ঠাণ্ডা এবং বসন্ত ভালবাসি কিন্তু গরম ভালবাসি না সেটাও নয়। “বিরস দিন, বিরল কাজ,‌ প্রবল বিদ্রোহে এসেছ প্রেম”।

একটি টেলিভিশন চ্যানেলে আপনাকে সঞ্চালনা করতে দেখা যাচ্ছে। ঠিক কী রকম সেই অনুভূতি?

এই চ্যানেলটি যেহেতু স্যাটেলাইট চ্যানেল সেহেতু সবাই দেখতে পাচ্ছেন। শোভেন সূর এবং সন্দীপ পালের কাছে এই স্যাটেলাইট চ্যানেলে আমাকে নিযুক্ত করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। অনেক গ্রাউন্ড চ্যানেলে এর আগে করেছি কাজ, বর্তমানেও করছি। আমার প্রথম সঞ্চালনা কিন্তু একটি গ্রাউন্ড চ্যানেলেই। সেখানে অমর পাল, পূর্ণদাস বাউলের মাপের শিল্পীরা আমার অনুষ্ঠানে গান গেয়ে গিয়েছেন।  একটি বেসরকারি চ্যানেলের দেবাশিস দা আমাকে এই সঞ্চালনার ক্ষেত্রে সাহস জুগিয়েছেন। এই কাজের অনুভূতি ভীষণই ভালো। আমি অ্যাঙ্করিংয়ের ব্যাকরণ জানি না। সহজাত ভঙ্গীতে যেটা মনে আসে সেটাই বলি।

আপনি ছাত্রজীবনে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া সায়েন্সের ছাত্র ছিলেন। সেই জায়গা থেকে সঙ্গীতকে কেন বাছলেন?

হ্যাঁ, পড়াশুনাটাও যথেষ্টই ভালোবাসতাম। যদিও গানটা ছোট থেকেই আমাকে কুরে কুরে খেতো। আমি ৮ বছরে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীকে আমি সামনাসামনি শিখিনি। কিন্তু ওনাকেই আমি আমার গুরু মানতাম। আমি সরস্বতী পুজোয় একবার আলপনা দিচ্ছি। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গান রেডিওতে শুনে আমার চোখ দিয়ে অঝোরে জল বেরিয়ে যাচ্ছে। গানকে কীভাবে ভালবাসতে হয় সেটা আমি ওনার থেকেই শিখেছি। সেই সময় আমি জুলজি পড়তাম এবং পড়াতাম। সেক্ষেত্রে সমস্যা ছিল সময়ের, কারণ পড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় দিতে হত। গান বাজনার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সময় দিতে হতো। তাই একটা সময় গানকেই বেছে নিই।

আপনার সঙ্গীতযাত্রার শুরুটা কবে থেকে ছিল? আপনার গুরু কারা ছিলেন?

সঙ্গীতযাত্রার শুরুটা আমি ওই ভাবে বছর ধরে, সময় ধরে একদমই বলতে পারবো না। অনেকেই বলে ফেলেন দেখি কিন্তু আমি পারিনা। আমি জানিনা সঙ্গীত কবে অজান্তেই আমার ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। আমি ছোট থেকেই ভালোবাসার তাগিদে অন্য একটি বাড়িতে মানুষ হয়েছি। সেখানে গানের পরিবেশ একেবারেই ছিল না। কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় নির্ধারণ করেই পাঠান কে কোন দিকে যাবেন? তাই কবিগুরুর ভাষায় বলি, “আমি তোমার ভুবন মাঝে,লাগিনি নাথ কোনও কাজে, শুধু কেবল সুরে বাজে অকাজের এই প্রাণ”। তো আমার মনে হয়েছিল অকাজের মধ্যে এইটুকু কাজই করতে পারবো। এই প্রসঙ্গে একটি ছোট্ট কথা ভাগ করে নিতে চাই। খুব স্বচ্ছল বাড়িতে মানুষ হইনি। টিফিনের জন্য রোজ ১ টাকা করে পেতাম। ৫০ পয়সা করে রোজ বাঁচাতাম। দিদির থেকে আরও কিছু টাকা নিয়ে মোট ১৮ টাকা দিয়ে মাসে একটি ক্যাসেট কিনতাম। সেটা ছিল নয়ের দশকের গোড়া।

রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রথম শিখি শ্রীরামপুরেই সুনীল কুমার মল্লিক মহাশয়। তারপর শ্রীমতী মায়া সেন, সুভাষ চৌধুরি, ডঃ শৈলেন দাস, সুবিনয় রয়। অতুলপ্রসাদী, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত শিখেছি দিলিপ কুমার রায়, শিখা বসু এবং সুশীল চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের কাছে। আধুনিক গানের গুরু ছিলেন অনল চট্টোপাধ্যায়। নজরুল গীতি ও গজল সুকুমার মিত্রের কাছে। লোকগানের ক্ষেত্রে আমাকে পথ দেখিয়েছেন শ্রদ্ধেয় অমর পাল, দীনেন্দ্র চৌধুরি, বিষ্ণুপদ দাস, শুভেন্দু মাইতি, অভিজিত বসুরা। লোকসঙ্গীত সংগ্রহে রাখা প্রয়োজন কারণ অনেক গান হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘুরতে ফিরতে গান শিখি অনেকের কাছেই। সেভাবে দেখতে গেলে গুরুর সংখ্যা বলে শেষ করা যাবে না।

একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই মূলতঃ মানুষ আপনাকে চেনেন। কিন্তু শোনা গিয়েছে আপনি যে বিশেষ পাঞ্জাবী পড়েন তাঁর ডিজাইনও আপনারই করা। কী করে এই ধারনাটি আপনার মনে এলো?

একবার আমার একটি গান হিট করেছিল। গানটি ছিল শুভঙ্কর-ভাস্করের গাওয়া ‘তোকে আমি স্বপ্নে দেখি’। একটি বিখ্যাত এফএম চ্যানেলে প্রশ্ন করা হয়েছিল গানটি কীভাবে মাথায় এলো? তাঁর উত্তরে আমি বলি, বালি হল্ট স্টেশনে হঠাৎ করে গানটি যেমন মাথায় এসেছিল তখনই মনে হয়েছিল এর সঙ্গে পাঞ্জাবীর ব্যাপারটি মিলিয়ে দিলে কেমন হয়! কাজেই সেটাই আমি শেষ পর্যন্ত করি, যা মানুষও অত্যন্ত ভালো ভাবে নেন। একদম ভেতরের তাগিদ থেকেই এটি এসেছে।

তাহলে ভবিষ্যতে কি আপনি বুটিক খুলতে চলেছেন? গানের পাশাপাশি আপনার ভাবনার ফসল হিসেবে আমরা আপনার তৈরি পাঞ্জাবী-জামা পেতে চলেছি?

অবশ্যই, নিজের সৃষ্টিযদি অন্যের গায়ে চড়ে সেটি তো খুব আনন্দের বিষয়। তবে একটি বুটিক সঠিকভাবে চালাতে গেলে প্রচুর অর্থলগ্নির প্রয়োজন, যেটি এই মুহূর্তে আমি করতে অপারগ। তাই যদি যদি কোনও প্রডিউসার আসেন তাহলে কাজটি সহজ হয়।

গানের জগতে কি কি উল্লেখযোগ্য কাজ এখনও করেছেন?

এইভাবে হয়তো মনেই পরবে না। ধরা যাক, বাংলাদেশ হাইকমিশনারের অনুষ্ঠান যেখানে চারটে বোদ্ধা শ্রোতাদের গান শোনাচ্ছি যারা হয়তো গল্প করছেন মাঝে মধ্যেই। তাঁর থেকে একটি ছোট্ট বাচ্চা যে সারেগামা বলতে পারে না তাঁকে ৩ মাসের মধ্যে মঞ্চের উপযোগী করে তোলা অনেক বেশি উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় এমন মঞ্চে হয়তো গান গাইছি যে মঞ্চের দামই হয়তো ১০ লক্ষ টাকা। কিন্তু সেখানে শ্রোতা হয়তো ভালো নেই, সেটি আমাকে স্পর্শ করে না। অথচ ডোমজুড়ে একটি ছোট্ট গ্রামে গান গাইছি, শ্রোতারা উদ্বেলিত হয়ে বলছেন গান ভালো লেগেছে তখন তা মন ছুঁয়ে যায়।

আপনার সমসাময়িক বেশ কিছু সঙ্গীতশিল্পী এই মুহূর্তে মুম্বইতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। আপনি সেখানে মুম্বই গেলেন না কেন?

