Editorial

মন_তুই_ভালো_থাক

ছবি - গৌর মালাকার

সারাদিন প্রাইভেট চাকুরীতে অক্লান্ত পরিশ্রম, রাত ১০টায় বাড়ি ফেরা। তাও মেয়েটি রাত ৩ টেয় হোয়াটসঅ্যাপের এর নামহীন নম্বরটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। এই বুঝি ফুটে উঠলো “অনলাইন”, এই বুঝি ভেসে আসলো আগের মতো দুই লাইনের কবিতা বা “কেমন আছিস?” দিন কেটে যায়, মাস ফুরিয়ে যায় কিন্তু সে আসেনা। কনট্যাক্ট লিস্টের ১৫০ মানুষ জানতে পারে না, মেয়েটার মন খারাপ।

ছেলেটা ফেবুতে শুধু বিরহের কবিতা লিখত, পেত অকুন্ঠ মানুষের প্রশংসা। অনেক মানবীর নিবেদন ও, কিন্তু তার মন যে সেই মানুষীর মনে! যাকে সে ব্লক করে রেখেছে, প্রতারণার দায়ে। মাঝেমাঝে সে চুপিচুপি ব্লক খোলে, আর দেখে অনুতাপের শব্দ তার জন্য সাজানো কিনা। হঠাৎ দেখে, সেই মানবী “ইন আ রিলেশনশিপ”। ছেলেটি ছেড়ে চলে যায় ফেবু, কেউ জানতেও পারেনা, ছেলেটার মন খারাপ।

বছর ৩০ এর সদা হাস্যময় মেয়েটা, নিজের মাসতুতো বোনের বিয়েতে যেন প্রজাপতির মতো উড়ছিল। কত কাজ বাপরে বাপ! তার উপর বিকেলে খুব সুন্দর করে সাজতে হবে। সাজার ঘরে ঢুকতে যাবে, এমন সময় শুনতে পেল তার মাসির গলা, ” টুসির বয়স তো ৩০ পেরিয়ে গেল! এখনো ছেলে জোগাড় হলনা! কে জানে বাইরে কি সব করে বেড়াচ্ছে?” মেয়েটি ছুটে গিয়ে বাথরুমে কাঁদতে লাগলো। এত আত্মীয় কিন্তু কেউ জানতে পারলো না, মেয়েটার মন খারাপ।

রাস্তায় দেখা বন্ধুর সাথে, সঙ্গে ছোট ছেলে। “কীরে অমল তোর ছেলেরা কী করছে? আমারটা তো বিদেশে চলে গেল”। বড়টা চাকরি পেল সরকারি, ছোটটা চেষ্টা করছে, কী হবে কে জানে! অপদার্থ।” অসাধারণ আবৃত্তি জানা, গান জানা, থিয়েটার করা বেকার ছেলেটার মুখ কিন্তু নিচু। রাস্তার কেউ জানলো না, ছেলেটার মন খারাপ।

হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়া, অসম্ভব সরলমনের কর্মঠ ছেলেটা তখন প্রবল উন্নতির দোড়গোড়ায়। হঠাৎ খবর পেল তার প্রমোশন আটকে গেছে, সৌজন্যে তার বস। যাকে সে গুরু ভাবতো এবং বিশ্বাস করতো। মাঝরাতে বুকে পাথর নিয়ে সে রেজিগনেশন লেটার লিখতে বসলো। কেউ জানতে পারলো না, ছেলেটার মন ভালো নেই।

লাস ভেগাসের ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁ। অফিসের বন্ধুদের হুল্লোড়, খাবারের অর্ডারে এলো পেল্লাই চিংড়ি আর বহুমূল্য ওয়াইন। বছর ২৭-এর বোকা ছেলেটা, প্লেটের দিকে তাকিয়ে ফিরে যেতে লাগলো পাড়ার রঘুদার ঠেকের আড্ডাতে, ১০ টাকার ঘুগনিতে, কাউন্টারের বিড়িতে। বাংলা খেয়ে তুমুল ঝগড়াতে,আবার ফিরে পাওয়া বন্ধুত্বে, মায়ের বানানো চিংড়ির মালাইকারী আর আঁচলে লেগে থাকা হলুদ দাগে। চারিদিকে বয়ে চলা উদ্দাম বিলাসী স্রোতের কেউ জানলো না, ছেলেটার মন খারাপ।

