জগতের বাহার

বীরভূমের দুই বিখ্যাত কালীতীর্থ

বোলপুরে আসি পুজো দিতে এলেই হয় কঙ্কালীতলা নয়তো ফুল্লরা তলায় যাই। বহুদিন থেকেই ইচ্ছে ছিল বীরভূমের আরেক শক্তিপীঠ নলহাটির কাছে নলাটেশ্বরী মা-কে দর্শন করবো। তাই এক সকালে যাত্রা করলাম সেই ইচ্ছাপূরণে। বেলা এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম। বেশ কিছুটা সিঁড়ি উঠে তারপর গর্ভগৃহের সন্ধান মিলল। পাথরের ওপর বসানো ত্রিনয়নী মায়ের মুখ। মায়ের জিভটি সোনার। বলা হয়ে থাকে এখানে মায়ের গলার নলি পড়েছিল। কথিত আছে, মূর্তির নিচে পাথরের মধ্যে মা নলাটেশ্বরীর গলার নলিতে জলের স্তর সবসময় একই রকম থাকে। যতই জল দেওয়া হোক, তা কম বা বেশি হয় না।

ভক্তি ভরে মায়ের পুজো দিয়ে নলাটেশ্বরী মন্দির থেকে আমরা রওয়ানা দিলাম ভদ্রপুরের সংলগ্ন ছোট্ট গ্রাম অকালিপুরে। সেখানে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে প্রায় ২৩০ বছরের পুরনো গুহ্যকালীর মন্দির রয়েছে। ব্রাহ্মণী নদীর তীরে বিশাল মাঠের মাঝখানে এতো পুরোনো মন্দিরটির নির্মাণশৈলী সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। লাল পাথরের তৈরি মন্দিরটি আটটি কোনা রয়েছে। মন্দিরের ভেতরে গর্ভগৃহেও আটটি কোণ। দু’শতকেরও প্রাচীন এই মন্দির এখনও কী মজবুত।

মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করে মায়ের মূর্তির দিকে তাকিয়ে চোখের পলক পড়ে না। মসৃণ কোষ্ঠীপাথরের তৈরি কী অপরূপ মায়ের মূর্তি! সাধারনতঃ মুণ্ড-মালা পরিহিতা, চতুর্ভুজা মা শিবের বুকে পা রেখে দাঁড়ানো  মায়ের মূর্তি দেখতে আমরা অভ্যস্ত। এখানে মায়ের রূপ একেবারেই আলাদা। মা এখানে বস্ত্র-পরিহিতা এবং দ্বি-ভূজা। এখানে তিনি বিনাশকারিনী নন। তাই হাতে খড়গ নেই। হাতে শুধু বর ও অভয়মুদ্রা যুক্ত দুই হাতে মা জীবজগতকে লালন-পালন করছেন। মায়ের চতুর্দিকে নাগফনা পজ্রিঞাসাবেষ্টিত। সেগুলি কালো কোষ্ঠীপাথরে তৈরি অপরূপ মুর্তি।

মন্দিরের পুরোহিত এবং স্থানীয় মানুষজনদের জিজ্ঞাসা করে মন্দিরের যে ইতিহাস জানা গেল তা বেশ চমকপ্রদ। মগধ-রাজ জরাসন্ধ পাতালে মন্দিরগৃহ নির্মাণ করে অতি গোপনে এই গুহ্যকালী বিগ্রহের পুজো করতেন। তাঁর মারা যাওয়ার পর মূর্তিটি ধীরে ধীরে চলে যায় ধরিত্রীর গর্ভে। এরপর রানী অহল্যাবাঈ স্বপ্নে নির্দেশিত স্থানে শিবলিঙ্গ খুঁজতে গিয়ে এই গুহ্যকালীর মূর্তি পান। এই মূর্তি রাণী কাশীর রাজা চৈত সিংহকে দিয়ে দেন। কাশীরাজ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে কাশীরাজ পুজো শুরু করেন। তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এই বিগ্রহ দেখে আকৃষ্ট হন। এটিকে তিনি ইংল্যান্ডের মিউজিয়ামে রাখার পরিকল্পনা করতে থাকেন। কাশীরাজ হেস্টিংসের পরিকল্পনা জানতে পেরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মূর্তিটি গঙ্গায় বিসর্জন দেন। এখানকার মহারাজ নন্দকুমার সাধক রামপ্রসাদের সমসাময়িক ছিলেন। এক রাতে স্বপ্নে মহারাজ মা গুহ্যকালীকে স্বপ্নে দেখেন। মা নাকি নিজ রূপে মহারাজকে দেখা দিয়ে বলেন, তিনি কাশীতে অসহায় অবস্থায় গঙ্গায় নিমজ্জিত আছেন। তাঁকে যেন উদ্ধার করে মহারাজ তাঁর আদি বাসভূমির কাছে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই শুনে নন্দকুমার কাশীতে গিয়ে বিগ্রহটি উদ্ধার করে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে অকালিপুর গ্রামে মন্দির বানিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করেন। মায়ের বিগ্রহ বস্ত্র-পরিহিতা বলে সম্পূর্ণ দেখা যায় না। আসলে মা সর্প-কুণ্ডলিনীর ওপর উপবিষ্ট।

নদীতীরের বুড়ো বটগাছ নীরবে আজও মহারাজা নন্দকুমারের আমলের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। যদিও নন্দকুমারের প্রাসাদোপম রাজবাড়ি ভেঙে আজ বহুতল ফ্ল্যাট বানানো হচ্ছে। কালের স্রোতে এভাবেই চলতে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা। আরও একবার মা-কে প্রণাম জানিয়ে উঠে পড়লাম গাড়িতে। সঙ্গে নিয়ে চললাম প্রায় আড়াই শতক পুরোনো ইতিহাস। মনের মধ্যে অবশ্যই মা নলাটেশ্বরী এবং মা গুহ্যকালীর বিগ্রহ।

 

Promotion