আমার কিছু পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যার জন্য আমি ফুল স্ট্রাগলটি করতে পারি না। এমনকি কলকাতার ক্ষেত্রেও আমি অনেক ক্ষেত্রে সেই যোগাযোগ সর্বদা করতে পারি না পারিবারিক কিছু সমস্যার জন্য। তবে আগামী দিনে যে এটি করবো না সেটিও না।

অতীতে ‘গেঁয়ো’ নামে আপনার একটি বাংলা ব্যান্ড ছিল। সেটির ব্যাপারে কিছু বলুন।

আসলে ‘ব্যান্ড’ বলে আলাদা কোনও ধারণার অস্তিত্ব অন্ততঃ আমার কাছে নেই। আমরা যখন এককভাবেও গান করি তখনও তো সেটি ব্যান্ডই, কারণ সবাই মিলেই বাজাচ্ছেন। ওই সময় ভূমি, ফসিলস, চন্দ্রবিন্দুর মতো কিছু ব্যান্ড দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তখন একটি প্রখ্যাত প্রোডাকশন হাউজ জানাল, একক শিল্পীর ক্ষেত্রে বাজেট পোষাচ্ছে না। এই পটভূমিতেই গেঁয়োর জন্ম হয়েছিল। গেঁয়োকে নিয়ে খানিকটা এগোনোর পরে ভাঙন ধরে। তারপর সেটি নিয়ে এগোনো হয়নি। মানসিকতার দিক দিয়ে আগেও একসঙ্গে গানবাজনা করতাম, এখনও করি। তাই তুমি রাজকুমারও বলতে পারো, গেঁয়োও বলতে পারো।

আপনি একসময় বেশ কিছু জনপ্রিয় আধুনিক গানে সুর করেছেন। তাহলে এখন আপনাকে আমরা সুরকার হিসেবে পাচ্ছি না কেন?

ওই যে সময়; সময় বদলায়। এখন সবটাই প্রয়োজন ভিত্তিক হয়। সুতরাং আমার মনে হয় বেসিক গানবাজনার একটি খরা চলছে। সুর হয়তো করছি, কিন্তু সেভাবে পাবলিশড করছি না।

প্লে-ব্যাক শিল্পী হিসেবে কেন আপনাকে দেখা গেল না?

আমি যদি কোনও সিনেমায় নিজে মিউজিক করতাম তাহলে নিজে প্লে-ব্যাক করতাম না। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু সিনেমায় ফোককে ভীষনভাবেই ব্যাবহার হচ্ছে। সেখানে আমি করতেই পারি, অতীতেও করেছি। শেখর দাসের ছবি ‘নয়নচাঁপার দিনরাত্রি’ তে আমি গান গেয়েছি।

রিয়্যালিটি শো কি শিল্পী তৈরি করে নাকি তারকা তৈরি করে?

অবশ্যই খুব প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন এটি। তারকা তৈরি করে রিয়্যালিটি শো। শিল্পীর মধ্যে যে শিল্পবোধ থাকে সেটাকে কেড়ে নেয় রিয়্যালিটি শো। বিখ্যাত এক তবলিয়া বলছিলেন, রিয়্যালিটি শো মানুষকে এতোটা অহঙ্কারী করে তুলছে যেটি শিল্পীসুলভ নয়। আমার মনে হয় তাই বহুদিন এগুলির সেরকম রমরমাও দেখতে পাচ্ছি না। তারকা শুধু রিয়্যালিটি শোই তৈরি করে না। আমার কাছে সাড়ে ১৭ বছর ধরে গান শেখা ইমন চক্রবর্তী কিন্তু সেরকম অমুক জলসা বা তমুক বাংলার ছাপ লাগা প্রোডাক্ট নয়। বরং এক স্বাধীন শিল্পী হিসেবেই সে আত্মপ্রকাশ করেছে।

লোকসঙ্গীতে আমরা বারবার যে ‘বাউল’ শব্দটি শুনি, সেটি কী একটি ধারণা?