গোলগাল চেহারার, সদা উছ্বল মেয়েটা, খেতে বড় ভালোবাসতো। আজ তার মুখে খাবার তুলতে ভালো লাগে না। বন্ধুদের সাথে কথা বলতেও ভালো লাগে না। কেউ যদি প্রশ্ন করে, “কী রে! তুই এত রোগা হলি কী করে? চোখের তলায় কালি?” মেয়েটি বিষন্ন হেসে বলে, ” ডায়েটিং করছি। কাজলটা বেশী দেওয়া হয়ে গেছে”। কেউ জানতে পারেনা, মেয়েটি ধারালো ব্লেডটাকে প্রতিরাতে কব্জির কাছে নিয়ে যায়, তার মন ভালো নেই।

রাতে মদ্যপ স্বামী ঘরে ফেরে, চলে অকথ্য গালিগালাজ কখনও বা মার। তাও স্বামীকে খাবার বেড়ে দেয় মেয়েটি। তারপর ঘুমন্ত স্বামীকে পাশে রেখে, ফেসবুক খোলে । চোখ পড়ে এক সুখী দম্পতীর ছবিতে। মেয়েটি কমেন্ট দেয় “এই ভাবেই থাকিস তোরা দুজনে সুখী হয়ে”। নিঝুম শহর জানেনা, তার মন খারাপ।

বউকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী জীবন দিতে ব্যর্থ ছেলেটি। তাই একদা প্রেমিকা,পরে বউ পাড়ি দিয়েছে অন্য কারো হাত ধরে বিলাসী জীবনের সন্ধানে। ছেড়ে রেখে গেছে তার বছর পাঁচের মেয়েকেও। তাও প্রতিবার মেয়েকে জড়িয়ে ধরার সময়, বুক ভরে ঘ্রাণ নেয় ছেলেটি  কারন, “গন্ধটা অবিকল ওর মতো “। মেয়েও জানতে পারেনা, বাবার মন ভালো নেই।

বন্ধুদের সাথে পিকনিক করতে এসে,”ভালোবাসি ভালোবাসি” গেয়ে ওঠে মেয়েটি। কেউ জানে না মেয়েটিকে বছর খানেক বাপের বাড়িতে সন্তান সহ রাখা, স্বামীটির আজ জন্মদিন। আর শত কষ্ট মুখ বুজে মেনেও, মেয়েটির আজ প্রবল ইচ্ছা একটু বলে,” শুভ জন্মদিন”। পিকনিকের কেউ জানতে পারেনা, মেয়েটার মন ভালো নেই।

গড়পড়তা বিয়ের, বছর দশ পরে মেয়েটি বুঝতে পারে, দাম্পত্য আসলে এক অভ্যাস। তাতে ভালোবাসার উন্মাদনা, প্রেমের আকুতি নেই।  ওই ছেলেটা হঠাৎ এসে পড়ে জীবনে। ভরে ওঠে জীবন। সমাজের কাছে পরকীয়া, তার কাছে ভালোবাসা। স্বামীর সাথে সঙ্গমের সময়, সে ভাবতে থাকে অন্য মুখ। চরম মুহূর্তরাও জানতে পারেনা, মেয়েটির মন ভালো নেই।

আসলে আমরা সবাই প্রতিনিয়ত, বাঁচি ছোট-বড় অজস্র মন খারাপ নিয়ে। কিছু ক্ষত থাকে দগদগে, কিছু সারার পর চিনচিনে ব্যথাটা থেকেই যায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে আগামী বিশ্বে যে রোগটি মহামারীর আকার ধারণ করবে, তা ক্যান্সার বা অন্য কোনো রোগ নয়। তা হলো “ডিপ্রেশন”। তাই বই, গান, সিনেমা, বিরিয়ানি, কাউন্সিলিং বা অ্যান্টিডিপ্রেশান্ট ওষুধ,সব থাকুক। কিন্তু ভারচুয়াল বা বাস্তবে এমন অন্ততঃ একটি বিশ্বাসযোগ্য  মানুষ থাকুক যাকে বলা যাবে, মন খুলে বিষাদ কথা।

Author Profile

Bivas Gupta

Promotion