বাউল একটি জীবনচর্চা। আমরা ভাগ করে ফেলি বীরভূমের বাউল বা নদিয়ার বাউল। বাউল একটি দর্শন। তাই সেটিকে কোনও ক্যাটেগরিতে না ফেলাই ভালো। তাই আমি এই প্রশ্নের সঙ্গে একমত, বাউল একটি ধারণা।

আপনার কিছু উল্লেখযোগ্য ছাত্রছাত্রীর নাম বলুন।

ইমন তো রয়েইছে। তাছাড়া মধুরিমা বসু, মধুবন্তী বসু, সহেলি বসু, স্নিতা প্রামাণিকরা ভালো কাজ করছে। আরও কিছু নাম আছে যেগুলি এখনই বলছি না, কিছুদিন পরে হয়তো মানুষ এমনিই জানতে পারবেন।

আপনি সঙ্গীত প্রশিক্ষক হিসেবে যথেষ্টই পরিচিত। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে গান শিখতে আসা ছাত্রছাত্রীর তুলনায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের মনোভাব কতোটা পাল্টেছে?

আগে গান শিখতে আসতো, এখন তারকা হতে আসে। গানের প্রতি ডেডিকেশন অনেকটাই কমেছে গত ৫ বছরে অন্ততঃ। অনেকে এরকম আছেন যে গান শিখতে এসে আমাকে ধন্য করছেন। আবার অনেকেই মাসে ১ দিন করে এসে মুখ দেখিয়ে যান। যাতে কোনও চ্যানেলে সুযোগ এলে তাঁর সদ্ব্যবহার করতে পারা যায়। তবুও প্রতি একশো জনে ৫ জন এরকম থেকেই যান যারা ভালবেসে এখনও শেখেন।

আপনার গুরুর প্রজন্ম, আপনার প্রজন্ম এবং বর্তমান প্রজন্ম; এই তিন সঙ্গীত প্রজন্মের মধ্যে কী মূল পার্থক্য রয়েছে?

গুরুর প্রজন্ম সবটাই ডেডিকেশন। আমার প্রজন্ম কিছুটা ডেডিকেশন, কিছুটা ফেম। আর বর্তমান প্রজন্ম ১০০ শতাংশ ফেম।

যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কি সঙ্গীতের ক্ষতি করছে?

আবারও বলতে হয়, যন্ত্রের ওপর তখনই আস্থা রাখতে হয় যখন নিজের ওপর ভরসা থাকে না। আগেকার দিনে পঞ্চাশ জন শিল্পী একসঙ্গে ফ্লোরে বসে আছেন, একজন গাইছেন। কোনও একজন ভুল করলে আবার নতুন করে হবে। এই যে সুরের বিনিময়, ভাবের বিনিময়, রিহার্সাল এগুলো কোথায় গেল? এতো টেকনোলজি সত্ত্বেও একটি গানও দাড়াচ্ছে না। এক বিশিষ্ট শিল্পী রেগে একটি চ্যানেলে বলেই দিলেন যে শ্রোতার মৃত্যুবরণ করা উচিৎ। স্বাভাবিকভাবেই এই হতাশা চলে আসছে। স্টুডিওতে সময় বাঁচানোর জন্য একটি বেসুরো গান কোনওরকমে ৫০০ টাকায় পিচ কারেকশান করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হল। কাজেই সঙ্গীতের ক্ষতি তো বটেই।

আজকাল দেখা যায় একসঙ্গে সহশিল্পীর সঙ্গে মঞ্চে পারফর্ম করার পর আর সেরকম যোগাযোগ অনেকেরই থাকে না, এই ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

থাকছে না এরকমটাও না। ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচ করে গেলে অনেক সময় যোগাযোগ থেকে যায়। আর ওই মদের বন্ধুত্ব হলে তা তো কেটে যাবেই। কারণ নেশা কেটে গেলেই বন্ধুত্ব শেষ।

নতুন সুরকার ও গায়কদের জন্য আপনার কী টিপস?

আবারও রবিঠাকুরের একটি কথা আমার বারবার মনে পড়ে। আমার গানে সুর, তাল, লয় এগুলি ভালো থাকলো, কিন্তু এগুলি যেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উৎসারিত হয়। ভাবসাগরে নিজে না বিচরণ করতে পারলে শ্রোতাদেরও ভাবজগতে নিয়ে আসা যাবে না। তখন ওই স্টেজে পারফর্ম করে নাচাতে হবে। মৌলিক সৃষ্টি দরকার, কিন্তু তা কালোত্তীর্ণ হবে না যদি আমাদের ঘরের সম্পদ লালন, রবীন্দ্রনাথ না শুনি।

 

রূপা গাঙ্গুলীর সঙ্গে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা যদি ‘এক্সক্লুসিভ অধিরথ’ এর পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করেন।

সে এক সাংঘাতিক বিড়ম্বনা আমার কাছে। চান্দ্রেয়ী ঘোষ এবং রূপা গাঙ্গুলীর মতো ডাকসাইটে অভিনেত্রীর সামনে বাউল সেজে চলন্ত ট্রেনে অভিনয় করতে হয়েছিল। আমি দোতারা বাজাতেও পারি না। একটি দোতারা ধরিয়ে দেওয়া হল। ভিড়ের মধ্যে আমাকে রেল কামরায় স্বল্প পরিসরে আমার গাওয়া গানটিকে লিপ সিঙ্ক করতে হবে। তবে উতরে গেছি, মানুষ দেখে ভালোই বলেছেন।

আপনার গলার যা রেঞ্জ তাতে কী আপনার যথার্থ মূল্যায়ণ হল?

সেটা শ্রোতারা বিচার করবেন যে কতোটা পারলাম। মানুষের তো চাহিদার শেষ নেই। তবে আজ আমি যতোটা পেয়েছি সেটা আমার কাছে যথেষ্ট। আজ দশটা মানুষ হলেও তাঁরা নিখাদ ভালবেসে গানটি শোনেন। সঠিক গান, সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছতে চেয়েছি।

ফোকের সঙ্গে ‘ফিউশন’ শব্দটি খুব শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

আমি ভীষণ ওয়ার্ল্ড মিউজিকে বিশ্বাসী, ছুৎমার্গ আমার কোনওদিনই ছিল না। গানের আত্মাকে বাঁচিয়ে ফিউশন হতেই পারেন। অবশ্যই ফিউশনের নামে শব্দদানব এসে যেন আমাদের গ্রাস না করে। এটি খেয়াল রেখে আমিও ফিউশন করি, আমি পরীক্ষা-নীরিক্ষার পক্ষে।

কোন লোকসঙ্গীত শিল্পীর জীবনবোধ আপনাকে বেশি প্রভাবিত করেছেন?

অবশ্যই মনে করি, রবীন্দ্রনাথের মতো বাউল আমাদের দেশে আর নেই। তাঁর কথাই ব্রত করেছি। ‘জাগো প্রাতে আনন্দে, করো কর্ম আনন্দে, সন্ধ্যায় গৃহে চলো হে আনন্দ দানে, সবারে ক্ষমা করে থাকো আনন্দে’। লালন সাঁইয়ের মতেও আনন্দে থাকাটাই শেষ কথা। সুতরাং এই দুই মানুশকেয়া মি জীবন চলার ধ্রুবতারা মনে করি।

লোকসঙ্গীত গাইতে গেলে কি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখার দরকার রয়েছে?

শুধু লোকসঙ্গীত নয়, যে কোনও সঙ্গীত গাওয়ার জন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখার দরকার রয়েছে। গলাকে যদি আধার ভাবি, তাহলে সেই আধার তৈরি করার ক্ষেত্রে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভীষণ জরুরী। আমি যদি ভৈরবী বা বেহাগ রাগের মোড না জানি যা হয়তো লোকসঙ্গীতে ব্যবহার হবে তাহলে কী করে চলবে? অনেক বাউল শিল্পী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জানেন না, কিন্তু তাঁরা স্বয়ম্ভূ হয়ে জন্মেছেন, তাঁরা ব্যতিক্রম।

গানকে ঘিরে আজকাল ভয়েস ট্রেনিং কথাটি আকছার শুনতে পাওয়া যায়। এটি কী?

ভয়েস থ্রোয়িং ব্যাপারটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। গান হল সুরের নাটিকা। সেই নাটকটিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য বাচনটি ভীষণ দরকার। বাচনটি ম্যানারিজম গ্রস্ত হলে মুশকিল। তারপর অনেকে পেশীর ওপর চাপ দিয়ে গান বাজনা করে যা গলার স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই খারাপ। সেখানে ভয়েস ট্রেনিং এই কথাই বলে যে কীভাবে স্বাছ্যন্দে তুমি ভালভাবে গান গাইতে পারো।

আপনি সারাদিনে কতক্ষণ রেওয়াজ করেন?

একটা সময় রেওয়াজ করেছি। তবে ওইভাবে ঘণ্টা ধরে তা করি নি। কোনও দিন ৬ ঘণ্টা হয়েছে তো কোনও দিন ১৬ ঘণ্টাও হয়েছে। তবে এখন আলাদা করে রেওয়াজ করি না। শেখাতে শেখাতেই সারাদিন রেওয়াজ হয়। সপ্তাহে ৩ দিন প্রায় ১৮ ঘণ্টাও শেখাই।

দীর্ঘ সফরে কিছু ভালো এবং অভিজ্ঞতা।

শেক্সপীয়ার সরণিতে অরবিন্দ ভবনে একবার অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলাম। গান শেষে এক ষাটোর্ধ্বা মহিলা আমার পা জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন। অস্বস্তি লাগলো ঠিকই, কিন্তু বুঝলাম এটা আসলে ওনার ভালোবাসা। খারাপ অভিজ্ঞতা তো অনেকই আছে। যখন দেখি আমাদের শিকড় উৎসবে বড় স্পনসর এসে তাঁর সমস্ত পাবলিসিটি নিয়ে নিলেন। তারপর দেখা গেল তাঁরা আর কোনও টাকাই দিলেন না।

সঙ্গীতকে নিয়ে আপনার উপলব্ধির কথা যদি আমাদের পাঠকদের জানান।

ভবা পাগলার কথায় গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা। সঙ্গীত সাধনা করো শক্তি পাবে মনে। সকল গুণীজনের কাছে শুনি সুর একটি সেতুর কাজ করে এপার আর ওপারের মধ্যে। ওপার আছে কিনা সেই বিতর্কে যাবো না। কিন্তু কিছু একটা ভালোবাসা মনে হয় দাঁড়িয়ে আছে যাকে সুরটাই স্পর্শ করতে পারে।

গান ভালো লাগাটা খুবই আপেক্ষিক। সেমি-ক্লাসিক্যাল কারোর কাছে একেবারেই ভালো লাগলো না, সেটা আমার আবার দারুণ লাগলো। আর সঙ্গীত যাকে ঘিরেই রেখেছে তাঁর আলাদা করে আর কী উপলব্ধি হবে? এই সময়ের গান, ওই সময়ের গান এই বিভেদ না হওয়াটাই ভালো বলে আমার ধারণা। ভালো গান আগেও হয়েছে, আবার এখনও হচ্ছে। এখন যারা বাচিক শিল্পীরা কবিতা বলছেন তারাও গান গেয়ে ফেলছেন। আমার অনুরোধ তাঁরা গানটা একটু শিখে গান।

নির্দিষ্ট কিছু টিভি চ্যানেলের ট্যাগ নেই এরকম স্বাধীন শিল্পীরা বৈষম্যের স্বীকার  হচ্ছেন। আপনি কী বলবেন?

এমন অনেক শিল্পী আমি জানি যারা আহামরি কিছু গানবাজনা করেন না। কিন্তু তাদের রেট গিয়ে দাঁড়াচ্ছে দেড় লাখে। অন্যদিকে এদের থেকেও বেশি দক্ষ শিল্পীর সেই নির্দিষ্ট ট্যাগ না থাকায় তাঁরা শিল্পী হিসেবে পরিগণিতই হচ্ছেন না। এটি একটি অসম্ভব দুঃখের জায়গা।

আরেকটি অভিযোগ তরুণ শিল্পীরা করছেন। অ্যারেঞ্জাররা শিল্পীকে তাঁর নিজস্ব সেট-আপ বিসর্জন দিয়ে তাদের ঠিক করে দেওয়া অর্কেস্ট্রার সঙ্গে গাইতে বাধ্য করছেন। এর ফলে শিল্পী সম্পূর্ণ বোঝাপড়া বিহীন সেট-আপের সঙ্গে গাইতে গিয়ে মানের অবনতি ঘটছে। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

এটা কিছু করার নেই। আয়োজকরা যে বাজেট অ্যারেঞ্জারকে দিচ্ছে তাতে তাদের খরচও তো পোষাতে হবে। এখন একজন শি ল্পী রাত ৯ টা বা ১০ টার দিকে স্টেজে উঠে শিল্পী কতোটা নিজের গান গাইতে পারবেন? সেই তো চিরাচরিত গানই গাইতে হবে। তাহলে নিজস্ব সেট-আপে কী লাভ? আমারও প্রথমে এরকম মনে হয়েছিল যে নিজস্ব সেট-আপে গাইবো। কিন্তু বিগত কিছু বছর ধরে বুঝলাম এভাবে ভাবলে ঘরেই বসে থাকতে হবে। কারণ অ্যারেঞ্জাররাও তো পয়সা রোজগারের জন্যই তো নেমেছে। বরং অনেক সময় নতুন সেট-আপে গাইলে রিহার্সালের জন্য যথেষ্টই সময় দেওয়া হয়।

বাংলার এক রাজনৈতিক পালাবদলের পটভূমিকায় আপনার ‘মা-মাটি-মানুষ’ অ্যালবাম রিলিজ করেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তারপর ঘটনাপ্রবাহ কোন খাতে গড়ালো?

যোগাযোগের ভিত্তিতেই সবটা হয়েছিল। একটি ক্যাসেট কোম্পানি থেকে আমাকে সেটা করতে বলা হয়েছিল। আমারও তাগিদ ছিল। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে আমি শ্রদ্ধা করি। তবে তাঁর কাছ পর্যন্ত পৌঁছনো গেল না। তাতে আমার কোনও অভিমানও নেই। তবে এটা খারাপ লাগে বর্তমান শাসক দলকে সমর্থন করেছি বলে তৎকালীন সময়ে বেশ কিছু মানুষ আমাকে হ্যাটা করেছিল। এখন তারাই পদলেহনবাজদের দলে নাম লিখিয়েছেন।

সঙ্গীতকে ঘিরে আপনার স্বপ্ন কী?

আজ আমরা যেমন দেখি দক্ষিণ ভারত তাদের আঞ্চলিক গান বাজনা ছাড়া অন্য গানকে বিশেষ প্রাধান্য দেয় না। প্রাদেশিক না হয়েই বললাম কথাটা। ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার আনন্দ সবসময়েই আলাদা। আগে তো নিজের ঘরের আনন্দ, তারপর তো বাহ্যিক আনন্দ।

যথার্থতা টিকিয়ে রাখাটাও সমান জরুরী। একটি রিয়্যালিটি শো তে আজকাল মুখ দেখাতে পারলেই সে ফেম পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতে যোগ্য মূল্যায়ণ কম হচ্ছে। প্রত্যেক গানের নিজস্ব ধারা আছে, রস আছে। সেগুলো নিজের মতো করে যেন প্রচারিত হয়। এটাই আমার স্বপ্ন, গান-বাজনা যেন তাঁর স্ব-মহিমায়, স্ব-সাজে মানুষের কাছে পৌঁছায়।

র‍্যাপিড ফায়ারঃ

প্রিয় বেড়ানোর জায়গা – সমুদ্র, সেটা যে কোনও সমুদ্র হতে পারে।

প্রিয় রঙ – কাঁচা হলুদ ভালো লাগে কারণ আমি পজিটিভ মানুষ, লালও খারাপ লাগে না।

প্রিয় বই – চাঁদের পাহাড়।

প্রিয় সুরকার – সুধীন দাশগুপ্ত।

প্রিয় গায়ক ও গায়িকা – পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী ও বেগম পারভিন সুলতানা।

প্রিয় খাদ্য – (হেসে বললেন)বললে মারবে লোকজন। বলবে এতো অহিংসার বাণী শুনিয়ে শেষে হিংস্র হয়ে উঠছো? আমার প্রিয় খাবার হল খাসীর মাংস।

 

ভিডিওগ্রাফি – শুভব্রত সাহা

Promotion